বগালেক, কেওক্রাডং ও সুনসাংপাড়া—পাহাড়ি রাস্তা, মেঘ আর সবুজের গল্প

ঢাকা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল শহর। ৫৬৫ বর্গমাইল ঢাকায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বসবাস করে। রাস্তায় শুধু মানুষ আর মানুষ। রাস্তায় মানুষ, হর্ন, ভিড়—অতিষ্ঠ এই যান্ত্রিক শহর থেকে মুক্ত হতে এবার ঘুরে এলাম বান্দরবানের বগালেক, কেওক্রাডং ও সুনসাংপাড়া।

এবার আমাদের ভ্রমণের সহযাত্রী আমরা সাতজন। বৃহস্পতিবার রাত ১১টার বাসে করে আমরা ঢাকা থেকে বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা দিই। শুক্রবার সকাল ৮টায় বান্দরবান বাসস্ট্যান্ড নেমে একটা রেস্তোরাঁয় ফ্রেশ হয়ে বগালেক, কেওক্রাডং, সুনসাংপাড়া যাওয়ার জন্য চাঁদের গাড়ি ভাড়া নেওয়ার খোঁজ শুরু করি। কেওক্রাডং যাওয়ার জন্য এখানে একটা কাউন্টার আছে, যেখান থেকে চাঁদের গাড়িগুলো ভাড়া পাওয়া যায়। মোটামুটি দামাদামি করে ১৭ হাজার টাকায় একটা চাঁদের গাড়ি ভাড়া নিই দুই দিনের জন্য। চাঁদের গাড়ি বলতে মূলত চার চাকায় শক্তি আছে, এমন গাড়িকে বোঝায়, যা পাহাড়ে চলাচল করে। আমাদেরটা মূলত ল্যান্ড ক্রুজার মডেলের। সবার ব্যাগপত্র ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ির পেছনে রেখে আমাদের প্রথম গন্তব্য রুমা বাজার পর্যন্ত।

শুরু হলো আমাদের পাহাড়ি পথ চলা। বান্দরবান শহর পার হতেই চোখে পড়ল পাহাড় আর পাহাড়। আমাদের গাড়ি একেবেঁকে চলছে। ঘণ্টা দুয়েক পরে আমরা পৌঁছে যাই রুমা ট্যুরিস্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট সেন্টারে। সেখানে নির্ধারিত এক্সপ্লোররুমাডটকম ওয়েবসাইটে ঢুকে সবার আইডি কার্ড দিয়ে নাম–ঠিকানা এন্ট্রি করতে হয়। সবার নাম–ঠিকানা এন্ট্রি করার পরে ওই ওয়েবসাইট থেকে একটা টোকেন প্রিন্ট করে জমা দিতে হয় এবং ওই টোকেনের একটা কপি নিজের কাছে রাখতে হয়। সবার নামে আলাদা আলাদা টোকেন থাকে।

আমরা টোকেন নিয়ে পৌঁছে যাই রুমা বাজারে। এখানে ট্যুরিজম ইনফরমেশন সার্ভিস সেন্টার নামে একটা বুথ আছে, যেখান থেকে গাইড ভাড়া করতে হয়। আমরা দেখেশুনে ১ হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে দুই দিনের জন্য লিটন দাস নামের একজন গাইড ভাড়া করি। রুমা বাজারে আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। বাজার থেকে কলা, পেঁপে, চা খেয়ে আমরা একটু বিশ্রাম নিই। গাইডকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের শুরু হয় বগালেকের উদ্দেশে যাত্রা। রুমা থেকে বগালেকের দূরত্ব ১৭ কিলোমিটার। এই যাত্রা অনন্য সুন্দর ভয়ংকার যাত্রা। এক ঘণ্টা পরে আমরা পৌঁছাই মুনলাইপাড়ায়। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন অসাধারণ এক পাহাড়ি গ্রাম। এখানে কিছু খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু করি পথচলা। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ল্যান্ডক্রুজারে এগিয়ে চলছি। কখনো পাহাড়ের ওপরে উঠছি আবার কখনো নিচে নামছি। ঘণ্টা দুয়েক পরে পৌঁছে যাই বগালেকে। চারপাশে পাহাড়, মাঝখানে বৃহৎ লেক। পাহাড়ের উঁচু-নিচু পথ পেরিয়ে যখন হঠাৎ চোখের সামনে নীলচে পানির বিশাল একটি লেক দেখতে পেলাম, তখন দীর্ঘ পথের ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আগে থেকেই ঠিক করে রাখা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন বগালেক কটেজে আমরা একটা রুম ভাড়া করে রেখেছিলাম তিন হাজার টাকায়। এক রুমে সাতজন। ঢালাও বিছানা। সারা দিনের ক্লান্তি, গাড়ির ঝাঁকুনি—সবাই ভীষণ ক্লান্ত। পাশের একটা রেস্টুরেন্টে গাইড রাতের খাবার অর্ডার করল। রাত ৮টায় খাবার দেবে। প্রত্যেকজন ৪০০ টাকা। মুরগির মাংস, ভাত, ভর্তা, সবজি। গাইড–চালকসহ আমরা নয়জন। এখানে সব খাবারই হোটেলে অর্ডার করার পরে রান্না শুরু করে। আমাদের রুমটা ঠিক লেকের সামনে। রুমে ব্যাগপত্র রেখে নেমে পড়ি স্বচ্ছ পানির লেকে।

বগালেক বাংলাদেশের পার্বত্য বান্দরবান জেলার একটি অন্যতম প্রাকৃতিক পর্যটন স্থান। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ বগালেক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই লেক তার নীলাভ পানি, চারপাশের সবুজ পাহাড় এবং মেঘময় পরিবেশের জন্য বেশ পরিচিত। বগালেক কেওক্রাডংয়ের বেজ ক্যাম্পস্বরূপ। কেওক্রাডংয়ে অল্প কিছু থাকার কটেজ আছে, সেটা আবার পাওয়া মুশকিল। সে জন্য অধিকাংশ পর্যটক বগালেকে রাত্রিযাপন করেন।

বগালেকের চারপাশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে। পাহাড়ের গায়ে মেঘের খেলা এবং শান্ত লেকের পানির দৃশ্য আমাদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করল। চারদিকে সবুজ পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে মেঘের আনাগোনা আর নীরব প্রকৃতি—সব মিলিয়ে বগালেকের পরিবেশ অন্য রকম এক অনুভূতি তৈরি করে। বিকেলে পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য বেশ আকর্ষণীয়।

শীতল স্বচ্ছ জলে গা ভিজিয়ে চলে আসি রুমে। ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। খাবার খেয়ে আমরা হাঁটতে বের হই। ছোট্ট জায়গা, চারপাশে পাহাড়, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে থাকার জন্য কাঠের তৈরি কটেজ ও কিছু দোকানপাট। প্রচুর পাহাড়ি ফল পাওয়া যায় এখানে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। এখানে ইলেকট্রিসিটি নেই। সোলার বিদ্যুৎ আছে সব কটেজে। রাত ১২টা পর্যন্ত চলে। বগালেকের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো পাহাড়ি জীবনযাত্রা। আশপাশে বসবাসকারী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন, ঘরবাড়ি, পোশাক, খাবার ও সংস্কৃতি পর্যটকদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা এনে দেয়। রাতের বগালেক অসাধারণ। গভীর রাত পর্যন্ত হাঁটাহাঁটি করে ঘুমিয়ে পড়ি। ভোরে উঠতে হবে সুনসাংপাড়া যাওয়ার জন্য।

খুব ভোরে উঠে দরজা খুলতেই বগালেকের শান্ত জল, ভোরের কুয়াশা আর মেঘ–পাহাড়ের সম্মিলন দেখে বিমোহিত।

শুরু হলো সুনসাংপাড়ার উদ্দশে যাত্রা। সকাল ৬টায় আমাদের গাড়ি স্টার্ট হলো। কেওক্রাডং ও সুনসাংপাড়ার রাস্তা বান্দরবানের পাহাড়ি ভ্রমণের অন্যতম রোমাঞ্চকর অংশ। বগালেক পেরিয়ে সামনে এগোতে থাকলে শুরু হয় আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। কখনো খাড়া উঁচু পথ, কখনো সরু রাস্তা, আবার কখনো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া পথ—প্রতিটি বাঁকেই যেন নতুন কোনো দৃশ্য অপেক্ষা করে থাকে।

পথের দুই পাশে ঘন সবুজ পাহাড়, বাঁশঝাড় ও বিভিন্ন পাহাড়ি গাছপালা। কোথাও পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট ঝিরি, কোথাও দূরে দেখা যায় একের পর এক পাহাড়ের সারি। কখনো গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তখন অনুভব করি নীরবতা। চারপাশের নীরবতা এতটাই গভীর যে নিজের হাঁটার শব্দ কিংবা বাতাসে পাতার মর্মরধ্বনিও স্পষ্ট শোনা যায়। এই নির্জনতার কারণেই সুনসাংপাড়ার পথ ভ্রমণকারীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।

আমাদের গাড়ি যখন পাহাড়ের উঁচু অংশে উঠে যায়, তখন পেছনে তাকালে দেখা যায় বিশাল পাহাড়ি ভূদৃশ্য। কখনো পাহাড়ের চূড়া মেঘের সঙ্গে মিশে যায়, আবার কখনো দূরের পাহাড়গুলো স্তরে স্তরে সাজানো ছবির মতো মনে হয়। ৩০ মিনিট পর আমরা দার্জেলিংপাড়ায় পৌঁছাই। ছবির মতো সুন্দর গ্রাম, ভীষণ পরিচ্ছন্ন।

প্রতিটি বাড়ির সামনে ফুলের গাছ লাগানো। গ্রামের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মসৃণ রাস্তা। চারপাশে পাহাড়বেস্টিত। এখানে একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে আমরা কেওক্রাডংয়ের উদ্দেশে রওনা দিই।

কেওক্রাডং যাওয়ার পথটি শুধু গন্তব্যে যাওয়ার রাস্তা নয়—এটি নিজেই একটি অভিজ্ঞতা। পাহাড়ি মানুষের সহজ-সরল জীবন, ছোট ছোট ঘরবাড়ি, সবুজ প্রকৃতি এবং দীর্ঘ নির্জন পথ মিলিয়ে এখানে আমরা শহুরে জীবনের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিবেশ অনুভব করি। কেওক্রাডংয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় পথ যত দুর্গম হয়, ভ্রমণের রোমাঞ্চও তত বাড়তে থাকে। কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে চারপাশের বিশাল পাহাড়ি দৃশ্য দেখা—এই অনুভূতিই পুরো যাত্রাকে স্মরণীয় করে তোলে।

বগালেক থেকে কেওক্রাডং—এই পাহাড়ি পথ যেন প্রকৃতির সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হওয়ার এক অসাধারণ যাত্রা। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমরা পৌঁছে যাই ৩ হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় কেওক্রাডংয়ের চূড়ায়। পাহাড়টা সেনাবাহিনী–নিয়ন্ত্রিত থাকায় ট্যুরিস্ট টোকেন দেখে ভেতরে ঢুকতে দেয়। ছোট্ট একটু চূড়া একটামাত্র কটেজ। লালা কটেজ। গাড়ি থেকে নেমে হেঁটেই চূড়ায় উঠি। চূড়া থেকে ভারতের মিজোরাম দেখা যায়। অপর পাশে মায়ানমার। যত দূর চোখ যায়, স্তরে স্তরে পাহাড় সাজানো।

কেওক্রাডং একসময় দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ছিল। পরে জরিপ করে প্রমাণিত হয় তাজিংডং দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। যদিও বেসরকারিভাবে সাফা হাফংয়ের কথা প্রচলিত আছে।

কিছুক্ষণ থাকার পর রওনা দিই শেষ গন্তব্য সুনসাংপাড়ার উদ্দেশে। এ যাত্রা ভীষণ ভয়ংকর। সুনসাংপাড়া বর্তমান সময়ের ভ্রমণপিয়াসীদের কাছে এক অপার বিস্ময়। কেওক্রাডং পাহাড়ের গা ঘেঁষে থাকা বম সম্প্রদায়ের এই গ্রামটি একই সঙ্গে শান্ত, দুর্গম আর বৈচিত্র্যময়। পাসিংপাড়া থেকে রোমাঞ্চকর ও খাড়া ডাউনহিল রাস্তা ধরে নামলেই চোখে পড়বে আদিবাসীদের সুন্দর ঘরবাড়ি, সবুজ জুমখেত আর চারপাশের মেঘের খেলা। নির্জন প্রকৃতি উঁচু–নিচু রাস্তা, বাইকারদের কাছে ভীষণ প্রিয়। কিছু জায়গায় রাস্তা এতটাই খাড়া যেন রোলার কোস্টারের মতো। আমাদের ড্রাইভারও বেশ দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন।

আধা ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাই সুনসাংপাড়ায়। অসাধারণ গ্রাম। তখন সকাল ১০টা। পর্যটকে ভরা। বিশেষ করে বাইকাররা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাইক রাইড করে এসেছেন। ফলমূল, আদিবাসীদের বানানো হরেক রকমের পিঠা, নানান রকমের খাবার, হাতে বানানো চাদরসহ নানান পসরা নিয়ে বসে আছেন। আমরা হেঁটে হেঁটে উপভোগ করছি আদিবাসীদের জীবনযাত্রা। যেদিকে তাকাই, স্তরে স্তরে পাহাড় সাজানো। দূরে মিজোরাম দেখা যায়। এখানে কোনো নেটওয়ার্ক নেই। রাত্রিযাপনের জন্য অল্প কিছু কটেজ আছে। নেটওয়ার্ক না থাকায় আগে লোক পাঠিয়ে বুক করতে হয়। সেনাবাহিনী–নিয়ন্ত্রিত সুনসাংপাড়ার পরে আর পর্যটকদের যাওয়ার অনুমতি নেই।

পাহাড়ি ঢাল, মেঘের মিতালি এবং আঁকাবাঁকা রাস্তার পাশাপাশি সুনসাংপাড়ার চমৎকার ডাউনহিল ও খাড়া পাহাড়ি পথ ভীষণ রোমাঞ্চকর। চারপাশের সবুজ পাহাড়, বনজঙ্গল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এই এলাকার প্রধান বৈশিষ্ট্য। পাড়াটিতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসবাস এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রা উপভোগ করছি। এখানকার মানুষ সাধারণত কৃষিকাজ ও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বিভিন্ন জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। পাহাড়ের ঢাল, ঝিরি-ঝরনা এবং নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ সুনসাংপাড়াকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। শান্ত, নিরিবিলি ও পরিচ্ছন্নতার কারণে পাড়াটির প্রকৃতি বিশেষভাবে মনোমুগ্ধকর।

এবার ঘরে ফেরার পালা। ১২টার দিকে রওনা দিলাম। যেখানে যেখানে যাওয়ার সময় আর্মি ক্যাম্পে এন্ট্রি করেছিলাম, ঠিক একই জায়গায় আবার এক্সিট এন্ট্রি করে রুমা বাজারে গাইডকে নামিয়ে ৬টায় বান্দরবান শহরে। রাত ৮টার বাসে ঢাকায়। রোববার যথাসময়ে অফিসে উপস্থিত।

লেখক: মারুফ হোসেন, পর্যটক ও বেসরকারি চাকরিজীবী