এইচএসসি পুনঃপরীক্ষা: শিক্ষার্থীরা কতটা প্রস্তুত
এক থেকে দুই মাসের মধ্যে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য পুনরায় পরীক্ষা আয়োজন করতে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হতে যাচ্ছে। ফলে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে একটি বছর হারিয়ে যাবে না। তাঁদের পরবর্তী পরীক্ষার জন্য এক বছর অপেক্ষা করতে হবে না। ২০২৬ সালে পুনরায় এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন অকৃতকার্য শিক্ষার্থী।
গত ৩১ অক্টোবর দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
২০০৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এ বছর অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী। সবচেয়ে বেশি পাসের হার ঢাকা বোর্ডে, ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ; আর সবচেয়ে কম বরিশাল বোর্ডে, ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এবার উচ্চমাধ্যমিকে ১৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছেন এবং ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
অকৃতকার্য ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন মোট ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন। এর মধ্যে মাত্র একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০ জন এবং দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫ জন শিক্ষার্থী। বিষয়ভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৪০ দশমিক ৯৯ শতাংশ বা ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন শিক্ষার্থী ইংরেজিতে এবং ২৩ দশমিক ৩১ শতাংশ বা ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন শিক্ষার্থী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। ইংরেজি ও আইসিটি ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ৩৫ দশমিক ৭০ শতাংশ বা ২ লাখ ১২ হাজার ৯২ জন শিক্ষার্থী।
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছেন, এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।
বাংলাদেশে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা চালুর বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে সাপ্লিমেন্টারি বা সম্পূরক পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী যেসব শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হন অথবা সন্তোষজনক ফলাফল করতে পারেন না, তাঁদের জন্য এ ধরনের পরীক্ষার আয়োজন করা হয়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কম্পার্টমেন্ট পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু ছিল। ২০২৩ সালের ১০ মার্চ ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই) তাদের জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০ অনুযায়ী পূর্ববর্তী ‘কম্পার্টমেন্ট পরীক্ষা’ পরিভাষার পরিবর্তে ‘সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা’ ব্যবহার করে। শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ তিনটি বিষয়ে অকৃতকার্য হলে, পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারলে অথবা প্রত্যাশিত নম্বর না পেলে মানোন্নয়নের জন্য দু–তিন মাসের মধ্যে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন। পাকিস্তানে প্রথম বার্ষিক বা মূল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের ৪০ দিন পর ‘সেকেন্ড অ্যানুয়াল ম্যাট্রিকুলেশন এক্সামিনেশন’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হলে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পান।
নেপালে গ্রেড ইনক্রিমেন্ট পরীক্ষা বা সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ন্যাশনাল এক্সামিনেশন বোর্ডের (এনইবি) অধীন যেসব শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে এনজি (নট গ্রেডেড) পেয়েছেন, পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি অথবা প্রত্যাশিত নম্বর পাননি, তাঁরা মানোন্নয়নের জন্য এক থেকে দুই মাসের মধ্যে গ্রেড ইনক্রিমেন্ট বা সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
এশিয়ার বাইরেও দক্ষিণ আফ্রিকার ডিপার্টমেন্ট অব বেসিক এডুকেশন (ডিবিই) পরিচালিত সেকেন্ড চান্স ম্যাট্রিক প্রোগ্রামের (এসসিএমপি) আওতায় ন্যাশনাল সিনিয়র সার্টিফিকেট (এনএসসি) পরীক্ষায় সর্বোচ্চ তিনটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বিনা খরচে পুনরায় পরীক্ষায় (রিরাইট) অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।
যুক্তরাজ্যের (ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড) জেনারেল সার্টিফিকেট অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (জিসিএসই) পরীক্ষায় ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা কার্যকরভাবে চালু করতে হলে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর আগেই নির্ধারণ করতে হবে।
প্রথমত, পরীক্ষার নাম ও যোগ্যতা কী হবে?
এ পরীক্ষাকে কী নামে অভিহিত করা হবে
‘সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা’, ‘কম্পার্টমেন্ট পরীক্ষা’, ‘সম্পূরক পরীক্ষা’, ‘দ্বিতীয় সুযোগ পরীক্ষা’ নাকি অন্য কোনো নামে? তবে নামের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরীক্ষার উদ্দেশ্য ও সুযোগের পরিধি স্পষ্ট করা। শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ কতটি বিষয়ে অকৃতকার্য হলে এই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন? অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা অনিবার্য কারণে যাঁরা পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিলেন, তাঁরাও কি এই পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন? যাঁরা পাস করেছেন, কিন্তু প্রত্যাশিত গ্রেড পাননি, তাঁরাও কি গ্রেড বা মানোন্নয়নের জন্য এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন?
দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার পদ্ধতি কী হবে?
তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক—উভয় পরীক্ষায় কি পুনরায় অংশ নিতে হবে, নাকি শুধু অকৃতকার্য অংশের পরীক্ষায় অংশ নিলেই চলবে? কোনো শিক্ষার্থী তত্ত্বীয় পরীক্ষায় পাস করলেও ব্যবহারিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে এর জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে? আবার কোনো শিক্ষার্থী ব্যবহারিক পরীক্ষায় ভালো করলেও তত্ত্বীয় পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে আগের ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর বহাল রাখা হবে, নাকি তাঁকে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। যেসব বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আগের নম্বর সংরক্ষণ, পুনর্মূল্যায়ন এবং পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের নিয়ম সুস্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশ্নপত্রের মান, মূল্যায়নের পদ্ধতি, ফলাফল প্রকাশ এবং সনদ প্রদানের নিয়মও নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি পুনঃপরীক্ষার ফলাফল পরবর্তী শ্রেণিতে ভর্তি এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলবে, তা-ও স্পষ্ট করতে হবে।
তৃতীয়ত, ফলাফল প্রকাশের কত দিনের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা হবে?
এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সর্বোচ্চ কত দিনের মধ্যে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং পরীক্ষা গ্রহণের কত দিনের মধ্যে পুনরায় ফলাফল প্রকাশ করা হবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিভিন্ন দেশের সাপ্লিমেন্টারি বা সম্পূরক পরীক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এক মাস সময় বেশ কম। ফলাফল প্রকাশের পর অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা তীব্র মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে পরীক্ষায় বসার মতো অবস্থায় না–ও থাকতে পারে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। অন্যদিকে পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ সময় দেওয়া হলে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সময়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা ও প্রস্তুতি, শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রশাসনিক ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, ফলাফল প্রকাশ এবং মূল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একই শিক্ষাবর্ষে ভর্তির সুযোগসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনা করে একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী পরীক্ষা আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবেন।
সাপ্লিমেন্টারি বা সম্পূরক পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ। তবে শিক্ষার্থীদের এই পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল হতে উৎসাহিত না করে কেন তাঁরা মূল পরীক্ষায় অকৃতকার্য হচ্ছেন এবং কোথায় তাঁদের দুর্বলতা রয়েছে, তা আগেই চিহ্নিত করতে হবে। যথাযথ পাঠদানের মাধ্যমে তাঁরা যেন প্রথমবারেই মূল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবার নজর দেওয়া প্রয়োজন।
লেখক: উন্নয়নকর্মী