ঈদ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা: সংস্কৃতির দ্বিচারিতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মানুষ আনন্দ ছাড়া বাঁচে না।‌ গভীর বিষাদের মধ্যে কেউ যদি সামান্য খড়কুটোর মতো আনন্দের উপলক্ষ খুঁজে পায়, তবে তার জীবনকে সামনে এগিয়ে রাখার রসদ মিলতে পারে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই তো বলে রেখেছেন, আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর।

সুলতানি আমলে (১২০৪-১৫৭৬) ঈদ আনন্দ আয়োজনে রাজা ও প্রজাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকত। মোগল আমলে (১৫৭৬-১৮৫৭) ওই সাংস্কৃতিক প্রবাহ আরও বেগবান হয়। মোগল সম্রাট শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের সময় ঈদের শোভাযাত্রা ও মেলা বর্ণাঢ্য রূপ নেয়, যেখানে কাব্যপাঠ, সংগীতানুষ্ঠান ও পুতুলনাট্য পরিবেশিত হতো।

সুলতানি আমলে বাংলায় ঈদ উৎসব পালিত হতো রাজকীয়ভাবে। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী সে সময় সুলতানরা ঈদের নামাজের পর বিশেষ শোভাযাত্রার আয়োজন করতেন। এই শোভাযাত্রায় সামরিক মহড়া, রাজকীয় হাতি-ঘোড়ার প্রদর্শনী, বাদ্যযন্ত্রের বাজনা, আরবীয় ও ভারতীয় সংস্কৃতির মিশ্রণ থাকত। সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে একে বর্ণাঢ্য করে তোলা হতো। তবে তা মূলত ইসলামি সংস্কৃতির পরিসরেই সীমাবদ্ধ ছিল।

তেমনি মোগল আমলেও ঢাকায় সুবেদারদের উদ্যোগে ঈদ শোভাযাত্রা বের হতো। এতে ঢোল-তবলা বাজিয়ে, সুসজ্জিত হাতি-ঘোড়া নিয়ে, ফুলের পসরা সাজিয়ে নগরীর বিভিন্ন পথ পরিক্রমণ করা হতো।

সুলতানি ও মোগল আমলের সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করে ঢাকার রাজপথে আজ মঙ্গলবার হয়েছে ঈদের আনন্দমিছিল। ঈদকে আরও উৎসবমুখর করতে এ মিছিলের আয়োজন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ঈদের নামাজ শেষে এ মিছিল আগারগাঁও থেকে শুরু হয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে শেষ হয়।

‘নাগরিক সংবাদ’-এ নানা সমস্যা, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

দ্য ডেইলি স্টার–এর খবরে বলা হয়েছে, পুরো আগারগাঁও এলাকায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল ‘ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক’ স্লোগান। শোভাযাত্রায় ছিল ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র, সাজানো ঘোড়ার গাড়ি, বলদ টানা গাড়ি এবং নানান রঙিন প্রদর্শনী।

শোভাযাত্রার নেতৃত্বে ছিল একটি ব্যান্ড দল, যারা উৎসবমুখর সুর বাজাচ্ছিল। অংশগ্রহণকারীরা ঈদের শুভেচ্ছা বার্তা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করছিল।

শোভাযাত্রার সামনের সারিতে ছিল ৫টি সুসজ্জিত ঘোড়া, সঙ্গে ছিল ১৫টি ঘোড়ার গাড়ি। এ ছাড়া ১০টি পুতুলনাটকের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে মোগল ও সুলতানি আমলের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছিল।

ঈদের মিছিলে বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার মতোই লোকজ মোটিফ, টোটেম ও মনুষ্য-প্রাণ-প্রকৃতির বিচিত্র ভাস্কর্য ছিল। ছিল আরব্য রজনীর আলিবাবা ও তস্কর, হস্তী এবং চিরায়ত গরুর গাড়ি।

শোভাযাত্রায় সনাতন ধর্মের নারীরাও ছিলেন। ছিল গাধার পিঠে উল্টোদিকে বসা মানুষ। যদিও এটা নিয়ে নানা আলোচনা–সমালোচনা হচ্ছে।

ব্যান্ড পার্টির সুর ও ড্রামের তালে তালে কোনো মানুষ যখন নাচে, এর মতো সুন্দর দৃশ্য আর হয়। বর্তমান বাস্তবতায় ঈদের দিনে আনন্দ শোভাযাত্রাসহ নানা আয়োজন বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতাও বটে। প্রজন্ম তাই সোৎসাহে বলতে পারছে, ‘এই রকম ঈদ আমরা আগে কখনো দেখিনি, সেরা ঈদ!’

বাংলাদেশের সংস্কৃতি বহুমাত্রিক ও বহুস্তরীয়। একদিকে আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, অন্যদিকে ধর্মীয় সংস্কৃতি—এই দুইয়ের সহাবস্থান বহু যুগ ধরে চলে আসছে।

১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্যোগে প্রথম পয়লা‌ বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। পরবর্তী সময়ে এটি দেশের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয় এবং ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। লোকজ মোটিফ, পশু–প্রাণীর মুখোশ, গ্রামবাংলার প্রতীক ইত্যাদি নিয়ে এই শোভাযাত্রা বাংলা নববর্ষের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। তবে একশ্রেণির মানুষের মতে, এই শোভাযাত্রা তাঁদের ধর্মীয় চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আমরা লক্ষ করলাম, ঈদের আনন্দ শোভাযাত্রায় বৈশাখের কাছাকাছি ধরনের লোকজ মোটিফ ও টোটেম ব্যবহার করা হলো। পুতুলনাট্যের মতো শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঈদ উৎসবের সঙ্গে মিশিয়ে পরিবেশন করা হলো। অথচ যাঁরা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ইসলামবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেন, তাঁরা এই ঈদ শোভাযাত্রা দেখেছেন বা এতে অংশগ্রহণ করে থাকতে পারেন।

ঈদের আনন্দ আয়োজনকে আমরা সর্বতোভাবে সমর্থন করি। ভাবিকালে এই উৎসব আরও জাঁকজমকপূর্ণ ও ইনক্লুসিভ হবে, জনহিতে মেসেজনির্ভর থিয়েট্রিক্যাল অনুষঙ্গ থাকবে, নির্দিষ্ট ধর্মীয় বাতাবরণ ঘুচে গিয়ে বহুত্ববাদী সাম্য কায়েম হবে; আমরা এমনটা প্রত্যাশা করি। কিন্তু ঈদ শোভাযাত্রা যদি বৈশাখী শোভাযাত্রাকে বাতিল করার প্রবণতা তৈরি করে, নারীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে; তবে ওই আয়োজনের সমর্থক আমরা কিছুতেই হব না।

লেখক: সাংবাদিক