৪০ বছর ধরে কোরবানির ভোজ: নিছক খাওয়া নয়, আনন্দ ভাগাভাগির আয়োজন

কোরবানির ঈদ এলেই চারদিকে মাংস বিতরণের ব্যস্ততা দেখা যায়। কিন্তু চার দশক আগে ব্যবসায়ী মাসুদুল আলম চাকলাদার (মৃত্যু: ২০০০) একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। সেটা হলো, শুধু কোরবানির মাংস হাতে পেলেই দরিদ্র মানুষের ঈদের আনন্দ পূর্ণ হয় না। কেননা অনেকের ঘরে সেই মাংস রান্না করার মতো তেল, লবণ, মসলা কিংবা প্রয়োজনীয় উপকরণ থাকে না।

সেই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। মাংস বিতরণের বদলে দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে রান্না করা খাবার খাওয়ানোর আয়োজন। ৪০ বছর আগে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল একটি গরু কোরবানি দিয়ে, সেটিই আজ পরিণত হয়েছে হাজারো মানুষের মিলনমেলায়।

রাজধানীর মগবাজারের মধুবাগ এলাকার চাকলাদার হাউসের উদ্যোগ গঠিত চাকলাদার ফাউন্ডেশন এমন আরও অনেক জনহিতকর কাজ করে যাচ্ছে। রোজার সময় প্রতিদিন অনেক মানুষের জন্য ইফতারের ব্যবস্থাও করে তারা। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়ও এই বাড়ির ফটকে দরিদ্র মানুষের ভিড় দেখা গেছে। তারাও তখন মানুষকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করেছে বলেই স্থানীয় মানুষেরা জানান।

চাকলাদার পরিবারের সদস্যরা জানান, শুরুতে আয়োজন ছিল ছোট পরিসরে। একটি গরুর মাংস রান্না করে এলাকার দরিদ্র মানুষকে খাওয়ানো হতো। সময়ের সঙ্গে মানুষের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে আয়োজনের পরিধিও। বর্তমানে চারটি গরু কোরবানি দেওয়া হয়। প্রায় ১২ মণ মাংস ও ৩০০ কেজি চাল দিয়ে প্রায় ২৫টি ডেকে বিরিয়ানি রান্না করা হয়েছে এবার। ঈদের পরদিন দুপুর ১২টা থেকে শুরু হয় পরিবেশন।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আয়োজকদের ভাষায়, এটি শুধু খাবার বিতরণ নয়; বরং অতিথি আপ্যায়নের উৎসব। কারও কাছে আলাদা করে নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয় না। ৪০ বছর ধরে অনেকে বংশপরম্পরায় এই অনুষ্ঠানে আসছেন। এত দিনের ধারাবাহিকতায় এই আয়োজনের খবর এখন আশপাশের বহু মানুষই জানেন। এভাবেই এ আয়োজনের খবর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।

এবার প্রায় তিন হাজার মানুষ এই ভোজে অংশ নেন। নারী, পুরুষ, শিশু, শ্রমজীবী মানুষ—সবার জন্যই থাকে সমান আয়োজন।

এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে সুশৃঙ্খলভাবে খাওয়ানো সহজ কাজ নয়। আয়োজকেরা জানান, স্থানীয় থানা প্রশাসন ও পুলিশ সদস্যরা প্রতিবছর সহযোগিতা করেন। তাঁদের সহায়তায় মানুষের দীর্ঘ সারি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

চাকলাদার পরিবারের সদস্যদের মতে, এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য কেবল খাওয়া নয় বরং ঈদের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া। তাঁরা আশা করেন, আগামী প্রজন্মও এই মানবিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।