বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষা সফরে আমরা প্রশিক্ষকসহ ১৭ জন ৭ ডিসেম্বর রাত ১০টায় বাসে করে ঢাকার কল্যাণপুর থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। ৮ ডিসেম্বর সকাল আটটায় কক্সবাজারের কলাতলীর মোড়ে পৌঁছাই।
এরপর একটি আবাসিক হোটেলে উঠি। ফ্রেশ হয়ে এবং সকালের নাশতার পর সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে ঘোরাঘুরি করি। এ পয়েন্টে একটি ঝিনুক মার্কেটও রয়েছে। এ মার্কেটে শামুক-ঝিনুকের তৈরি জিনিসপত্র ছাড়াও দেশি-বিদেশি বাহারি রঙ্গের দ্রব্যসামগ্রীও পাওয়া যায়। লাবণী পয়েন্টের সৈকতে দেখতে পাই, হাজারো পর্যটক বিভিন্ন আনন্দে মেতেছেন। এখানে তরুণ-তরুণী, নব্য দম্পতি, মধ্যবয়সীরা সমুদ্রতীরে ঢেউয়ের মধ্যে সাঁতার কাটছেন, কেউ আনন্দে উল্লসিত হয়ে হেলেদুলে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছেন। এরূপ রোমাঞ্চকর পরিবেশে সমুদ্রের গর্জন দেখে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ গোসল ও সাঁতার কাটেন। দেখা যায়, কেউ কেউ স্পিডবোটযোগে উঁচু ঢেউয়ের মধ্যে দিয়ে সমুদ্রের পানিতে মিশে যাচ্ছেন, আবার ভেসে উঠছেন।

এরপর হোটেলে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম শেষে বেলা তিনটায় সবাই হিমছড়ি দিয়ে ইনানী বিচের প্রবাল পাথর দেখতে রওনা দিলাম। কলাতলী থেকে হিমছড়ি প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। গাড়ির মধ্য থেকেই আমরা দেখতে পেলাম, একপাশে ঘরবাড়ি আর অপর পাশে সমুদ্রতীর। বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে সারি সারি গুল্মলতা–ঝাউবনের দৃশ্য আর সেখানে সাগরের ঢেউ এসে উপচে পড়ছে। আর এর মধ্যে পুরোনো পাহাড়ধসের উঁচু–নিচু স্থানগুলো দেখতে পাওয়া যায়। এখান থেকে ইনানী প্রায় ছয়-সাত কিমি দূরে।

ইনানী সৈকতে যাওয়ার সময় বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে মুগ্ধ হই। সে যেন এক অপূর্ব সৌন্দর্য মিশে আছে সাগরের বুকে। ইনানী বিচে দেখতে পাই অসংখ্য ছোট–বড় প্রবাল পাথর। এসব পাথরের খণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে কেউ সেলফি তুলছেন, কেউবা বসে আছেন, কেউবা পানিতে ভিজে ফুটেজ নিচ্ছেন, কেউ সমুদ্রের নীল–স্বচ্ছ পানিতে ভিজছেন, কেউবা হাঁটাহাঁটি করছেন। তবে এখানে একটু অসাবধান হলেই যেকোনো সময় বিপদ হতে পারে। কারণ, পাথরগুলো খুবই ধারালো ও তীক্ষ্ণ। তাই একটু সাবধানে চলাই ভালো। ইনানী বিচের উঁচু উঁচু ঢেউয়ের তালে তালে পাথরগুলো পানিতে নাচছিল।

default-image

সে এক অপূর্ব মায়াবী সৌন্দর্য, যা শুধু দেখতেই ইচ্ছা করে। এরপর বিকেল গড়িয়ে যখন সূর্যাস্তের সময় হচ্ছিল, তখন ইনানী সৈকত আরও সুন্দর হয়ে উঠছিল। আর সমুদ্রের বুকে সূর্যাস্ত যে কী ধরনের সৌন্দর্য বহন করে, তা স্বচক্ষে না দেখলে অনুভব করা খুব কঠিন। এভাবে বিকেল গড়িয়ে সমুদ্রের বুকে সূর্যাস্ত হলো। আমরা জ্যোৎস্নায় আলোকিত রাতে একটু ঘোরাঘুরি করে ৯টার দিকে হোটেলে ফিরলাম। তবে গভীর রাতে আমি আর আমার সহপাঠী স্বপন দুজনে মিলে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন দেখতে গিয়েছিলাম লাবণী সৈকতে। কী এক অপরূপ ভয়ংকর সাগরের গর্জন, আমাদের মুগ্ধ করেছিল। এসব অতুলনীয় দৃশ্য কখনো ভুলতে পারব না।

পরদিন ৯ ডিসেম্বর ফজরের আজানের সময় ঘুম থেকে উঠলাম। ফ্রেশ হয়ে সবাই সাড়ে পাঁচটায় অটোরিকশায় করে কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএর ৬ নম্বর লঞ্চঘাটে পৌঁছালাম। আগেই আমাদের টিকিট কাটা ছিল এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস জাহাজে। তবে টিকিট কাটার সময় আপ–ডাউন কাটতে হয়।

default-image

এরপর সকাল সাতটায় জাহাজ ছেড়ে দিল। জাহাজ এক ঘণ্টা চলার পর ভাটার কারণে ডুবোচরে প্রায় চার ঘণ্টা আটকে ছিল। যখন সাগরে জোয়ার এল, তখন জাহাজ আবার চলা শুরু করল। জাহাজের রেলিং ধরে ব্যালকনিতে বসেছিলাম। প্রখর রোদ মাথায় পড়ল। তবু একটুও ক্লান্ত হয়নি। কারণ, সাগরের নীল পানির অশান্ত ঢেউয়ের সঙ্গে জাহাজের চলার ঘর্ষণে ঢেউগুলো আরও চমৎকার দেখাচ্ছিল। বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে দিনের বেলায় দেখতে পেলাম চাঁদের ঝলকানি, আমি বিস্মিত হলাম। কারণ, দিনের বেলায় চাঁদ দেখার ঘটনা আমার জীবনে এই প্রথম। সাগরের বুকে দিনের বেলায়ও চাঁদ দেখা যায়, এ অভিজ্ঞতা ছিল না আমার। দূর থেকে সমুদ্রের তীরে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে পেলাম। পাহাড়টির গঠন এমন, যেন মনে হলো একজন অবিকল মানুষ শুয়ে আছে, মাঝেমধ্যে স্বচ্ছ পানির মধ্যে উড়ুক্কু মাছের লাফালাফি আর জাহাজের চারপাশে গাংচিলগুলোর ওড়াউড়ির দৃশ্য আমাকে অট্টহাসিতে মুগ্ধ করে দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমি এসেছি একটি স্বর্গময় সুশীতল রাজ্যে। চলবে...


*লেখক: মো. আতাউর রহমান সুজন, শিক্ষার্থী, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, ঢাকা

ভ্রমণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন