আকাশ যেখানে নেমে আসে

সেন্টমার্টিন দ্বীপফাইল ছবি

এয়ারপোর্ট রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি দুই বন্ধু। রাত নয়টা পেরিয়ে গেছে। ট্রেন এখনো আসেনি। জাপানে ট্রেন এতটা টাইমমতো আসে যে মানুষ ট্রেন দেখে ঘড়ির সময় ঠিক করে। ঘড়ি দেখে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করা লাগে না। এটা বাংলাদেশ, জাপান নয়। কাজেই আপনি ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে যদি খবর পান ট্রেন আসবে না, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

একদিকে ট্রেন আসছে না, সেটা যেমন চিন্তার কারণ, তার চেয়ে বড় চিন্তার কারণ—দুজনের মধ্যে একজনের টিকিট কালোবাজার থেকে কেনা। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর, আধুনিক ট্রেন কক্সবাজার এক্সপ্রেস। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার নতুন রুট চালুই হয়েছে কিছুদিন আগে। আর মানুষ বাই রোডের চেয়ে ট্রেনে যাতায়াত বেশি পছন্দ করে। ফলাফল ট্রেনের টিকিট সোনার হরিণ। এক মাস আগে টিকিট কাটতে হয় অনলাইনে। তা–ও টিকিট অনলাইনে আসার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বুক হয়ে যায়। ব্যাপারটা বাজি ধরার মতো। যদি টিকিট পেয়ে যান তো আপনার চাঁদকপাল। সেখানে আমরা সিদ্ধান্তই নিয়েছি আগের দিন। জায়েদকে হুট করে ফোন দিয়ে বললাম, ‘চল সেন্ট মার্টিনে যাই।’ বলল, আমি নাকি পাগল। হুট করে কীভাবে যাব। ট্রেনের টিকিটই পাব না। আর সে ঢাকার বাইরে থাকে। ৩০০ কিলোমিটার জার্নি করে ঢাকায় এসে আবার বাসে আরও ৪০০ কিলোমিটার জার্নি কঠিন। আমি বললাম, আমি টিকিট ম্যানেজ করছি, তুই রাতের ট্রেনেই ঢাকায় আয়। কাল রাতের ট্রেনেই যাচ্ছি আমরা। সে ভড়কে গেল। আমি ফোন কেটে নিজেই দ্বিধায় পরে গেলাম। টিকিট কি আদৌ পাব?

আমার খালু কমলাপুর রেলওয়ের প্রকৌশলী। ফোন দিয়ে বললাম, খালু কাল রাতে দুইটা কক্সবাজারের টিকিট ম্যানেজ করে দিতেই হবে। বন্ধুকে অনেক গর্ব করে আপনার কথা বলেছি। টিকিট ম্যানেজ করতে না পারলে ইজ্জত থাকবে না। উত্তর দিলেন, ‘ভেরি টাফ, ভেরি টাফ! পেলে আমি তোমাকে জানাব।’ আমি দেখলাম, এভাবে কাজ হবে না। আম্মাকে সেটিং দিলাম সুন্দর করে। তারপর আম্মাকে দিয়ে আবার ফোন করালাম। খালু এবার একটু নরম হলেন। স্টাফদের জন্য থাকা একটা টিকিট ম্যানেজ করে দিলেন আমার নামে। আর একটা টিকিট কোনোভাবেই পাওয়া যাচ্ছে না। সেই সমস্যার সমাধান দিল কমলাপুর রেলওয়েরই এক নৈশ প্রহরী। তার সঙ্গে টিকিট চক্রের হাত ছিল। দ্বিগুণ টাকায় সে ব্ল্যাক টিকিট দিল। খালু ফোন দিয়ে বললেন, একটা স্টাফ টিকিট আছে, আরেকটা ব্ল্যাক। স্টাফ টিকিটে কেউ সমস্যা করবে না। তবে ব্ল্যাকের টিকিটটি যার নামে কেনা, টিটি নাম জিজ্ঞেস করলে যেন তার নামই বলি। যার নামে টিকিট কাটা ছিল, তার নাম শ্রীজ্ঞানেশ্বরেনাথানন্দ। সমস্যাটা হলো এই নাম মনে রাখা তো দূরের কথা, দেখে উচ্চারণ করতে গেলে দুইবার ঢোক গেলা লাগে। আমি জায়েদ ট্রেনিং দিলাম কয়েকবার, যাতে টিটি ধরলে একটানে নাম বলতে পারে। কিন্তু লাভ হলো না। সে শ্রীজ্ঞানেশ্বর পর্যন্ত ঠিকঠাক উচ্চারণ করে, পরেরটুকুতে গিয়ে শুধু আ উ করে। পুরাটা আর বলতে পারে না। আমি বারবার বলে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু তার উন্নতি নেই। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম, ‘তোর আর বলার দরকার নাই। তুই টিটি এলে খালি আ–উ-ই করবি।’ আমি বলল, ‘স্যার কথা কইতে পারে না। বোবা–কালা।’

রাত ১০টার কিছু পর এল ট্রেন। স্টেশনভরা মানুষ। ধাক্কাধাক্কি–দৌড়াদৌড়ি করে বগিতে উঠলাম। যেটা হওয়ার ছিল, তা–ই হলো। দুজনের টিকিট আলাদা আলাদা সময়ের। সিটও হয়েছে আলাদা আলাদা। আমি বললাম, ‘আগে সিটে বস। তারপর পাশের জনের সাথে কথা বলে মিউচুয়াল মাইগ্রেশন করে একসাথে হব।’ আমি গিয়ে আগে আমার সিট বের করলাম। এক ভদ্রলোক বসেছে আমার পাশে। আমি বুঝিয়ে বলতেই সে রাজি হলো সিট চেঞ্জ করতে। কিন্তু সমস্যা হলো আরেক জায়গায়। জায়েদের সিট পড়েছে দুই মেয়ের মাঝখানে। দুই মেয়ে সম্পর্কে বড়–ছোট বোন। বড় বোনের কিছুদিন আগেই বিয়ে হয়েছে। তার স্বামী তাই শ্বশুরবাড়ির সবাইকে নিয়ে যাচ্ছে হানিমুনে। কিন্তু বেচারা পড়েছে বিপদে। তার বউ আর শালির মাঝখানে গলার কাটা জায়েদ। আমার পাশের জনও ছেলে। কাজেই ওনাকে উঠিয়ে জায়েদের জায়গায় বসালেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। যাহোক, বেচারার তাগাদা ছিল বউ আর শালির মাঝখানের কাটা সরানো তো বাদবাকি ব্যবস্থা সে–ই করল। অন্য এক জায়গায় আমাকে আর জায়েদকে পাশাপাশি সিট করে দিলেন।

ট্রেন স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ পর নিজেকে হালকা মনে হলো। অবশেষে দীর্ঘদিনের কল্পনা সত্যি হতে যাচ্ছে। আমরা যখন ইন্টারমেডিয়েটে পড়ি, তখন থেকে প্ল্যান করতাম, বোর্ড এক্সাম শেষ করেই সব বন্ধুরা মিলে সেন্ট মার্টিনে যাব। পরীক্ষা দিয়ে আর কাউকে পাওয়া গেল না। সবাই কোচিংয়ে চলে গেলাম। অ্যাডমিশন হলো একেকজনের একেক ভার্সিটিতে। তারপর সবারই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ততা। দূরত্ব বাড়ল। শুধু দূরত্বে থেকেও এক থাকলাম আমি আর জায়েদ। আজ রাত পার হলেই কাল ভোর হবে স্বপ্নের জায়গায়। সেই স্বপ্ন জীবন্ত হতে যাচ্ছে কাল ভোরে। ভেতরে চাপা উত্তেজনা।

কক্সবাজার থেকে আমাদের যেতে হবে টেকনাফে। প্রায় ৯০ কিলোমিটার রাস্তা। গুগল ম্যাপের হিসাবে আমরা ভোর পাঁচ–ছয়টার মধ্যে কক্সবাজার স্টেশনে নামব। আরও ৯০ কিলোমিটার দুই ঘণ্টা লাগলেও সকাল আটটার ভেতর টেকনাফ জাহাজ ঘাটে পৌঁছানোর কথা। সকাল আটটার কিছু পর সব জাহাজ একসঙ্গে সেন্ট মার্টিনের জন্য ছেড়ে যায়। সবকিছু ঠিকঠাকই হচ্ছে। কয়েক দিন শরীরের ওপর ধকল যাবে। তাই দেরি না করে ঘুমিয়ে গেলাম।

ঘুম যখন ভাঙল, দেখলাম, লাল আভা ছড়িয়ে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। ট্রেন যাচ্ছে ঠিক সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে। রেললাইনের কাজ এখনো চলমান। তড়িঘড়ি করে খুলে দিয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় কাজ শেষই হয়নি। তাই ট্রেন যাচ্ছে পিঁপড়ার গতিতে। আমি ফোন বের করলাম। ফোনের স্ক্রিনে চোখ পড়তেই বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সকাল প্রায় সাতটা বাজে। আমরা এখনো কক্সবাজারে পৌঁছাইনি। নির্ঘাত জাহাজ মিস করব। আর জাহাজ মিস করা মানে সেন্ট মার্টিনে যাওয়া সম্ভব নয়। জায়েদকে গুঁতা দিয়ে উঠালাম। সে ঘুমের ভেতরেই জিজ্ঞেস করল, ‘পৌঁছাইছি?’ আমি বললাম, ‘না।’ ও এবার ঘড়ি দেখল। দেখেই এক ঝটকায় উঠে বলল, ‘মামা, সাতটা বেজে গেল তো। কেমনে পৌঁছাব। জাহাজ তো ছেড়ে চলে যাবে।’ আমি বললাম, ‘যে গতিতে ট্রেন যাচ্ছে, দেরি তো হবেই।’ চিটাগাং পর্যন্ত ট্রেন ফুল স্পিডে এসেছে। কিন্তু এই নতুন রুটে আসার পর এত স্লো যাচ্ছে। দেখলাম ও চিন্তায় পড়ে গেল। আমি আশ্বস্ত করলাম, ‘নাহয় এক দিন কক্সবাজারেই থাকি পরের দিন ভোরে যাব।’

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

কক্সবাজার স্টেশনে নামলাম সাতটার পর। অনেক সুন্দর স্টেশন। স্টেশন থেকে বের হয়ে রাস্তায় এলাম। জায়েদ বলল, ‘তাইলে হোটেলে উঠতে হবে। চল রিকশা নিয়ে কলাতলীর দিকে যাই। ওই দিকে বেশি হোটেল। যেকোনো একটায় থাকা যাবে।’ বলেই সে ‘এই মামা, এই মামা’ বলে রিকশা ধরতে গেল। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। কক্সবাজারে থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই। জায়েদ একটা রিকশা ধরে এনেছে। আমাকে বলল, ‘উঠ, উঠ।’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা, এখনো ঘণ্টাখানেক সময় হাতে আছে। চল টেকনাফের দিকেই যাই।’ বাংলাদেশে কোনো কিছু টাইম মেনে চলে না। আমাদের ট্রেন পৌঁছানো কথা ছিল সকাল পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে আর পৌঁছাইছে সাতটার পর। তো জাহাজাও দেড়িতেই ছাড়বে। জাহাজ আধা ঘণ্টা দেড়ি করলেই ধরতে পারব। সে রাজি না। বলল, ‘বিপদে পড়বি। টেকনাফে গিয়ে যদি জাহাজ না পাই, তাইলে থাকবি কোথায়? এখানে পর্যটন এলাকা। সিকিউরিটি ভালো। টেকনাফে গিয়ে যদি জাহাজ মিস হয়, তাহলে থাকার জায়গা তো পাবিই না, উল্টা রোহিঙ্গারা ধরে সব রেখে দেবে।’ আমি বললাম, ‘কিচ্ছু হবে না। রিস্ক না নিলে গেইন করা যায় না। চল তুই। আমি রেসপনসিবিলিটি নিচ্ছি।’ যে রিকশা নিয়ে এসেছিল, সেই মামাকেই বললাম, ‘টেকনাফের বাস পাওয়া যাবে কোথায়?’ বললেন, ‘বাসস্টান্ডের কাছেই। চলেন নিয়ে যাই।’ রিকশায় উঠে পড়লাম। জায়েদ রেগে আছে। কথা বলছে না। সিদ্ধান্তটা ওর কাছে পাগলামি ছাড়া আর কিছুই না।

বাসস্টান্ডে গিয়ে দেখি, সব লোকাল বাস। বাসভর্তি সব লোকাল লোকজন। ঘুরতে যাচ্ছে, এমন লোক একজনও নেই। কন্ডাক্টর এসেই জিজ্ঞেস করল, ‘টেকনাফ যাবেন?’ আমি বললাম, ‘জাহাজঘাট পর্যন্ত যাব।’ তিনি ‘চলেন’ বলেই দুজনের হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে দিল দৌড়। আমি কোনোমতো রিকশাভাড়া দিয়েই তার পেছন পেছন দৌড়াচ্ছি। দেখলাম, একটা বাস ছাড়বে ছাড়বে। সেটাতেই সে আমাদের তুলে দিল। বাসে ওঠার একটু পরেই বাস ছাড়ল। জায়েদ বাসে উঠেই দিল ঘুম। ও সেই নীলফামারী থেকে এসেছে ঢাকায়। ঢাকা থেকে আবার আমার সঙ্গে। শরীর নেতিয়ে গেছে একেবারে। আমার চোখেও প্রচণ্ড ঘুম। কিন্তু ঘুমানো যাবে না। জাহাজঘাট ছেড়ে চলে গেলে বিপদ হয়ে যাবে। আমি চোখ জোর করে খুলে রাখলাম। বাইরে দূরের সবকিছু দেখতে থাকলাম। কক্সবাজার থাকে টেকনাফের রাস্তা অসম্ভব সুন্দর। রাস্তার একপাশে বাংলাদেশের পাহাড় আর অন্যপাশে ফসলের জমি। অবশ্য এই ফসলের জমিতে শুধু লবণই চাষ হয়। আর একটু দূরেই দেখা যাচ্ছে নাফ নদী। নদীর পরেই মিয়ানমারের আকাশছোঁয়া পাহাড়গুলো। বাংলাদেশের পাহাড়গুলো তুলনামূলক ছোট।

বাসের মধ্যে কারও কথা বুঝতেছি না এক হরফও। সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে হয়তো বলছে, এরা কারা? আমি গুগল ম্যাপ ধরে আছি। একটু পর বাসচালকের সহকারী টাকা ওঠাতে এল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, জাহাজঘাট এলেই যেন আমাদের নামিয়ে দেয়। আমরা কিছু চিনি না। তিনি বলল, ‘কই যাবেন? সেন্ট মার্টিন?’ আমি মাথা নাড়ালাম। সে বলল, ‘জাহাজঘাট যাইতে যাইতে তিন ঘণ্টা লাগবে। জাহাজ পাবেন না। আটটা বাজার সাথে সাথেই জাহাজ ছাড়ে। এক সেকেন্ডও লেট করে না।’ আমার ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেল। আমি বললাম, ‘তাহলে কি আর কোনো উপায় আছে?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ। টেকনাফে চলেন। ওইখান থেকে ট্রলার যায়।’ আমি কী করব, বুঝতেছি না। তা–ও ভালো জায়েদ ঘুমে। কিছু শোনেনি। শুনলে আমার গলা টিপে ধরত। আমি ভাবলাম, এত রাস্তা এসে ব্যাক করে কী হবে! ও ঘুমায়ে রিলাক্স হোক। পরে বোঝানো যাবে।

একটু পর আমরা একটা অদ্ভুত জায়গায় এলাম। দেখলাম, আমাদের বাস পাহাড়ের গায়ে চড়ে ওপরে উঠছে। আবার ঢালু বেয়ে নিচে নেমে এল একবারে খাদের কিনারা ঘেঁষে। সেই খাদের নিচটায় লেকের মতো। পানি একেবারে আকাশি রঙের। আমি জায়দকে গুঁতা মেরে ওঠালাম। বললাম, নিচের দিকে তাকা। সে প্রথমে ভয় পেল খাদ আর পাহাড়ের মাঝখানের সরু রাস্তা দেখে। তারপর বলে উঠল, ‘মামা একবারে মালদ্বীপের সৈকতের মতো পানির কালার। আগে মালদ্বীপ তো শুধু ভিডিওতেই দেখছি। বাস্তবে দেখি নাই। ঘুমের মধ্যে কি মালদ্বীপ চলে আসলাম নাকি স্বপ্ন দেখতেছি?’

টেকনাফের একটা বাজারের মতো জায়গায় বাস থামিয়ে কন্ডাক্টর আমাদের ইশারা করে ডাকল। জায়েদ আবার ঘুমিয়ে গিয়েছিল। আমি জায়েদকে আবার ঠেলা দিয়ে তুলে বললাম, ‘নাম তাড়াতাড়ি। চলে এসেছি।’ সে হকচকিয়ে উঠে কোনোমতো আমার পেছন পেছন দৌড়ে নামল। নেমেই জিজ্ঞেস করল, ‘জাহাজ কোথায়?’ আমি ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখান থেকে কেমনে যাব?’ সে খুব আন্তরিকতা নিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিল। এখান থেকে একটা অটো নিয়ে আমাদের যেতে হবে শাহপরীর দ্বীপ। একটু দূর আছে। সেখানে ঘাটেই ট্রলার পেয়ে যাব। ট্রলার নিয়ে যাবে আমাদের। এসব বলে দিয়ে সে বাসে উঠে চলে গেল। আমি জায়েদের দিকে তাকালাম। দেখলাম, রাগে তার চোখমুখ কালা হয়ে গেছে। এতক্ষণ সে সহ্য করেছে। এবার গর্জন দিয়ে উঠল, ‘তোর সাথে আসাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।’ আমি বললাম, ‘মামা চলেই এসেছি। এত কাছ থেকে ফিরে যাবি।’ সে শুধু বলল, ‘কিডনি তো নিজেরটা হারাবি সাথে আমারটাও।’ আমি কথা না বাড়িয়ে অটো খুঁজতে গেলাম।

প্রায় এক ঘণ্টা অটো চলার পর অবশেষে পৌঁছালাম শাহরিয়ারের দ্বীপ। জায়গাটা এত সুন্দর, লিখে বোঝানো যাবে না। সামনে আকাশি নীল জল যেতে যেতে গাঢ় নীল জলরাশি হয়ে মিশে গেছে আকাশের সঙ্গে। বোঝা যাচ্ছে, সমুদ্র অগভীর থেকে ধীরে ধীরে সামনে অতল হচ্ছে। মেঘহীন নীল আকাশ আর নীল জল। কোথায় আকাশ শেষ হয়েছে আর কোথায় সমুদ্র—বোঝা কঠিন। পাড়ে ট্রলারের চিহ্ন নেই। আশপাশে লোকজন নেই। বেলা দুপুর। মাথার ওপরে সূর্য। আমি হতাশার শেষ সীমানায় চলে গেছি। মাটিতে বসে পড়লাম। কী করব! এখানে থাকার কোনো হোটেল পাওয়া অসম্ভব। আসার সময় একটাও চোখে পড়েনি। এখান থেকে আবার জার্নি করে কক্সবাজারে ফেরত যাওয়াও সম্ভব নয়। সেই আগের রাত থেকে জার্নি করে আজ বেলা একটা বেজে গেল, জার্নির মধ্যেই আছি। জায়েদকে কী উত্তর দেব, ভাষা খুজে না পেয়ে চুপ করে আছি। সে মনে হয়, কথা শোনানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। আমি একটা কথা বললেই শুরু হবে। আমি চুপ থাকাটা বেছে নিলাম।

একটু পর ও–ই নীরবতা ভাঙল। সামনে একটা লম্বা জেটি চলে গেছে অনেকটা দূর। পাড়ের কাছে সমুদ্রের গভীরতা কম। কাজেই এখানে ট্রলারগুলো ভেড়ে। ‘চল হাঁটতে হাঁটতে জেটির শেষ মাথায় যাই। সমুদ্রটা আরও কাছ থেকে দেখা যাবে’ বলেই সে হাঁটা দিল। আমি পেছন পেছন গেলাম। আর মনে মনে ওকে ধন্যবাদ দিলাম আমার ওপর রাগ না খাটানোর জন্য। শেষ মাথার কাছাকাছি যেতেই দেখলাম, একটা সরকারি গাড়ি। সামনে লেখা ‘ইউএনও টেকনাফ’। সামনে দাঁড়িয়ে আছে কোট–টাই পরা এক ভদ্রলোক। হয়তো তিনিই ইউএনও। একটু দূরেই একটা স্পিডবোটে তিন–চারজন অল্প বয়সের মেয়ে, একটা নারী অগভীর জলে চক্কর দিচ্ছে। ইউএনও সাহেব সেই দিকেই তাকিয়ে আছেন। বুঝালাম, ওনার লোকজনই। একটু পরেই স্পিডবোটটা ঘাটে ফিরল। বোট থেকে নেমে সবাই সেই গাড়িতে চেপে আবার চলেও গেল। আমরা স্পিডবোট পেয়ে পুলকিত। জিজ্ঞেস করলাম, ‘মামা সেন্ট মার্টিনে যাবেন।’ বলল, যাবে। ভাড়া ছয় হাজার। জায়েদ একটা দীর্ঘ টান দিয়ে বলল, ‘ছয় হাজার!’ আমি বললাম, ‘মামা ছয় হাজার টাকা দিয়ে প্লেনে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে আসা যায়।’ মাম বলল, ‘কত দেবেন?’ অবশেষে দর–কষাকষিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা ঠিক হলো।

স্পিডবোটে উঠে লাইফ জ্যাকেট পরলাম। তারপর ঢেউ ভেঙে ভেঙে বোট চলতে শুরু করল। যত সময় যাচ্ছে সাগর গভীর হচ্ছে। ঢেউ বড় হচ্ছে। তিন দিকে তাকালে শুধু জলরাশি। বাম দিকে তাকালে শুধু মায়ানমারের উঁচু উঁচু পাহাড়। নিচে একটু সমতলভূমি। ছোটবেলার বাংলা বইয়ের একটা গল্প ছিল ‘মংডুর পথে’। লেখক সেখানে টেকনাফ থেকে মায়ানমারের মংডু ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিখেছেন। দূরে সেই মংডু শহর দেখা যাচ্ছে। আমরা মাঝসমুদ্রে এসে পড়লাম। বড় বড় প্রতিকূল ঢেউয়ের ঝাপটায় স্পিডবোট একবার লাফিয়ে শূন্যে উঠছে আবার ধপাস করে পড়ছে। সব দিকে শুধু পানি আর পানি। কূলকিনারা দেখা যায় না। মনে পড়ল কোথাও একটা পড়েছিলাম—মাঝসমুদ্রে কোনো নাস্তিক থাকে না। আমি আস্তিক মানুষ। প্রথমে খুব অ্যাডভেঞ্চার লাগলেও মাঝসমুদ্রে এসে মনে মনে দোয়া পড়া শুরু করে দিয়েছি। এখনো সামনে কোনো কিছু দেখা যাচ্ছে না পানি ছাড়া। আর সহ্য হচ্ছে না। মনে মনে ভাবছি, যদি সুস্থ শরীরে গিয়ে নামতে পারি, তাইলে প্রথম কাজ হবে আগে জাহাজের টিকিট কাটা। স্পিডবোটে আবার ফেরার চিন্তা করলে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যাব। পরে দেখলাম, ওই জেটিঘাট থেকে সেন্ট মার্টিনের দূরত্ব ছিল প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এতটা দূর হবে, কল্পনায়ও ছিল না। আমার ধারণা ছিল সাত–আট কিলোমিটার। ঝোঁকের বসে কী রিকশা যে নিয়েছিলাম, নিজেরাই বুঝিনি। স্রোতের ঝাপটায় পুরো শরীর ভিজে গেছে। তাই মাথা নিচু করে রেখছিলাম। হুট করে জায়েদ চিল্লায়ে বলল, ‘মামা সামনে দেখ।’ আমি মাথা তুললাম। দূরে অসীম জলরাশির মাঝখানে ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে ছোট্ট একটুকরো স্থলভূমি।

স্পিডবোট থেকে নেমেই গেলাম কটেজ খুঁজতে। কটেজে চেকইন করে রুমে এলাম। ব্যাগপত্র রেখে গোসল সেরে আগে খেতে গেলাম নিচে। গরম ভাত, সি ফিস ফ্রাই, পাতলা ডাল। খাওয়ার পর শরীর পুরোটা ছেড়ে দিল। রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল সন্ধ্যায়। জায়েদের গগনবিদারি নাক ডাকায়। রুম থেকে বের হয়ে করিডোরে এলাম। পাশেই বাসার জায়গা। সেখানে গিয়ে সোফায় বসলাম। দোতলার এখান থাকে সমুদ্র দেখা যায়।

একটু পর জায়েদও উঠল। ফ্রেশ হয়ে গেলাম সৈকতে। প্রচণ্ড কোলাহল। কিছুদিন পরেই সিজন শেষ হবে। তাই অনেক মানুষ। আমার ভালো লাগল না। রাতের খাবার খেয়ে চলে এলাম আবার রুমে। দুজন আড্ডা দিলাম কিছুক্ষণ। এর মধ্যেই দেখি, জায়েদ বেড গোছানো শুরু করেছে। আমি বললাম, ‘তুই কি শুবি?’ বলল, ‘দুইটা বেজে গেছে।’ আমি বললাম, ‘সমুদ্রই তো দেখা হলো না।’ সে উত্তর দিল, ‘হাতে আরও তিন দিন আছে।’ আমি বললাম, ‘এখন সৈকত ফাঁকা। এত সুন্দর সময় আর পাওয়া যাবে না।’ ও রাজি হচ্ছিল না এত রাতে। চাপাচাপিতে শেষমেশ বের হলো। বাইরে প্রচণ্ড বাতাস। সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে। কোনো মানুষজন নেই রাস্তায়। দোকানপাট সব বন্ধ। আমাদের পথে পেয়ে ১৫-২০ কুকুর সঙ্গে রওনা দিল। দ্বীপে এত কুকুর এল কোথা থেকে, ভেবে পেলাম না। সৈকতে গিয়ে বসলাম। সমুদ্রে জোয়ার আসছে। ধীরে ধীরে সমুদ্র এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। একেকটা ঢেউয়ের ওপর এসে আছড়ে পড়ছে আরেকটা ঢেউ। মাঝসমুদ্রে একচিলতে আলো জ্বলে টহল দিচ্ছে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ। অসীম জলরাশির ওপর যেন ভেসে আছে এই ছোট্ট দ্বীপ। সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। এ যেন এক অন্য গ্রহ। মাথার ওপরে তাকালে শুধু আকাশ। পরিষ্কার আকাশে ফুটে আছে অগণিত তারা। আকাশ এতটা নুয়ে এসেছে, যেন হাত দিলেই ছোঁয়া যাবে।

*লেখক: তোহা মাহমুদ, ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী