আমিয়াখুম ভ্রমণের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

আমিয়াখুম জলপ্রপাতপ্রথম আলো ফাইল ছবি

নাগরিক ভ্রমণ–১

সেকশন: , নাগরিক সংবাদ

ট্যাগ: , , রেমাক্রি, সাঙ্গু নদ, ট্যুর গ্রুপ,

ছবি: ...নামে এডু জবসে

মেটা ও এক্সসার্প্ট:

ব্লার্ব: ১

ব্লার্ব: ২

ব্লার্ব–৩

আমার জীবনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়ংকর আর স্মৃতিতে জাগরূক হয়ে থাকবে এবারের নাফাখুম-আমিয়াখুম ট্যুর। প্রায় মরতে মরতে বেঁচে ফিরে এসেছি। আমি দীর্ঘদিন ট্যুর করি। এটা আমার প্যাশন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জনপ্রিয় অনেক দর্শনীয় স্থান আমার দেখা হয়েছে। অনেকদিন থেকেই আমার নাফাখুম–আমিয়াখুম যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু যেহেতু এটা ট্রেকিং ট্যুর আর এক্সপেনসিভ (অন্তত আমার কাছে), তাই ব্যাটে–বলে মিলছিল না। কিন্তু এবারের রোজার ঈদে সবকিছু মনমতো হয়ে যাওয়াতে বেরিয়ে পড়লাম নাফাখুমের উদ্দেশে।

রাত ৮টায় আমরা সায়েদাবাদ থেকে বান্দরবানের বাসে একটা ট্যুর গ্রুপের সঙ্গে উঠে পড়ি। সেখানে আরও কয়েকটা ট্যুর গ্রুপ ছিল। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ জন। বাস ছেড়ে দিল, তারপর রাতের ঠান্ডা হাওয়া উপভোগ করতে করতে পৌঁছে গেলাম চকরিয়া। সেখান থেকে আরেকটা বাসে আলীকদম। আলীকদম থেকে চান্দের গাড়ি করে থানচি। থানচি থেকে ট্রলারে করে পদ্মঝিরি।

আমি ভেবেছিলাম, আমিয়াখুম বোধ হয় আর যেতে পারব না। শরীরে এত ব্যথা ছিল। ১২টা নাগাদ রাতের খাবার দিল। কোনোরকম মুখে গুঁজে তারপর কিছু ওষুধ খেয়ে নিলাম।

থানচি থেকেই মূলত নো নেটওয়ার্কের আওতায় পড়ে। কোনো নেট নেই এরপর আর। আর এখানেই আমাদের দুর্ভোগের সূচনা। কথা ছিল, আমাদের রেমাক্রি পর্যন্ত ট্রলারে করে নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর সেখান থেকে ৪-৫ ঘণ্টা হেঁটে থুইসা পাড়ায় পৌঁছে যাব। কিন্তু বিধিবাম! ট্রেকিং যেহেতু করতে এসেছি, প্রকৃতি আমাদের ট্রেকিংয়ের আদ্যোপান্ত শিখিয়ে দিল। বলা হলো, তেলসংকটের কারণে ট্রলার আর সামনে যাবে না আমাদের এখান থেকেই ট্রেকিং শুরু করতে হবে। পদ্মঝিরি থেকে আমাদের ট্রেকিংয়ের শুরু হলো বেলা ১টায়।

প্রথমে ভালোই লাগছিল, ঝিরিপথ ধরে হাঁটছিলাম পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগ করতে করতে। দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। তারপর আবার ঝিরি ধরে হাঁটা। আসল খেলা শুরু হলো বিকেল ৪টার পর। একের পর এক পাহাড় চলে আসছিল সামনে। ওগুলো বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠি। সন্ধ্যা নেমে গেলে আমাদের বলা হলো দোকানে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে। আর আধা ঘণ্টা হাঁটলেই আমরা থুনচিপাড়ায় পৌঁছে যাব। কিন্তু দেখা গেল, আধা ঘণ্টার স্থানে ২ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও পাড়ার দেখা মিলছে না। একে তো ক্লান্ত শরীর, তার ওপর উঁচু উঁচু খাড়া পাহাড়ের ঢাল। এর মধ্যে আবার রাত নেমে এসেছে। টর্চ জ্বালিয়ে সবাই হাঁটছিলাম। আমাদের গ্রুপে বেশ কয়েকজন ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব। তাঁরা আগে তেমন ট্যুর করেননি। এটা যে ট্রেকিং ট্যুর, তাঁরা এটাও জানতেন না। আমিয়াখুমের ভিউ দেখে আর হুজুগে পড়ে চলে এসেছেন। তাঁদের সবার অবস্থা খারাপ। হাঁটছেন আর হোস্টকে গালি দিচ্ছেন। ইয়াং যাঁরা, তাঁরাও হতাশ। এ রকম ট্যুর হবে, কেউ প্রত্যাশাই করেননি। সবার শরীর টালমাটাল। শুধু মনের জোরে হাঁটছেন সবাই। পথ যেন শেষই হয় না।

যাঁরা আমিয়াখুম যাবেন, ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে যাবেন। আর সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন। ট্যুরিজম খাতকে রক্ষা করতে আমাদের এক হতে হবে।

অন্ধকারে একবার পাহাড়ে উঠি আবার নেমে ঝিরিপথ দিয়ে হেঁটে আবার আরেকটা পাহাড়। আমার মনে হয়, ৭-৮টা পাহাড় অন্ধকারে আমরা অতিক্রম করেছিলাম। রাত প্রায় সাড়ে ১০টায় আমরা পাড়ায় পৌঁছে গেলাম। আমি লিটারেলি শুয়ে পড়লাম পাড়ার উঠানে। শরীরে আর এক বিন্দু শক্তি নেই। আধা ঘণ্টা এভাবে শুয়ে থাকার পর আমাদের জুমঘরে রুম ঠিক হলো। ৫ জন মেয়ের জন্য একটা রুম, যেখানে আবার রান্নাও হচ্ছে। ফ্লোরে চাঁটাই বিছিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা। না খেয়েই শুয়ে পড়লাম। আমি ভেবেছিলাম, আমিয়াখুম বোধ হয় আর যেতে পারব না। শরীরে এত ব্যথা ছিল। ১২টা নাগাদ রাতের খাবার দিল। কোনোরকম মুখে গুঁজে তারপর কিছু ওষুধ খেয়ে নিলাম।

পরদিন সকালে ও শরীর খুব ব্যথা, তবু মনের জোরে বের হয়ে পড়লাম আমিয়াখুমের উদ্দেশে। আমাদের টিমের ৩৫ জনের মধ্যে আমিয়াখুম রওনা দিলেন মাত্র ১০ জন। তাঁদের মধ্যে আবার আমরা ২ জন মেয়ে। আঙ্কেলসমাজ বেশ ট্রল করল আমাদের নিয়ে, ‘দেখো, আমরা পারি না, আর বাচ্চা বাচ্চা মেয়ের কী সাহস!’

যা–ই হোক, ২ ঘণ্টা হাঁটার পর সেই কাঙ্ক্ষিত দেবতা পাহাড়। যা কিনা আমিয়াখুম যাওয়ার পথে সবচেয়ে ভয়ংকর পাহাড়। কারণ, এর উচ্চতা প্রায় ১ হাজার ৯০০ ফুট আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি প্রায় /////////////////৯০° //////////////////খাড়া। দড়ি বেয়ে প্রাণ হাতে নিয়ে নামলাম। একটু এদিক সেদিক হলেই খাদে পড়ে আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।

দেবতা পাহাড় থেকে নেমে ভেলাখুম তারপর আমার স্বপ্নের আমিয়াখুম চলে এলাম। ২ দিন যা কষ্ট করেছিলাম, সব মুহূর্তেই পানি হয়ে গেল। এত্ত সুন্দর..!

আমিয়াখুমে ছবি তুলে গোসল করে আবার দেবতা পাহাড়ের কাছে চলে এলাম। আরেক অ্যাডভেঞ্চার। কখনো হেঁটে, কখনো বসে, কখনো হামাগুড়ি দিয়ে তারপর চূড়ায় উঠলাম। সেখান থেকে নেমে পাড়ায়।

পরদিন আবার তল্পিতল্পা গুটিয়ে নাফাখুম যাত্রা। কথা ছিল, সেখান থেকে রেমাক্রি গিয়ে তারপর বোটে করে থানচি, তারপর চান্দের গাড়ি, তারপর বাসে করে ঢাকা। নাফাখুম দেখে রেমাক্রি এলাম। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। রেমাক্রি আসার পর আর নৌকার দেখা নেই। সকাল থেকে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। হোস্ট গেছেন নৌকা আনতে। তাঁর আসার খবর নেই। এদিকে নো নেটওয়ার্কের কারণে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগও করা যাচ্ছে না। আমাদের প্যাকেজে লাঞ্চ আছে, সেটাও করানো হচ্ছে না। আমরা সবাই টুকটাক খেয়ে নিলাম।

হোস্ট এলেন প্রায় সন্ধ্যায়। এই রাতের বেলায় আমাদের সাঙ্গু নদ দিয়ে যেতে হবে। যেখানে সাঙ্গু নদ হচ্ছে পাহাড়ি নদ। চলতি পথে সব বড় বড় পাথর। দিনের আলোতেই ওখানে চলা যায় না। আর রাত। তবু বুকে সাহস নিয়ে উঠে পড়লাম। গ্রীষ্মকাল হওয়াতে পানি কম। কিছুদূর গিয়ে সবাই নৌকা থেকে নেমে নৌকা ঠেলতে লাগলেন। এক জায়গায় গিয়ে নৌকা আর চলেই না, তারপর আমরা নেমে কিছুদূর পাড় ধরে হাঁটলাম। মাঝি নৌকা ঠেলে নিয়ে এলেন। তারপর নৌকায় উঠার সময় আমরা নদের ওপর দিয়ে হেঁটে ট্রলারে উঠতে হবে, কারণ পানি কম। কিছুদূর গেলাম। মাঝনদীতে গিয়ে দেখি, তীব্র স্রোত। প্রায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। কোনোমতে গাইডকে ধরে বাঁচলাম। এরপর নৌকা চলতে শুরু করল বড় বড় পাথরের মাঝখান দিয়ে। এক জায়গায় এসে প্রায় উল্টে গিয়েছিল। আল্লাহ বাঁচিয়ে দিলেন আবার।

তিন্দু এসে পৌঁছালাম। মাথায় এখনো টেনশন, এই রাতে কীভাবে থানচি যাব। পাহাড়ি উঁচু খাড়া পথ। অন্ধকারে চান্দের গাড়ি তো চলতে পারবে না। এক ঘণ্টা ওয়েট করার পর হোস্ট বললেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে। এ সময় চান্দের গাড়ি চলবে না। আর আমরা যে বাসে উঠব, তা রাতে না গেলে আর যাওয়া যাবে না। আমাদের নিজের টাকায় তিন্দুতে থাকতে হবে। তারপর নিজেদের টাকায় ঢাকা পৌঁছাতে হবে। তাঁরা লাঞ্চের পরিবর্তে সকালে নাশতা করাবেন। এ কথা শুনে সবাই তো অবাক। এত টাকা দিয়েছি, এত কষ্ট করে এই পর্যন্ত এসে এখন এ কথা। তা ছাড়া নো নেটওয়ার্কের কারণে কেউ চাইলেও বিকাশ বা ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারবেন না। তারপর সবাই মিলে বুঝিয়ে–শুনিয়ে হোস্টকে তিন্দু থাকার খরচ আর অন্যান্য খরচে রাজি করালেন।

সকাল হলে আমরা ট্রলারে করে থানচি, তারপর চান্দের গাড়ি করে চকরিয়া এলাম। এখানে এসে আরেক বিপদ। ঈদের কারণে ঢাকাগামী কোনো সরাসরি বাস নেই। হোস্ট কিছুক্ষণ চেষ্টা করে তারপর আমাদের বাসভাড়া দিয়ে দিলেন। চকরিয়া থেকে চট্টগ্রামে এলাম। সেখান থেকে আবার বাসে করে ঢাকায় পৌঁছালাম ভোর ৫টায়। তারপর স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লাম। যত দিন বেঁচে থাকব, এই ট্যুরের কথা আমি কখনোই ভুলব না।

যাঁরা আমিয়াখুম যাবেন, ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে যাবেন। আর সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন। ট্যুরিজম সেক্টরকে রক্ষা করতে আমাদের এক হতে হবে।

লেখক: শায়লা এ্যামিন, শিক্ষার্থী, উত্তরা, ঢাকা

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]