বার্সেলোনা: গাউডির স্থাপত্য বিস্ময় এবং কাতালান মনোহারী আকর্ষণ
কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার ও পরবর্তী আমেরিকা মহাদেশে সাম্রাজ্য বিস্তারের মাধ্যমে স্পেন একসময় হয়ে উঠেছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য। স্পেনের সেই স্বর্ণযুগ এখন আর নেই; কিন্তু ঐতিহ্য রয়ে গেছে। পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য এবং গথিক রাজ্যের পতনের পর, কাতালোনিয়া ৭১৮ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং উমাইয়া খিলাফতের একটি প্রদেশ—আল-আন্দালুসের অংশ হয়ে ওঠে। অঞ্চলটি মোটামুটি ৮০ থেকে ৯০ বছর মুসলিম শাসনের অধীন ছিল। যদিও স্পেনের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল ৪০০ বছরের বেশি সময় মুসলিম শাসনের অধীন থেকে গিয়েছিল।
স্পেনের মধ্যে একটি স্বায়ত্তশাসিত সম্প্রদায় বা অঞ্চল হলো কাতালোনিয়া, যার রাজধানী বার্সেলোনা—ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত সুন্দর ও ঐতিহাসিক বন্দরনগরী। শহরটিকে আমাদের বেছে নেওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল আন্তোনি গাউডির আধুনিকতাবাদী স্থাপত্য ও শিল্পকর্ম পরিদর্শন, গথিক কোয়ার্টারের ঐতিহাসিক আকর্ষণ (মধ্যযুগীয় সংস্কৃতি/গথিক), প্রাণবন্ত ভূমধ্যসাগরীয় সৈকত, সমৃদ্ধ কাতালান সংস্কৃতি এবং পিরেনিজ পর্বতমালা থেকে কোস্টা ব্রাভা (স্পেনের উত্তর-পূর্ব উপকূল) পর্যন্ত বিচিত্র ল্যান্ডস্কেপের একটি অনন্য মিশ্রণ। প্রসঙ্গত, চতুর্থ-অষ্টম শতাব্দীজুড়ে ‘গথিক সাম্রাজ্য’ বলতে জার্মান-গোথদের (ভিসিগোথ ও অস্ট্রোগোথ) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী, স্বাধীন রাজ্যগুলোকে বোঝায়। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ভিসিগোথরা আইবেরিয়ান উপদ্বীপে (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা ইউরোপের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের ভিত্তি স্থাপন করে।
আমরা দুটি পরিবার—শিরিন (কুইন) চৌধুরী ও আমি (ড. রাশিদুল হক) এবং ডা. হাসান হাফিজুর রহমান ও শাহীন আখতার এবারে একসঙ্গে ভ্রমণে যাওয়ায় দারুণ একটি অভিজ্ঞতা এবং স্মরণীয় মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের জুরিখ, লুসার্ন, বার্ন ও জেনেভা শহরগুলোর ভ্রমণের মাধ্যমে, যা অন্য একটি গল্পে বর্ণনা করার ইচ্ছা রইল। গত ২৮ এপ্রিল জেনেভা থেকে ‘ট্যাপ এয়ার পর্তুগাল’ বিমানযোগে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে ছয়-সাত ঘণ্টা অবস্থান করে আমরা বার্সেলোনায় পৌঁছালাম। রাত তখন প্রায় দুইটা।
প্রসঙ্গত, লিসবনে দীর্ঘ ট্রানজিট নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল ‘ট্যাগাস’ নদী-আটলান্টিক মহাসাগরের মোহনায় অবস্থিত লিসবনের অন্যতম প্রতীকী ও বন্দরমুখী চত্বর ঐতিহাসিক ‘প্রাসা দো কোমেরসিও’র পরিদর্শন। এই নদীর মোহনায় ছিল প্রায় ২৫০ বছর ধরে পর্তুগালের রাজাদের প্রধান বাসস্থান, ‘রিবেরা প্রাসাদ’। ১৭৫৫ সালের ভূমিকম্পে এই প্রাসাদসহ লিসবন শহরের অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে যায়। বার্সেলোনা বিমানবন্দরে বিমান থেকে নেমে কোনো অভিবাসন বা পাসপোর্ট চেক ছাড়াই সরাসরি ‘ব্যাগেজ ক্লেম’ এলাকায় গিয়ে সংগ্রহ করে নিলাম আমাদের লাগেজ। বিমানবন্দর (টার্মিনাল ২) থেকে বের হতেই ট্যাক্সি ও এয়ারপোর্ট শাটলের লাইন, কয়েক মিনিট পরপর একটি করে ট্যাক্সি বা বাস ছাড়ছে শহর কেন্দ্রের উদ্দেশে। আমরা একটি ট্যাক্সিতে করে ২০ মিনিটের মধ্যে আগে থেকে বুক করা একটি হোটেলে পৌঁছে গেলাম। ‘আন্দান্তে হোটেল’—‘অ্যাভিনিউ দ্রাসানেস’ রোডে অবস্থিত। এটি ‘লাস রামব্লাস’, ‘পোর্ট ভেল’ এবং ‘দ্রাসানেস মেট্রো স্টেশন’ থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বের মধ্যে একটি সুবিধাজনক হোটেল। একটি মজার বিষয় হলো, শেনজেন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে (যেমন সুইজারল্যান্ড থেকে স্পেন) ভ্রমণের সময় সাধারণত আবার ইমিগ্রেশন বা পাসপোর্ট চেক করার প্রয়োজন হয় না, যা অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে ভ্রমণের মতোই।
বার্সেলোনায় আমরা কাটিয়েছি পুরো দুটো দিন। দেখার ও জানার অনেক কিছুই আছে ঐতিহাসিক এ শহরে। এরই মধ্যে আমাদের পছন্দমতো নির্বাচিত কিছু ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান, শিল্পকর্ম এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দর্শন করেছি। বার্সেলোনায় আমাদের এই দুদিনের ভ্রমণ খুব উপভোগ্য ও স্মৃতিমধুর হয়েছে!
আমাদের ভ্রমণের প্রথম দিনের তালিকায় ছিল দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষিত সেই ‘ব্যাসিলিকা দে লা সাগ্রাদা ফামিলিয়া’ গির্জার সম্যকরূপে দর্শন। এই অনন্য সৃষ্টিটি সত্যিই বার্সেলোনা তথা বিশ্বের অন্যতম সেরা ল্যান্ডমার্ক। কাতালান স্থপতি আন্তোনি গাউডির নকশায় এটি বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বোচ্চ (৫৬৬ ফুট) ক্যাথলিক গির্জা, যেখানে গাউডি তাঁর নিজস্ব শৈলীধারায় গথিক এবং বক্রাকার ‘আর্ট নুভো’ স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণে এটি তৈরি করেছেন। গাউডির মূল নকশা অনুযায়ী গির্জাটিতে মোট ১৮টি চূড়া থাকার কথা, যা উচ্চতার ক্রম অনুযায়ী নিচ থেকে ওপরে—১২ জন ধর্মপ্রচারক, ৪ জন সুসমাচার প্রচারক/এভাঞ্জেলিস্ট, কুমারী মেরি এবং সবচেয়ে উঁচু চূড়াটি যিশুখ্রিষ্টকে নির্দেশ করে। ২০২৬ সাল নাগাদ এই চূড়াগুলোর মধ্যে ১৪টির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
২০০৫ সালে, সাগ্রাদা ফামিলিয়াকে ইউনেসকোর বিদ্যমান (১৯৮৪ সালের) বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান আন্তোনি গাউডির সৃষ্টিকর্মসমূহের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিশাল এই চার্চ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ১৮৮২ সালে; কিন্তু আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি, যদিও এটির কাজ ২০২৬ সালে গাউডির শততম মৃত্যুবার্ষিকীতে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর বিভিন্ন আলংকারিক কাজ, ভাস্কর্য এবং প্রধান প্রবেশপথের কাজ ২০৩০ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
গির্জাটির বর্তমান পূর্ণাঙ্গ রূপ গাউডি দেখে যেতে পারেননি। ১৯২৬ সালের ৭ জুন, ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর আহত হওয়ার পর, সাধারণ বেশভূষার কারণে ভিক্ষুক মনে করে তাঁকে অবহেলা করা হয়েছিল। সঠিক চিকিৎসার অভাবে ১০ জুন তিনি পরলোকগমন করেন। পরে তাঁকে তাঁরই প্রিয় সাগ্রাদা ফামিলিয়ার ক্রিপ্টে সমাহিত করা হয়। গাউডি তাঁর শিল্পকর্মে কাতালান সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তিনি ছিলেন ‘কাতালান রেনেসাঁ’ আন্দোলনের একজন অংশী—এটি ছিল একটি রোমান্টিক পুনরুজ্জীবনবাদী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য ছিল কাতালান ভাষা ও শিল্পের পুনরুদ্ধার। ‘ব্যাসিলিকা দে লা সাগ্রাদা ফ্যামিলিয়া’তে তিনটি প্রধান (ন্যাটিভিটি) ও বিশাল প্রবেশপথ (ফাসাদ) রয়েছে, এদের প্রতিটিই যিশুখ্রিষ্টের জীবনের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়কে চিত্রিত করে। যথা জন্ম—প্রবেশপথ (পূর্ব), যাতনা (প্যাশন)—প্রবেশপথ (পশ্চিম) এবং মহিমা—প্রবেশপথ (দক্ষিণ)। অত্যন্ত অলংকৃত ন্যাটিভিটি ফাসাদের বিপরীতে, প্যাশন ফাসাদটি অনাড়ম্বর, সাদামাটা ও সরল। এতে প্রচুর অনাবৃত পাথর রয়েছে এবং কঙ্কালের হাড়ের অনুকরণে কঠোর সরলরেখায় খোদাই করা হয়েছে। ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময় যিশুর যন্ত্রণা বা ‘প্যাশন অব ক্রাইস্ট’-এর প্রতি উৎসর্গ করা এই ফাসাদের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কষ্ট ও পাপকে চিত্রিত করা। চার্চের বাইরের দেয়ালে নেটিভিটির (যিশুর জন্ম) ভাস্কর্য আর চূড়ার নিখুঁত কাজ দেখে মুগ্ধ হলাম। দুর্ভাগ্যবশত আগে থেকে অনলাইনে টিকিট না কাটার কারণে আমাদের চার্চটির ভেতরের সব অসাধারণ প্রশান্তিমূলক কারুকাজ দেখার সুযোগ হয়নি। এটি দেখার সুযোগ মিস করা সত্যিই আক্ষেপের বিষয়।
ব্যাসিলিকা থেকে অনতি দূরে, ‘অ্যাভিনিউ ডি গাউডি’তে একটি আমেরিকান ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁয় (কেএফসি) আমরা দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। মেনু ফ্রাইড মুরগির মাংস, গ্রেভিসহ ম্যাশড পটেটো ও কোলস্লো। শিরিনের পছন্দের খাবার। হাফিজ ও শাহীন পাশের বার্গার কিংয়ে তাদের পছন্দমতো খাবার খেয়ে নিল। আমরা অ্যাভিনিউ ডি গাউডি ধরে ঈশানকোণ বরাবর এগোতে থাকলাম। রাস্তাটির দুই পাশে ক্যাফে/রেস্টুরেন্ট, স্যুভেনির দোকান। আরও আছে রাস্তায় কাপড় পেতে পসরা সাজিয়ে বসে পড়া হকারদের দোকান (যারা পুলিশ দেখলেই পসরা গুটিয়ে দ্রুত সরে যায়)। স্ট্রিট আর্টিস্ট ও পারফরমারদের ঘিরে লোকজনের জটলা।
চারদিকে অসংখ্য মানুষ, বেশির ভাগই আমাদের মতো পর্যটক, পিঠে ব্যাকপ্যাক, হাতে ফোন বা ম্যাপ নিয়ে ঘুরছে এদিক-ওদিক। আমরা স্যুভেনির দোকানে (মালিক বাংলাদেশি) কিছু গিফট কিনলাম। মিনিট কুড়ি হাঁটার পর আমরা এসে পৌঁছালাম ইউনেসকো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী একটি বর্ণিল স্থাপত্যে। এটি হলো আরেক আধুনিকতাবাদী স্থপতি ‘লুইস দোমেনেচ-ই-মন্তান’–এর নকশায় নির্মিত ‘হসপিটাল দে সান্ত পাউ’। বার্সেলোনার এ হাসপাতালটি বাগানের মধ্যে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম ‘গার্ডেন সিটি’ বা ‘উদ্যান-নগর’ নকশার জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত।
বিকেলে ছিল আমাদের সাগরে যাওয়ার পরিকল্পনা। ‘আন্দান্তে হোটেল’-এর অগ্নিকোণ বা দক্ষিণ–পূর্ব দিকে ভূমধ্যসাগর। বসন্তের মৃদু আবহাওয়ায় হেঁটে চললাম সাগরের দিকে। আগেই বলেছি, ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত বার্সেলোনা শহর। সমুদ্রতট, ‘পোর্ট ভেল’ এবং মেরিনা এলাকা আমাদের হোটেল থেকে অল্প হাঁটা পথের দূরত্বে, সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিনিটেরও কম সময়ের পথ। রাস্তার শেষ মাথায় দেখলাম একটি উঁচু স্মৃতিস্তম্ভ, মিরাডোর-ডি-কলম, ক্রিস্টোফার কলম্বাসের স্মরণে নির্মিত হয়েছে ১৮৮৮ সালে। আমেরিকা আবিষ্কারের পর কলম্বাস স্পেনে ফিরে এসেছিলেন বার্সেলোনা বন্দরে, প্রতিবেদন পেশ করেছিলেন স্পেনের রানি প্রথম ইসাবেলা ও রাজা পঞ্চম ফার্দিনান্দের কাছে। প্রসঙ্গত, ক্যাথলিক রাজা-রানি হিসেবে পরিচিত আরাগনের দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ এবং ক্যাস্টিলের প্রথম ইসাবেলা ১৪৬৯ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্পেনের প্রধান রাজ্যগুলোকে একত্র করেন।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে। হঠাৎ করেই দেখি হাসান-শাহীন আমাদের সঙ্গে নেই, তারা হয়তো ভিন্ন দিকে ভিন্ন কোনো আকর্ষণে গেছে। তাদের অপেক্ষায় থেকে সেদিন অবশেষে সমুদ্রসৈকতে গিয়ে সমুদ্রের গর্জন আর শোনা হলো না। পোতাশ্রয় থেকে হোটেলে ফেরার পথে হঠাৎ করেই একজন বাঙালি ছেলের সঙ্গে দেখা হলো—নাম আল-আমিন, বাংলাদেশ থেকে কলেজ অতিক্রম করে বার্সেলোনায় এসেছে কাজের সন্ধানে। কথা বলতে বলতে আমরা হোটেল পর্যন্ত এসে গেলাম। তার কাছ থেকে জানলাম যে আমাদের হোটেল থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা পথে একটি বাঙালি রেস্তোরাঁ আছে—‘মধুর ক্যানটিন’। বার্সেলোনায় মাঝারি দামে তৃপ্তিদায়ক খাবারের—সেও আবার বাংলা খাবারের—খোঁজ পাওয়া সত্যিই দারুণ। মুরগির কারি, সবজি, ডাল, ভাতের মতো ঘরোয়া খাবারগুলো বিদেশে বসে খাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা। কিছুক্ষণের মধ্যে হাসান-শাহীন একই রেস্তোরাঁয় এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল।
দ্বিতীয় দিন তালিকার প্রথমে ছিল বার্সেলোনার ‘গথিক কোয়ার্টার’ ঘুরে দেখা। এটি দুই হাজার বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ কেন্দ্রস্থল হিসেবে খ্যাত, যেখানে রয়েছে সংকীর্ণ মধ্যযুগীয় রাস্তার এক গোলকধাঁধা, লুকানো চত্বর এবং সুসংরক্ষিত, অত্যাশ্চর্য গথিক স্থাপত্য। হোটেল থেকে অনতি দূরেই রাস্তা ‘লা-রাম্বলা’ ধরে খুদে পাথর বিন্যস্ত আঁকাবাঁকা অলিগলি দিয়ে আমরা হেঁটে এগিয়ে চলেছি শহরের প্রাণকেন্দ্র ‘প্লাজা ডি কাতালুনিয়া’র দিকে। রাস্তার দুই পাশে রয়েছে প্রাচীন চতুর্থ শতাব্দীর রোমান সময়ের ধ্বংসাবশেষ (যেমন প্লাজা নোভা) থেকে শুরু করে ১৪ শতাব্দীর গথিক চার্চ (বার্সেলোনা ক্যাথেড্রাল), ১৫ শতাব্দীর চার্চ ‘ব্যাসিলিকা-ডি-সান্তামারিয়া-ডেল-পাই’ এবং ১৮-১৯ শতাব্দীতে নির্মিত সারি সারি বিশাল সব ভবন। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই গথিক কোয়ার্টারে থেকেই কাজ করেছেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পিকাসো, সেখানে আছে পিকাসো আর্ট মিউজিয়াম। পাবলো পিকাসো (১৮৮১–১৯৭৩) স্পেনে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বেশির ভাগ সময় ফ্রান্সে কাটিয়েছেন। আধুনিক কালের বিখ্যাত ভাস্কর জোয়ান মিরোর জন্ম ও বেড়ে ওঠাও এই গথিক কোয়ার্টারে। আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী এই কাতালান চিত্রশিল্পীর শিল্পকর্মকে পরাবাস্তববাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বার্সেলোনায় জোয়ান মিরোর অন্যতম প্রধান সৃষ্টি হলো ‘ডোনা ই ওসেল’ (কাতালান ভাষায় যার অর্থ ‘নারী ও পাখি’), উজ্জ্বল রঙের একটি সিরামিক মোজাইক ভাস্কর্য, যা পৃথিবী ও আকাশের মধ্যকার সংযোগের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্লাজা ডি কাতালুনিয়া চত্বরটি হলো বার্সেলোনার মূল স্নায়ুকেন্দ্র এবং সবার প্রিয় এক মিলনস্থল। শহরের প্রধান সংযোগস্থল হিসেবে এটি ‘লা রামব্লা’, বিখ্যাত ‘পাসেজ দে গ্রাসিয়া’ এবং ‘পোর্তাল দে ল-আঞ্জেল’-এর মতো বিখ্যাত অ্যাভিনিউগুলোকে সংযুক্ত করেছে, যা এ স্থানটিকে বেশির ভাগ পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য একটি সূচনাবিন্দুতে পরিণত করেছে। চত্বরটি ঘিরে রয়েছে বিশাল শপিং সেন্টার এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, যে কারণে এখানে সর্বদা লোকে লোকারণ্য থাকে। এ ছাড়া এটি একটি প্রধান পরিবহন কেন্দ্রও বটে, যা সিটি-ট্যুর ও বিমানবন্দরের বাসগুলোর জন্য একটি বিশাল সংযোগস্থল। বাসের পাশাপাশি মেট্রো ও রেলওয়ের অন্যতম বড় সংযোগস্থল এটি। বিমানবন্দর থেকে আসা বা যাওয়ার জন্য পর্যটকেরা সাধারণত এ জায়গাটিই বেছে নেন। এই ব্যস্ত চত্বর থেকেই আমাদের সহযাত্রী হাফিজ ও শাহীন শহর ঘুরে দেখার জন্য তাদের টিকিট ক্রয় করে একটি ট্যুরিস্ট বাসে চেপে বসল।
প্লাজা ডি কাতালুনিয়া থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে ‘পাসেজ দে গ্রাসিয়া’। এটি বার্সেলোনার সবচেয়ে বিলাসবহুল, আধুনিক এবং ঐতিহাসিক রাস্তাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে আন্তোনি গাউডির বিখ্যাত স্থাপত্য, যেমন কাসা বাৎলো ও কাসা মিলা অবস্থিত। বার্সেলোনার পাসেজ দে গ্রাসিয়া রাস্তাটিকে প্রায়ই প্যারিসের বিখ্যাত ‘শ্যঁজ-এলিজে’ রাস্তার সঙ্গে তুলনা করা হয়। উভয়ই তাদের বিলাসবহুল দোকান, স্থাপত্য এবং প্রশস্ত রাস্তার জন্য পরিচিত। প্লাজা ডি কাতালুনিয়া থেকে আমরা দুজন (শিরিন এবং আমি) বার্সেলোনার পেড্রালবেসে রাজা আলফোনসো ত্রয়োদশের প্রাসাদ দেখব বলে মেট্রোযোগে রওনা দিলাম। সেখান থেকে রাজার প্যালেসটি ২০ মিনিটের মেট্রো ট্রেনের পথ। আলফোনসো ত্রয়োদশ ১৮৮৬ সালের ১৭ মে তাঁর জন্ম থেকে ১৪ এপ্রিল ১৯৩১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪৫ বছর স্পেনের রাজা ছিলেন। তিনি জন্ম থেকেই রাজা এই কারণে যে তাঁর জন্মের আগেই তাঁর পিতা রাজা আলফোনসো দ্বাদশ মৃত্যুবরণ করেন। জনশ্রুতি আছে, ১৯২৬ সালে বার্সেলোনার গুয়েল পরিবার, একটি প্রভাবশালী ধনী কাতালান পরিবার, রাজাকে সবুজ বাগানে ঘেরা এই রাজপ্রাসাদ বা পালাউ রিয়াল ডি পেড্রালবেস উপহার দিয়েছিলেন। এই প্রাসাদের চারপাশের বাগানটি গাছপালা এবং ল্যান্ডস্কেপিংয়ের জন্য সুপরিচিত। এখানে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, যেমন হম ওক, আলেপ্পো পাইন, ক্যারোব গাছ, জলপাইগাছ, সাইপ্রেস, পামগাছ এবং একধরনের সরু বাঁশের ঝাড় রয়েছে, যা স্থানটিকে শহরের কোলাহল থেকে মুক্ত এক শান্ত পরিবেশ দেয়। প্রাসাদটি রাজার বার্সেলোনা ভ্রমণের সময় বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রাসাদের ভেতর এখন ডেকোরেটিভ আর্টস মিউজিয়াম এবং সিরামিক মিউজিয়াম রয়েছে।
আলফোনসো রাজার প্রাসাদটি ঘুরে এসে আমরা বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছোট্ট ভিজিট দিলাম। ১৪৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয় স্পেনের একটি শীর্ষস্থানীয় সরকারি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়, যা ধারাবাহিকভাবে দেশের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থান পেয়ে আসছে। ছাত্রদের কাছ থেকে জানলাম, এ বছর ১৬টি বিভিন্ন অনুষদে ৬০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। আমি জীববিজ্ঞানের ছাত্র এবং পেশাগত জীবনে মলিক্যুলার বায়োলজি ও স্নায়ুবিজ্ঞানের শিক্ষক, তাই স্বভাবতই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদটি খুঁজে বের করলাম। বার্সেলোনার অ্যাভিনিউ ডায়াগোনাল রোডে জোনা ইউনিভার্সিটারিয়া ক্যাম্পাসে অবস্থিত অনুষদটি গবেষণার জন্য বিখ্যাত। সেখানকার জেনেটিকস বিভাগের একজন সিনিয়র প্রফেসর এবং কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে কথা বলে তাদের শিক্ষাক্রম, জিন প্রকৌশল এবং চলমান গবেষণা প্রকল্পগুলো সম্পর্কে জানলাম। সেখানে বিভাগীয় প্রধান হলেন ড. ব্রু কর্মান্ড। তিনি ডোপামিন এবং অটিজম স্পেকট্রাম–সম্পর্কিত বিভিন্ন জিন নিয়ে কাজ করেন। তাঁর প্রকাশনার মানও বেশ ভালো। আমাদের বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতাটি ছিল চমৎকার।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। পায়ে হেঁটে এতটা ঘোরাঘুরির পর ক্লান্ত হয়েছি কিছুটা, ক্ষুধাও পেয়েছে বেশ। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে মেট্রো ধরে ফিরে এলাম আমাদের হোটেলের কাছে। লাঞ্চ করলাম একটি ইস্তাম্বুল রেস্তোরাঁয়। শিরিন ও আমি উপভোগ করলাম ‘দোনার কাবাব’ দিয়ে তৈরি ‘বিফ শর্মা’। মসলা মাখানো মাংস শঙ্কু আকৃতিতে স্তরে স্তরে সাজিয়ে একটি উল্লম্ব শিকের ওপর এটি ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে ঝলসানো হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর অটোমান সাম্রাজ্যে উদ্ভূত এই রন্ধনশৈলীতে মাংসের চর্বি গলে নিচের দিকে ঝরে পড়ে এবং মাংসটিকে ভেতর থেকে নরম ও বাইরে থেকে মচমচে করে তোলে। এ ধরনের খাবার এতটাই জনপ্রিয় যে এটি এখন বিশ্বজুড়ে ‘স্ট্রিট ফুড’ হিসেবে পরিচিত। বিকেলে ভ্রমণের ক্লান্তি মেটাতে খাবারটি যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল।
সেদিন বিকেল পাঁচটায় আমাদের হোটেলের পেছন দিকটায় ‘প্যারালাল রোড’ থেকে ডি-২০ বাসে চেপে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে রৌদ্রোজ্জ্বল সমুদ্রসৈকতে এসে পৌঁছালাম। ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবী এলাকায় অবস্থিত সৈকতটি বার্সেলোনার অন্যতম প্রাচীন এবং সবচেয়ে প্রিয় সৈকতগুলোর একটি। প্রথমবারের মতো আমাদের ভূমধ্যসাগর দেখার সুযোগ হলো। ভূমধ্যসাগরের এতটা তীব্র নীল রং, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। সম্ভবত সাগরের উচ্চ লবণের ঘনত্ব, সঙ্গে সূর্যালোকের বিচ্ছুরণ গভীর নীল আলোকে শোষণ ও প্রতিফলিত করে। এ ছাড়া এই সাগরে শৈবাল এবং ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনেরও অভাব রয়েছে। আটলান্টিকের তুলনায় ভূমধ্যসাগর অনেক শান্ত ও জোয়ারহীন, যা সাঁতারের জন্য খুব উপযোগী। আমি আটলান্টিক মহাসাগরের বিভিন্ন সৈকতে (যেমন মায়ামি সৈকত, ফোর্টলডারডেল সৈকত ইত্যাদি) অনেক সাঁতার কেটেছি; কিন্তু প্রস্তুতি না থাকায় বার্সেলোনা সৈকতে সাঁতার দেওয়া সম্ভব হলো না।
সাগরের অসীম নীল জলরাশির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। একসময় পড়েছিলাম, এই সমুদ্রটি একদা একেবারেই শুকিয়ে গিয়ে বিশাল একটি গর্তে পরিণত হয়েছিল। ভূতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ লাখ বছর আগে টেকটোনিক প্লেটের স্থানান্তরের ফলে আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের একমাত্র সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, যার কারণে শুষ্ক জলবায়ুতে ভূমধ্যসাগরের পানি বাষ্পীভূত হতে শুরু করে, রেখে যায় পুরু লবণের স্তর। সাগরটি প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়, যা ‘মেসিনিয়ান স্যালিনিটি ক্রাইসিস’ নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে জিব্রাল্টার প্রণালি দিয়ে একটি ‘মেগাফ্লাড’ বা মহাবন্যার ফলে সমুদ্র ফিরে আসে এবং অববাহিকাটি আবার পূর্ণ করে। এটি পূরণ হতে সময় লেগে যায় প্রায় দুই বছর।
এই সৈকতে বার্সেলোনার মানুষ মাছ, সামুদ্রিক খাবারের পদ এবং ‘তাপাস ও পায়েয়া’ (স্প্যানিশ সুস্বাদু খাবার) খেতে আসতে ভালোবাসেন। এখানে এসে সোনালি বালুর সঙ্গে ভূমধ্যসাগরীয় সংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত মিশ্রণ দেখেছি, সে কারণেই হয়তো বসন্ত ও গ্রীষ্মকালজুড়ে এই সৈকত পর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিড়ে মুখরিত থাকে। গতকালের ভূমধ্যসাগরীয় সৈকত না দেখার অসন্তোষ আজ আমরা পূরণ করেছি এবং এর সঙ্গে শেষ হলো বার্সেলোনায় আমাদের শেষ দিন। পরের দিন সকাল সাতটায় আমরা একটি উবার ডেকে নিলাম। কাকতালীয়ভাবে উবারের চালকও ছিলেন একজন বাঙালি, নাম কবির। এয়ারপোর্ট যাওয়ার সময় বরফে ঢাকা পিরেনিজ পাহাড়ের চূড়া দেখার সুযোগও হয়ে গেল। সকাল ১০টায় আমাদের ফ্লাইট। আমেরিকান এয়ারলাইনসযোগে ডালাস ফোর্টওয়ার্থ এয়ারপোর্টে ছোট্ট একটি ট্রানজিট নিয়ে আটলান্টায় ফিরে এলাম। এর মাধ্যমে বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বার্সেলোনার চমৎকার একটি ভ্রমণ শেষ হলো।
*লেখক: অধ্যাপক রাশিদুল হক, সাবেক সহ–উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ