শ্রীলঙ্কার রাজনীতি এখন কোনো পথে

বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে শ্রীলঙ্কাছবি: রয়টার্স

বিশ্ব রাজনীতির চোখ এখন দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার দিকে, বিশেষ করে, চলতি মাসের ৯ তারিখে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ্র রাজাপক্ষের পদত্যাগের পর শ্রীলঙ্কার রাজনীতি আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে। মূলত দেশটির অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারণে আজ এ অবস্থা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেই বললেই চলে, দেশটির খাদ্যসংকট চরমে, জ্বালানিসংকট তীব্র, কৃষির উৎপাদন আশানুরূপ নয়। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস ছিল পর্যটনশিল্প।

সমুদ্রবেষ্টিত অপরূপ সৌন্দর্য ও নয়নাভিরাম দৃশ্যের এ দেশটির সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আসত পর্যটকদের কাছ থেকে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে দ্বিতীয় স্থানে ছিল বিদেশি শ্রমবাজার। প্রতিবছর বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ করে বহু বৈদেশিক মুদ্রা তথা প্রবাসী আয় পেত দেশটি। সর্বনাশা কোভিড-১৯ প্রায় দুই বছর বিশ্বের বহু দেশের মতোই শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকেও লন্ডভন্ড করে দিয়েছে।

শ্রীলঙ্কা দেশটি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্দশার মুখে পড়েছে। কয়েক মাস ধরে খাবার, জ্বালানি ও ওষুধের তীব্র সংকট চলছে
ছবি: রয়টার্স

বিদেশি পর্যটক শূন্য এ দেশটিতে পর্যটনশিল্পের আয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বিদেশি শ্রমবাজারেও নামে দারুণভাবে ধস, ফলে টালমাটাল অবস্থায় পড়ে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি, তার ওপর যোগ হয় সরকারের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপব্যয়, অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প, স্বজনপ্রীতি, অপচয় প্রভৃতি, ঠিক যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। দীর্ঘদিন যাবৎ খাদ্যশস্যের ঘাটতি। খাদ্যশস্য এবং জ্বালানিসংকট মোকাবিলার জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করার মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেই বললেই চলে। ইতিমধ্যেই দেশটি গত বছর নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার খাদ্যবাজারে চরম সংকট দেখা দিয়েছে।

সেখানে এক কেজি চালের মূল্য বর্তমানে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় পাঁচশত টাকা, এক কেজি আলুর মূল্য বাংলাদেশি টাকায় প্রায় আড়াইশো টাকা। নিত্যপণ্যের মূল্য এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে তা জনগনের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। অনেক প্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না, বাজার থেকে উধাও। দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীনভাবে চলছে দেশটি।

বিদেশ থেকে যে জ্বালানি ও খাদ্যশস্য আমদানি করবে সে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও নেই। চতুর্দিকে হাহাকার, শুধু নেই নেই আর নেই, পয়সা হলেও খাদ্যসংকটের কারণে তা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। বেকার ও অসহায়পীড়িত মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে, অথচ দীর্ঘদিন যাবৎ এই উপমহাদেশের মধ্যে সব দিক থেকে ভালো অবস্থানে ছিল শ্রীলঙ্কা এবং সব সূচকই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে ভালো ছিল শ্রীলঙ্কার, অথচ সঠিক পরিকল্পনা ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে দেশটি পুরোপুরি একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে।

২০১৯ সনে নিরঙ্কুস সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মাহিন্দ্র রাজাপক্ষের দল সরকার গঠন করেছিল, অথচ মাত্র দুই আড়াই বছরের মধ্যে মাহিন্দ্রর দলটি গণধিকৃত একটি দলে পরিণত হয়েছে। সেই এইচএসসিতে দেশপ্রেমিক কবিতা পড়েছিলাম, সেই কবিতার কথা মনে পড়ে গেল, যখন দেশপ্রেমিক শহরে প্রথমবারের মতো প্রবেশ করে তখন সবাই তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়, অথচ কিছুদিন পর যখন তার বিচার করে তাকে বদ্ধভূমিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন সবাই তাকে জুতা নিক্ষেপ করছিল, এটাই ইতিহাসের নিয়ম।

ইতিমধ্যেই গণবিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের পরামর্শে বড় ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ্র রাজাপক্ষের পদত্যাগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেও খুব সম্ভব ব্যর্থ হতে চলেছেন, শ্রীলঙ্কার বিক্ষুদ্ধ জনগণ ইতিমধ্যেই কারফিউ ভেঙ্গে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করা অব্যাহত রেখেছেন। সেখানকার জনগণ এতই বিক্ষুব্ধ যে ইতিমধ্যেই প্রায় ৩২ থেকে ৩৩ জন সংসদ সদস্যর বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করেছেন, হাজারো সরকারি–বেসরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করেছেন। ইতিমধ্যেই একজন সংসদ সদস্যসহ প্রায় আটজন মানুষ সহিংসতায় মারা গেছেন, খবরে এসেছে প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
মাহিন্দ্র রাজাপক্ষে, তাঁর পরিবার ও তাঁর পুত্রের দুর্নীতির কারণে আজকে এই রকম একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে বিরোধী দল অভিযোগ করছে।

রাজনীতি বড় নির্মম ও নিষ্ঠুর। রাজাপক্ষের পরিবার যদি দুর্নীতি না করত, তাহলে আজ শ্রীলঙ্কার সুদীর্ঘ ৫০ বছরের রাজনীতি করা দলটির এই অবস্থা হতো না। মাহিন্দ্রর পুত্রের দুর্নীতির কারণে আজ দলটির এমন চরম পরিণতি। নবাব সিরাজউদ্দৌলা নাটকের একটি সংলাপ ছিল ‘পাপ যে চাপা থাকে না হোসেন কুলী খান তা প্রাণ দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন।’ বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদ কুলী খান দুর্নীতির কারণে তাঁর একমাত্র পুত্রকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে তা কার্যকর করেন।

আসলে সেই কথাই ঠিক, ইতিহাসের বড় শিক্ষা হচ্ছে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। আর ভুলের মাশুলও দিতে হয় বহুদিন বহুভাবে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা যদি কাশিম বাজার কুটিতে গিয়ে ষড়যন্ত্রকারী মীরজাফর, রাজা রায় দূর্লভ, উঁমিচাঁদ জগৎশেঠদের হাতে নাতে ধরার পরও যদি ক্ষমা করে না দিতেন, তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো, তাঁদের ক্ষমা করে দিয়ে যে ভুলটি নবাব করেছিলেন, তার মাশুল দিতে হয়েছে বাঙালি জাতিকে যুগের পর যুগ।

নিজের গদি টেকাতে প্রেসিডেন্ট ৭৩ বছর বয়সী আইনজীবী রনিল বিক্রমাসিংহেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। ইতিমধ্যেই প্রধান বিরোধী দল তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ৯ জন মন্ত্রীও শপথ নিয়ে নিয়েছেন। সম্ভবত কয়েক দিনের মধ্যেই জানা যাবে শ্রীলঙ্কার রাজনীতি কোন পথে হাটছে।

লেখক: আইনজীবী, বগুড়া