অন্য রকম ঈদের গল্প
রাত বাড়ছে মুহসীন হলে। করিডোরে মানুষজনের আনাগোনা কমছে। ঈদের খুব বেশিদিন বাকি নেই। সাকুল্যে দুই দিন আছে ঈদের। এই সময়ে হলে মানুষজনের আনাগোনা কমবে এটাই স্বাভাবিক। সবাই একে একে বাড়ির পথ ধরছে।
ফারহান এবার বাড়ি যাবে না। নাই–বা যেতে পারে। হল লাইফে অনেকেই তো হলে ঈদ করে। তবে সবার ব্যাপার ফারহানের মতো নয়। এই যেমন হলের এক সিনিয়র রুশো ভাই; উনি এবার হলে থাকছেন কারণ সামনেই উনার গুরুত্বপূর্ণ চাকরির পরীক্ষা আছে। ফোর্থ ইয়ারের নিয়ন অবশ্য ভিন্ন কারণে থাকছে। পুরো বছরজুড়ে হল সরগরম থাকে। সকাল, সন্ধ্যা কিংবা মধ্যরাত সব সময়ই হলের বারান্দা, ছাদ কিংবা করিডোরে মানুষজনের উপস্থিতি আছেই। ঈদের এই সময়টা হল ফাঁকা থাকে। নিয়নের কাছে এই ফাঁকা হলের পরিবেশটা বেশ লাগে; মাঝেমধ্যে একা থাকার এই বিলাসিতা মন্দ কিছু নয়। সব মিলিয়ে গোটা বিশেক ছেলে হলে আছে। এই গোটাবিশেক ছেলের ভিড়ে ফারহানের গল্পটা একটু আলাদা।
ফারহান এবার মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার চাপ যে খুব বেশি তা নয়। পড়াশোনা ঠিকমতোই চলছে। সকাল বেলা এক টিউশন করে ক্লাসে চলে যায়। ক্লাস শেষ করে বিকালে অন্য টিউশনের জন্য ছুট লাগায়। রাতে এসে খেয়েদেয়ে অল্পবিস্তর পড়াশোনা। পরদিন সকাল; ওই একই নিত্যদিনকার রুটিন। শুধু ব্যতিক্রম ঘটে ছুটির দিনগুলোয়। এই দুই টিউশনের টাকায় ওর মাস টেনেটুনে চলে যায়। এই টাকার মধ্যেই তার যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করতে হয়। বাড়ি থেকে টাকা আনা কিংবা বাড়িতে টাকা পাঠানো, কোনোটাই ওর করতে হয় না। বাড়িতে কেউ থাকলে তো! ফারহানের বাবা মারা গেছে প্রায় বছর দশেক হলো। বাবাকে ও যেন এখন রীতিমতো ভুলতেই বসেছে। খুব একটা মনে পড়ে না। এই বছর দশেক সময় এগিয়েছে নানা বাঁকে!
বাবার মৃত্যুর পর জীবন যেন তাকে প্রতিনিয়ত চোখ রাঙায়! ফারহানরা দুই ভাই–বোন। বোনের বিয়ে হয়েছে বাবা মারা যাওয়ার বছর দুয়েক আগে। অবশ্য বোনের সংসারেও টানাপোড়েন যেন রোজকার ঘটনা। বাবা পরের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করতেন। বাবার উপার্জনের টাকায় ওদের তিনজনের সংসারের দিনকাল চলছিল। বাবাকে হারিয়ে মা-ছেলের সংসারের সব হিসেব নিকেশ পাল্টে গেল। সেই থেকে শুরু; লড়াই যেন জেঁকে বসে। বেঁচে থাকার লড়াই। বাবার মৃত্যুর পর মা অন্যের বাড়িতে কাজ নিলেন। ফারহানের লেখাপড়াটা তো চালিয়ে নিতে হবে।
মা–বাবা ছাড়া ফারহান তো নিত্যদিন একা দিন যাপন করছে। এই ঈদ তেমন বিশেষ কিছু নয়। স্রেফ নতুন আর একটা দিন। রুশো ভাই, নিয়ন কিংবা এই সময় হলে থাকা গোটাবিশেক ছেলেদের ভিড়ে ফারহানের গল্প আলাদা হয়ে কারও চোখে পড়বে না।
বাবা এই ফারহানকে নিয়েই স্বপ্ন দেখতেন। ফারহান ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাওয়ার খবরে বাবা সেদিন তার ছেলের শিক্ষককে কিছু উপহার দিয়েছিলেন। বাবা খুব করে চাইতেন তার ছেলে পড়াশোনা শেষ করে বড় চাকরি করবে।
ভার্সিটি চান্স পাওয়ার খবরে মা খুব খুশি হয়েছিলেন। সেদিন ফারহানের বাবার কথা বলতে বলতে অনেকক্ষণ কাঁদলেন। হয়তো আড়ালেও অনেকক্ষণ কেদেছেন। কে জানে!
ভার্সিটি ভর্তি হয়েই ফারহান হন্যে হয়ে টিউশন খুঁজতে লাগলো। টিউশন পেতে দ্বারস্থ হয় সেই রুশো ভাইয়ের। রুশো ভাই-ই তাকে টিউশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে চলছে জীবন।
দিনকাল মন্দ যাচ্ছিল না। হুট করে খবর এল মায়ের অসুস্থতার। ওদিকে মা হয়তো ভেতরে ভেতরে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ফারহান ভার্সিটিতে চলে আসার পর উনি একা হয়ে পড়েছিলেন। ফারহান মায়ের খবর নিতো নিয়মিত। কিন্তু মা সব সময়ই নিজের অসুস্থতার কথা লুকাতেন। এই নিত্য টানাপোড়েনের মধ্যে ওষুধের কথা বলতে হয়তো মায়ের খুব বাঁধত। ফোর্থ ইয়ারের এক বিকেলে এলাকা থেকে চেয়ারম্যানের ফোনে হকচকিত হয়ে যায় ফারহান। ফোন পেয়েই সে বাড়ির পথ ধরে। কিন্তু ততক্ষণে মা আর ফারহানের অপেক্ষায় থাকতে পারলেন না। সেই সন্ধ্যায় মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয় ফারহানের।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
প্রায় বছরখানেক ফারহান বাড়ি যায়নি। দেখতে দেখতে ঈদ চলে এসেছে। দুদিন আগে ওর বড়বোন ওকে ফোন দিয়েছিল। বোন তার বাড়িতে ফারহানকে ঈদ করতে যেতে বলেছে। ফারহান এবার কোথাও যাবে না। ওর তো যাওয়ার জায়গা নেই। কায়ক্লেশে গুজরান করা বোনের বাড়িতে সে উটকো ঝামেলার পাত্র হতে চায় না!
মা–বাবা ছাড়া ফারহান তো নিত্যদিন একা দিনযাপন করছে। এই ঈদ তেমন বিশেষ কিছু নয়। স্রেফ নতুন আর একটা দিন। রুশো ভাই, নিয়ন কিংবা এই সময় হলে থাকা গোটাবিশেক ছেলেদের ভিড়ে ফারহানের গল্প আলাদা হয়ে কারও চোখে পড়বে না।
*লেখক: আনিসুর রহমান, সহকারী পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা।