বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট চালু না হওয়ার কারণ ও সমাধানের উপায়
রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (আরইআইটি) হলো একটি আর্থিক ব্যবস্থা; যার মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় আকারের আবাসন বা বাণিজ্যিক সম্পদে ক্ষুদ্র অঙ্কের অর্থ শেয়ারের মতো বিনিয়োগ করে নিয়মিত লভ্যাংশ আয় করতে পারেন। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মাথার ওপর ছাদের সংস্থান করা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে দেশের আবাসন খাতও দীর্ঘদিন ধরে অর্থায়নের সংকটে ভুগছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল বহু দেশে আরইআইটি আবাসনসংকট নিরসন ও পুঁজিবাজারের প্রাণচাঞ্চল্য ফেরাতে বড় ভূমিকা রাখলেও বাংলাদেশে এটি বাস্তবে রূপ নিতে পারেনি।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২৪ সালে ‘রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট ফান্ড বিধিমালা, ২০২৪’ অনুমোদন করলেও আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও বাজারকেন্দ্রিক নানা জটিলতার কারণে দেশে এখনো কোনো আরইআইটি ফান্ড কার্যকরভাবে আলো দেখেনি।
আরইআইটি চালুর ক্ষেত্রে প্রধান যেসব প্রতিবন্ধকতাগুলো সামনে আসে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
কঠোর ও উচ্চ মূলধনি শর্তাবলি: বিএসইসির নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, একটি আরইআইটি ফান্ড গঠনের জন্য ন্যূনতম ২০০ কোটি টাকার মূলধন প্রয়োজন, যা সিটি করপোরেশন এলাকার প্রকল্পের ক্ষেত্রে ৩০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ফান্ড ম্যানেজারের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ২০ কোটি টাকা হওয়া বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের পটভূমিতে স্পনসর ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর জন্য এত বিশাল অঙ্কের নগদ মূলধন এককালীন জোগাড় করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
জমি নিবন্ধন ও দ্বৈত কর–ব্যবস্থার চাপ: বাংলাদেশে জমি বা প্রপার্টি কেনাবেচা ও হস্তান্তরে অত্যন্ত চড়া স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয়, যা মোট মূল্যের ১০ থেকে ১২ শতাংশ। ট্রাস্টের নামে প্রপার্টি হস্তান্তরের সময় এই চড়া ফি পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া পরবর্তী সময় ট্রাস্ট থেকে লভ্যাংশ বিতরণের ক্ষেত্রে করসংক্রান্ত অস্পষ্টতা ও দ্বৈত করের ঝুঁকি থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এতে উৎসাহিত হচ্ছেন না।
উৎস থেকে আয়ের নিম্ন হার: আরইআইটি সফল হওয়ার মূল শর্ত হলো প্রপার্টি থেকে আসা নিয়মিত ভাড়া বা ক্যাশ ফ্লো। বাংলাদেশে ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক স্পেসের ক্রয়মূল্যের তুলনায় ভাড়ার হার অত্যন্ত কম—গড়ে ৩ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যাংক আমানত বা সরকারি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ৯ থেকে ১২ শতাংশের বেশি। ফলে কম রিটার্নের আরইআইটি–এ সাধারণ বিনিয়োগকারী বা প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল আকৃষ্ট করা কঠিন।
স্বচ্ছতার অভাব ও অনিবন্ধিত প্রপার্টি: আরইআইটি গঠনের জন্য প্রপার্টির টাইটেল (স্বত্ব) পুরোপুরি নিষ্কণ্টক ও মূল্যায়ন স্বচ্ছ হওয়া আবশ্যক। বাংলাদেশের আবাসন খাতে প্রায়ই মিউটেশন জটিলতা, জমির আইনি ঝামেলা ও প্রপার্টির প্রকৃত বাজারমূল্য গোপন করার প্রবণতা দেখা যায়। নিরপেক্ষ ও বিশ্বস্ত ভ্যালুয়েশন প্রতিষ্ঠানের অভাব ও প্রপার্টির সঠিক মূল্য নির্ধারণের অনিশ্চয়তা আরইআইটি চালুর পথে বড় বাধা।
পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি মন্দা ও আস্থার সংকট: আরইআইটি ফান্ডের ইউনিটগুলো স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়ে লেনদেন হওয়ার কথা। কিন্তু দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অস্থিরতা, তারল্যসংকট ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাবের কারণে নতুন কোনো জটিল আর্থিক প্রোডাক্ট বাজারে আনা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
নীতিগত সমন্বয়হীনতা ও সচেতনতার অভাব: বিএসইসি বিধিমালা প্রণয়ন করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), রাজউক ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিত কোনো নীতিমালা বা বিশেষ করছাড় (ট্যাক্স ইনসেনটিভস) তৈরি হয়নি। পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারী ও আবাসন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আরইআইটির কার্যকারিতা নিয়ে পর্যাপ্ত ধারণা বা সচেতনতা নেই।
কম রেন্টাল ইল্ড ও সুদের হারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত সমাধান
কম রেন্টাল ইল্ড ও উচ্চ সুদের হারের বিপরীতে বাংলাদেশে আরইআইটিকে আকর্ষণীয় ও সফল করতে নীতিগত, করসংক্রান্ত ও কৌশলগত পরিবর্তনের মাধ্যমে রিটার্ন বাড়ানোই হতে পারে মূল সমাধান। এ জন্য যেসব উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে—
বিশেষ কর অব্যাহতি: আরইআইটি ফান্ড এবং এর লভ্যাংশের ওপর সম্পূর্ণ বা আংশিক কর ছাড় দেওয়া। আরইআইটি থেকে প্রাপ্ত আয়কে করমুক্ত ঘোষণা করলে ৩ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ রেন্টাল ইল্ডের সঙ্গে প্রপার্টির সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি যুক্ত হয়ে মোট প্রকৃত রিটার্ন ব্যাংকের আস্ত আমানতকে টেক্কা দিতে পারবে।
সম্পত্তি হস্তান্তর ও স্ট্যাম্প ডিউটি মওকুফ: বর্তমানে জমি বা প্রপার্টি হস্তান্তরে ১০ থেকে ১২ শতাংশ রেজিস্ট্রেশন ও স্ট্যাম্প ফি দিতে হয়। আরইআইটির অধীনে প্রপার্টি হস্তান্তরের সময় এই ফি ১ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনলে এককালীন খরচ ব্যাপকভাবে কমবে এবং বিনিয়োগের শুরুতেই নিট রিটার্ন বৃদ্ধি পাবে।
মিশ্র ফান্ড মডেল: কেবল আবাসিক ফ্ল্যাটের ওপর নির্ভর না করে আরইআইটি ফান্ডের পোর্টফোলিওতে লজিস্টিকস হাব, গুদামঘর (ওয়্যারহাউসিং), ডেটা সেন্টার ও প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক বাণিজ্যিক স্পেস যুক্ত করা, যেখানে ভাড়ার হার সাধারণত ৭ থেকে ৯ শতাংশ বা তার বেশি হয়ে থাকে।
মূলধন বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দেওয়া: প্রপার্টির ভাড়ার পাশাপাশি জমির মূল্যবৃদ্ধির সুফলকে বার্ষিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শেয়ার মূল্যে প্রতিফলিত করা। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশে প্রপার্টির দাম গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ে, যা বিনিয়োগকারীদের মোট রিটার্ন অনেক বাড়িয়ে দেবে।
উচ্চ লিভারেজ ও স্বল্পমূল্যে অর্থায়ন: আরইআইটি ফান্ডগুলোকে নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যাংক বা বন্ডের মাধ্যমে কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া, যাতে তারা লাভজনক প্রপার্টি কিনে ইকুইটি রিটার্ন বাড়াতে পারে।
সহজ কাঠামোর মিশ্র ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট: আবাসন প্রপার্টির পাশাপাশি অবকাঠামো (যেমন: টোল রোড, রিনিউয়েবল এনার্জি প্রজেক্ট) থেকে আসা উচ্চ ক্যাশ ফ্লো সংমিশ্রণ করে হাইব্রিড মডেল তৈরি করা, যা গড় রিটার্ন ৯ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করতে সাহায্য করবে।
সাধারণ মানুষের আবাসনসংকটে আরইআইটির সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পথরেখা
যদি উপরোক্ত সমাধানের মাধ্যমে ও সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে দেশে কার্যকরভাবে আরইআইটি চালু করা সম্ভব হয়, তবে এটি আবাসন খাতে বহুবিধ ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। যেমন:
ক্ষুদ্র বিনিয়োগের সুযোগ: মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে সাধারণ মানুষ রিয়েল এস্টেট খাতের অংশীদার হতে পারবে এবং প্রপার্টির মূল্যবৃদ্ধির সুফল পাবে।
সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ: ডেভেলপাররা ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ করে বড় আকারের কম খরচের আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে।
খাতের স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা: আরইআইটি ব্যবস্থার কারণে প্রপার্টি কেনাবেচা ও ব্যবস্থাপনায় পেশাদারত্ব ও আইনি স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক হবে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে আবাসনসংকট নিরসন ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফেরাতে আরইআইটি চালুর বিকল্প নেই। আইনগত বিধিমালা থাকলেও বাস্তবে বাজার উপযোগী করতে সরকারের নীতিগত ছাড়, রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো এবং বিএসইসি, এনবিআর ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
লেখক: অমিত চক্রবর্ত্তী, আবাসন খাতের অভিজ্ঞ বিপণন পেশাজীবী; পরিচালক (মার্কেটিং), রূপায়ণ গ্রুপ