লাল কাকা

২০১০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ, তখন আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ঠিকানা—হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল। বিশ্বকাপ এলেই ক্যাম্পাসের বাতাসে যেন অন্য এক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ত। ডিপার্টমেন্ট, চায়ের দোকান, হলের বারান্দা—সবখানেই ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা নিয়ে তুমুল তর্কবিতর্ক। কোথাও কোথাও হাতাহাতি পর্যন্ত হতো।

শাকিরার ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গানের তালে তালে চলত কথার যুদ্ধ। হলের একেকটা রুম যেন একেকটা দূতাবাস। কোথাও হলুদ–সবুজের আধিপত্য, কোথাও আকাশি–নীলের। আমি ছিলাম ব্রাজিলের অন্ধ সমর্থক, আর আমাদের আশা–ভরসার কেন্দ্রবিন্দু রিকার্ডো কাকা তর্কে কাউকে একচুল ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই উঠত না। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের তো কোন ছাড় নেই। দেখতে দেখতে কোয়ার্টার ফাইনাল। প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডস। খেলার দিন পুরো হল যেন উৎসবের মেলায় পরিণত হলো। স্লোগান, গান, নাচ—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। আমরা ডাচদের নিয়ে যতটা না চিন্তিত, তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সঙ্গে কথার লড়াইয়ে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

খেলা শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই রবিনহোর দুর্দান্ত গোলে ব্রাজিল এগিয়ে গেল। আমাদের উল্লাসে ক্যাম্পাস প্রায় কেঁপে উঠল। মনে হচ্ছিল, সেমিফাইনালের টিকিট তো পকেটেই।

কিন্তু ফুটবল বড় নিষ্ঠুর খেলা। ম্যাচের মোড় ঘুরে গেল। তারপর সেই অভিশপ্ত লাল কার্ড দেখলেন ফিলিপে মেলো, শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলও বিদায় নিল বিশ্বকাপ থেকে। গ্রুপ পর্বে কাকা লাল কার্ড খেয়েছেন, আর কোয়ার্টার ফাইনালে মেলো লাল কার্ড খেয়েছেন—হলে মিছিল শুরু হলো, লাল কার্ড, লাল কাকা...

এরপর যা ঘটল, তা আজও ভুলতে পারিনি। আর্জেন্টিনার সমর্থক বন্ধুরা আমাকে কাঁধে তুলে বিজয় মিছিল শুরু করে দিল! কোনোমতে তাদের হাত থেকে পালিয়ে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম। ভাবলাম, এবার বাঁচা গেল।

কোথায় কী! কিছুক্ষণ পর দরজার নিচ দিয়ে বালতি বালতি পানি ঢুকতে শুরু করল। বাইরে থেকে স্লোগান—‘লাল কার্ড, লাল কাকা! লাল কার্ড, লাল কাকা!’

আমি যত রেগে যাচ্ছি, ওদের উৎসাহ তত বাড়ছে। শেষমেশ আমার রুমমেট নিহার দাদা এসে পরিস্থিতি সামাল দিল।

এদিকে ফোনের পর ফোন আসছে। সবাই খেলা নিয়েই কথা বলতে চায়। এর মধ্যে একটা ফোন এল আমার প্রতিবেশী মাস্টার চাচার কাছ থেকে। তিনি হাইস্কুলের শিক্ষক। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘লাল’। আর আমি ফোনে তাঁর নাম সেভ করে রেখেছিলাম—‘লাল কাকা’।

একদিকে ব্রাজিল হেরে গেছে, লাল কার্ড খেয়েছে, অন্যদিকে হল কাঁপিয়ে স্লোগান উঠছে—‘লাল কাকা! লাল কাকা!’

ঠিক সেই মুহূর্তে ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল, ‘লাল কাকা কলিং...’

আমি আর কিছু না ভেবেই ফোন রিসিভ করে ঝাঁঝালো কণ্ঠে যা ইচ্ছা, তা–ই বলা শুরু করলাম। হতভাগ্য চাচা কথা বলারই সুযোগ পেলেন না!

রাতের শেষ ভাগে মাথা ঠান্ডা হলো। ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে বাবার ফোনে ঘুম ভাঙল। ফোন ধরতেই বজ্রকণ্ঠে প্রশ্ন, ‘গত রাতে তোর লাল চাচারে কী উল্টাপাল্টা কথা বলছিস?’

মুহূর্তেই আমার সংবিৎ ফিরে এল।

লাল কাকা—এরপর বাবাকে পুরো ঘটনা খুলে বললাম। পরে লজ্জিত কণ্ঠে লাল কাকার কাছে ক্ষমাও চাইলাম।

আজ এত বছর পরও বিশ্বকাপ এলেই সেই রাতের কথা মনে পড়ে। ব্রাজিলের হার যতটা কষ্ট দেয়, তার চেয়ে বেশি হাসায় ‘লাল কাকা’–কাণ্ডটা।

ফুটবল বিশ্বকাপ অনেক স্মৃতি দিয়েছে, কিন্তু ভুল মানুষকে রাগ ঝাড়া দেওয়ার এমন বিব্রতকর স্মৃতি আর দ্বিতীয়টি নেই!

রূপক, পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা