বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সেন্ট মার্টিনের লঞ্চঘাটে নেমে অপরূপ সৌন্দর্য দেখে আত্মহারা হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল, আমি এসেছি একটি ভিন্ন রাজ্যে। সারি সারি নারকেলগাছের দৃশ্য লঞ্চঘাটসংলগ্ন সমুদ্রসৈকতগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। কেউ গোসল করছে, কেউ সাইকেল চালাচ্ছে, কেউ ফুটেজ নিচ্ছে, কেউবা ক্যামেরাবন্দী হচ্ছে। আর পুরো সেন্ট মার্টিনের চারপাশই সমুদ্রের নীল জলরাশিবেষ্টিত। এসব দেখার পর সেন্ট মার্টিনের লঞ্চঘাট থেকে অটোরিকশায় করে আমরা একটা আবাসিক হোটেলে উঠি। একটু রেস্ট নিয়ে ঘুরতে বের হই এক স্বর্গময় রাজ্য সেন্ট মার্টিনের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে।

আবাসিক হোটেলের গেট থেকে শুরু করে সেন্ট মার্টিনের সৈকতগুলোর অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করতে থাকি। দেখতে পারি সেন্ট মার্টিনের বালুকাবেলায় নিত্য আছড়ে পড়ছে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে ধেয়ে আসা বঙ্গোপসাগরের উচ্ছ্বল ঊর্মিমালা। এটা দেখতে দেখতেই সন্ধ্যা হয়ে আসে। আজানের সঙ্গে সঙ্গে সূর্যও যেন সমুদ্রের বুকে মিশে যাচ্ছে। আর এই মিশে যাওয়ার অপূর্ব অতুলনীয় দৃশ্যগুলো উপভোগ না করলে আপনার ভ্রমণজীবনটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

সন্ধ্যা হওয়ার পর আমরা কয়েকজন বন্ধু পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখার জন্য হাঁটা শুরু করি। হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পাই, বিভিন্ন দ্রব্য আর মাছের বাজার। দ্বীপটি বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছে ভরপুর। যেখানে–সেখানে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে তরতাজা ভাজা মাছের ব্যবস্থা। ইচ্ছা করলেই টাকা দিয়ে মাছগুলো কিনে খাওয়া যায়। মাছের মধ্যে রয়েছে রূপচাঁদা, কালাচাঁদা, সুই মাছ, চিংড়ি, কোরাল, সুন্দরী, পোয়া, লইট্টা, ইলিশ, ছুরি ইত্যাদি। আছে বিভিন্ন ধরনের শুঁটকি মাছের সমাহার। মাছ ছাড়াও এখানে রয়েছে কাঁকড়া, কচ্ছপ, প্রবাল ইত্যাদি।

এখানকার ডাবের পানি অত্যন্ত সুস্বাদু। কারণ, ডাবের পানি পান করার সময় অতুলনীয় স্বাদ পেয়েছিলাম। কক্সবাজারের ডাবের পানি আর সেন্ট মার্টিনের ডাবের পানির স্বাদের রাত–দিন পার্থক্য। এ জন্য সেন্ট মার্টিনে যদি কখনো ভ্রমণে যান, তাহলে ডাবের পানি পান করতে ভুল করবেন না। রাত ১০টা পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করার পর আমরা হোটেলে ফিরে আসি।

পরের দিন, অর্থাৎ ১০ ডিসেম্বর নাশতা খাওয়ার পরই পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখার জন্য বের হয়ে পড়ি। যেখানেই যাই দেখতে পাই, দল বেঁধে আছে নারকেলগাছগুলো, একাধিক মসজিদ-মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, হাসপাতাল, অস্থায়ী বিজিবি ক্যাম্প, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, বিভিন্ন ধরনের রিসোর্ট, আবাসিক হোটেল, বাজার ইত্যাদি। এদিন বিকেলে আমরা কয়েকজন সাঁতার কাটার প্রতিযোগিতা করি। উঁচু উঁচু ঢেউ আসছিল আর ঢেউয়ের সঙ্গে আমরা লাফ দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছিলাম আবার ভেসে উঠছিলাম। সমুদ্রের বুকে নোনাপানির নীল জলরাশিতে সাঁতার কেটে জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ উপভোগ করেছি। মনে করেছিলাম পানি ঠান্ডা, বাস্তবে সমুদ্রের পানি ঠান্ডা নয়।

default-image

এরপর পোশাক পরিবর্তন করে আবার ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি সেন্ট মার্টিন দ্বীপে। সমুদ্রের বুকে বিকেল ও সূর্যাস্তের সময় হচ্ছে আনন্দ উপভোগ করার শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় দেখি কেউ কেউ ঝিনুক-শামুকের মালা বিক্রি করছে। মালাগুলো দেখতে খুব সুন্দর। কিনেছিলাম আমরা। ঘুরতে ঘুরতে সেন্ট মার্টিনের বুকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। রাত যত গভীর হয়, সেন্ট মার্টিনের সমুদ্রের গর্জন ততই বাড়তে থাকে। এভাবে গভীর রাত পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনের চারদিকে সমুদ্রের গর্জন উপভোগ করেছিলাম। এদিন রাতে আমরা কোরাল মাছের বারবিকিউ খেয়েছিলাম। সেন্ট মার্টিনের বারবিকিউয়ের মজা অসাধারণ।

পরের দিন, অর্থাৎ ১১ ডিসেম্বরের সকালে আমরা ইঞ্জিনচালিত ডিঙিনৌকায় সেন্ট মার্টিন থেকে ছেঁড়াদ্বীপের উদ্দেশে রওনা হই। এই ছেঁড়াদ্বীপ সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে অতুলনীয় সৌন্দর্য দিয়েছে। এই ছেঁড়াদ্বীপে না এলে আপনি সেন্ট মার্টিনের অপূর্ব সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হবেন। এখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গুল্মলতার সমাহার, কিছু ছোট ছোট গাছ, ঝাউবন, অসংখ্য প্রবাল ইত্যাদি। ছেঁড়াদ্বীপে স্বচ্ছ নীল জলরাশির আস্তানা রয়েছে। এই স্বচ্ছ নীল জলরাশিতে গোসল করে খুবই মুগ্ধ হয়েছি। এখান থেকে মিয়ানমার সীমান্ত মাত্র আট কিলোমিটার দূরে। এর মানে মিয়ানমারকে দেখা যায়।

এখানকার পানি স্বচ্ছ নীল ও অতুলনীয়। এভাবে ছেঁড়াদ্বীপে প্রায় দুই ঘণ্টা থাকার পর একই ডিঙিনৌকায় সেন্ট মার্টিনে ফিরে এলাম। তবে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সমুদ্রবিলাস বাড়িটি দেখার খুব ইচ্ছা ছিল। সম্ভব হয়নি দারুচিনি দ্বীপের সমতুল্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সমুদ্রবিলাস বাড়িটি দেখা।

default-image

এরপর বেলা তিনটায় আমরা কর্ণফুলী জাহাজে করে সেন্ট মার্টিন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দিলাম। জাহাজ চলার সময় এর ছাদে একটি দল গানের সঙ্গে নাচছিল। তাদের আনন্দ দেখে আমিও আনন্দে মেতেছিলাম। তবে ভয়ও পেয়েছিলাম। কারণ, বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে আসলে ঝড় হওয়ার আশঙ্কা ছিল। একসময় প্রবল বাতাসের বেগে সমুদ্রের পানি লঞ্চের ওপরে এসে আমাদের ভিজিয়ে দিয়েছিল। রাত নয়টায় কক্সবাজার শহরে পৌঁছালাম। এরপর খাবার খেয়ে আমরা রাত ১০টায় সেন্ট মার্টিন এসি পরিবহনে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম। ১২ ডিসেম্বর সকাল ৮টায় বাস ঢাকার শ্যামলীতে পৌঁছাল। এভাবে ২০২১ সালের ৭ থেকে ১২ ডিসেম্বর সেন্ট মার্টিনে শিক্ষাসফর আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মরণীয় শিক্ষাসফর। তবে ছেঁড়াদ্বীপ ছেড়ে আসতে খুব কষ্ট হয়েছিল। ভেবেছিলাম, বাড়ি বানিয়ে যদি সারা জীবন এখানে কাটিয়ে দিতে পারতাম! সেন্ট মার্টিন আর ছেঁড়াদ্বীপকে আমার কাছে মনে হয়েছিল একটি স্বর্গময় নীল জলরাশির রাজ্য।

বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে আপনিও এ স্বর্গময় নীল জলরাশির রাজ্য থেকে ঘুরে আসতে পারবেন। প্রথমে বাসযোগে কক্সবাজার পৌঁছাতে হবে। কক্সবাজার শহরের ৬ নম্বর ঘাট থেকে জাহাজযোগে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যেতে পারবেন। আর কক্সবাজার থেকে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়ে টেকনাফ গিয়ে জাহাজ, স্পিডবোট, এমনকি ট্রলারযোগেও এই স্বর্গময় নীল জলরাশির রাজ্যে ভ্রমণ করতে পারবেন। সে জন্য ভ্রমণপিপাসুরা আসুন যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে একটু আনন্দ-বিনোদনের জন্য অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র ‘সুশীতল স্বর্গময় নীল জলরাশির রাজ্য’ নামে খ্যাত কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ দেখে আসি।


*লেখক: শিক্ষার্থী, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, ঢাকা

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন