ব্যাগের ভেতরে আব্বু!

বাবা আমাদের জীবনের প্রথম মহানায়ক
অলংকরণ: আরাফাত করিম

আমার আব্বু পুরোপুরি সুস্থ-স্বাভাবিক একজন মানুষ। বড় কোনো শারীরিক অসুস্থতা ছিল না বললেই চলে। হুট করে একদিন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। আমি ঢাকা থেকে ছুটে গেলাম চাটগাঁ। ডাক্তার বললেন, স্ট্রোক করেছেন। সেবার চট্টগ্রাম গিয়ে মেডিকেলে আব্বুর সঙ্গে ছিলাম বেশ কদিন। আব্বু একটু সুস্থ হয়ে উঠলে আমি ঢাকা ফিরি। ফেরার পর ভীষণ মন খারাপ পেয়ে বসে। তারপর একটা চিঠি লিখেছিলাম, মন খারাপের মেঘ সরে যাওয়ার আগেই। সেবার যে হাসপাতালে ভর্তি, আজও আব্বু পুরো সুস্থ হয়ে ওঠেননি।

আব্বুকে লেখা সেই চিঠি—
আব্বু! দাদা-দাদির পরে তোমাকে যদি কেউ অনেক বেশি ভালোবাসে, সেটা আমি।
আমি জানি, তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো। হয়তো কখনো বলিনি, হয়তোবা বলতে চেয়েছ। লজ্জায় পরে আর বলা হয়ে ওঠেনি। তোমার অব্যক্ত কথাগুলো, ভালোবাসার পঙ্‌ক্তিমালা, আমি আমার কল্পনায় ব্যক্ত করে ভলিউম কমিয়ে দিয়ে প্রতিদিন শুনি। পাছে কেউ কান পেতে শুনে তাই সতর্কতা!
আব্বু, শোনো...তোমার কানে কানে বলি...

হাসপাতালে যখন তোমার পাশে ছিলাম, সারা রাত নির্ঘুম থেকে তোমার মাথা কোলে নিয়ে, একবার তুমি উঠে বসতে চাও, আবার শুতে চাও...যন্ত্রণায় কতরাও...এভাবে ওঠানামা করতে করতেই রাতদিন পার করে দাও। পুরো রাত তোমার চোখে ঘুম নেই, আমার চোখেও নেই। তন্দ্রায় চোখ বন্ধ হয়ে আসে। তুমি আবার উঠে বসতে চাও। আমি আমার পায়ে বালিশ লাগিয়ে তোমার পিঠবালিশে হেলান দিয়ে বসি। ঘুম নেই কারও চোখে। হাসপাতালের উৎকট অতিষ্ঠ। মাঝেমধ্যে আমার বিরক্তি এসে যায়। অসহ্য মনে হয়। বিড়বিড় করে আপন মনে কী যেন বলি। আমি তো আর আব্বু নই, তুমি নই, যে সব যন্ত্রণা, কষ্ট, ভালোবাসা ভেবে হেসে জড়িয়ে নেব।

দুপুরে তোমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি ফিরলাম মামা-মামির বাসায়। গরম পানি দিয়ে গোসল করে নিলাম। আমার শরীরে লেগে থাকা তুমি, তোমার অদ্ভুত সুন্দর গন্ধটা ধুয়েমুছে গেছে। পৃথিবীর সব আব্বুর গায়ে একটা গন্ধ থাকে, যেটা একমাত্র তার সন্তানেরাই পায়। আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে আমার প্রিয় গন্ধ কী? আমি এতটুকুন না ভেবেই বলব ‘আব্বুর গন্ধ’, আব্বুর গায়ের অদ্ভুত সুগন্ধ। রাতের ট্রেনে ঢাকা চললাম। তুমি বিশ্বাস করবে আমি জানি—পুরো রাত আমি তোমার কথা ভেবেছি। জানালা দিয়ে রাতের আকাশ দেখি, তারার চাদরে আবৃত আকাশ, সেখানেও তুমি...চোখ বন্ধ করে অন্য জগতে ডুব দিই, ওমা, তুমি সেখানেও!

সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার হলে গিয়ে পৌঁছলাম। ব্যাগ থেকে কাপড় বের করার সময় দেখি, ওমা, তুমি!
ব্যাগের ভেতরে তুমি আছ। কাপড়ে তোমার গন্ধ লেগে আছে; আমি গোলাপের সুগন্ধ নেওয়ার মতো নাকের কাছে নিয়ে প্রাণভরে শ্বাস নিলাম। হ্যাঁ, তুমিই। তোমার জিহ্বায় ঘা হওয়ায় উৎকট একটা দুর্গন্ধ বেরোত। হাসপাতালে থাকতে সময়–সময় অসহ্য লাগত ওই গন্ধ; হলে আসার পর আমার কাপড়ে তোমার জিহ্বার সেই ঘায়ের গন্ধ আমি খুঁজি পাগল হয়ে। বেশ কয়েক দিন লাগে কাপড় থেকে তোমার চলে যেতে। তারপর একদিন তুমি গেলে। কাপড় ছেড়ে গেলে।

এই যে আমি তোমার থেকে দেড় শ মাইল দূরে বসে এখন লিখছি। তোমার ঘামের গন্ধ আমার নাকে এসে লাগছে; তোমার গন্ধ, আমার আব্বুর গায়ের গন্ধ আমার হৃদয়ের গভীরে গিয়ে ডাকছে। আব্বু, তোমার বড় ছেলে তোমায় ভালোবাসে। অনেক বেশি বাসে, এই আকাশ যতটা ধারণ করতে পারে। আব্বু, এত তাড়াতাড়ি তুমি আকাশের তারা হয়ে যেয়ো না। তোমার ছেলে যে তোমাকে আকাশটাই এনে দেবে!