পয়লা জুন, আমার প্রিয় আব্বার জন্মদিন!
কেন যেন প্রিয় মানুষের জন্মদিন, বিশেষ দিন, এমনকি মৃত্যুদিনও আমি ভুলতে পারি না। আল্লাহ মালুম! এমন নয় যে আমি সচেতনভাবে এসব বিষয় মনে রাখি; বরং মনে হয়, এগুলো যেন আমার স্মৃতিতে সব সময় প্রচ্ছন্নভাবে রয়ে যায়। কোনো কাজিন বা বান্ধবীর জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী কিংবা সেসব তারিখ সংশ্লিষ্ট ঘটনাও আমার মনে থাকে।
মনে থাকার সুখস্মৃতির অপর পৃষ্ঠে দুটি বিড়ম্বনাও আছে।
১. প্রিয় মানুষ বিয়োগের স্মৃতিগুলো আমাকে গভীরভাবে পীড়িত করে। যেমন গত ১৫ মে সিমনের মৃত্যুবার্ষিকীতে সারা দিন আমার আদরের ভাইকে ভীষণ মিস করেছি!
২. এই পীড়ার কথা বলার মতো মানুষ খুঁজে পাই না। কাকে দেব আমার এই কষ্ট? যাকে দেব, সে নিশ্চয়ই ভুলেই ভালো আছেন!
তবে আপুকে মাঝেমধ্যেই বলি! আল্লাহর এক নিয়ামত বোন, যার কাছে আব্বা আম্মার পর সুখের সঙ্গে সঙ্গে রাগ, দুঃখ, অস্বস্তি, অশান্তিও জমা রাখা যায়! আলহামদুলিল্লাহ।
যা–ই হোক, আব্বার জন্মদিনে ফিরে আসি।
পাঁচ বছর আগেও এই দিনে ঘুম থেকে উঠে আমার প্রথম কাজ ছিল আব্বাকে বলা ‘হ্যাপি বার্থডে, আব্বা!’ আব্বা বেশ প্রগতিশীল ছিলেন, জন্মদিনের শুভেচ্ছা তিনি সানন্দে গ্রহণ করতেন। যদিও জীবনের শেষ দিকে কোনো এক অদৃশ্য টানে গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন। সে ভিন্ন প্রসঙ্গে আজ যাব না।
১ জুন ২০২১।
আমি আব্বাকে বললাম ‘আব্বা, হ্যাপি বার্থডে! তুমি তো বুড়া হয়ে গেলা আব্বা! আজ তোমার ৬৬ বছর হয়ে গেল!’
আব্বা হেসে বললেন ‘অনেক ধন্যবাদ মা! এক তুমি ছাড়া কেউ মনে রাখে না মা!’
আমি বললাম ‘আপু তো এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি মনে হয়!’
(এরপরের ফোনটাই হয়তো আপুর বাজত! ততক্ষণে ওকে ফোন করে মনে করিয়ে দেওয়াও আমার কাজ ছিল!)
আরও যোগ করলাম, ‘আব্বা, আমি দোয়া করি তুমি শতায়ু হও। তোমার নাতি-নাতনিরা ডাক্তার হবে, তুমি দেখে যাবে।’
(আব্বার তীব্র ডাক্তারপ্রীতি ছিল, আব্বার এক বিখ্যাত চাচার ৪টা মেয়েই ডাক্তার ছিল! কিন্তু আমরা দুই বোন কেউই ডাক্তার হতে পারিনি, কৈশোরে সে আক্ষেপে আব্বাকে প্রায়ই ব্যথিত হতে দেখেছি!)
আব্বা আমাকে অবাক করে দিয়ে ‘ইনশা আল্লাহ’ বললেন না; বরং বললেন, ‘ওত দিন কি আর আমি বাঁচব মা?’
ইদানীং মনে হয়, আব্বা হয়তো তখনই বুঝতে পেরেছিলেন। কারণ, সেই বছরের সেই মাসেরই শেষ দিন, ৩০ জুন, আব্বা পৃথিবীর জীবনের পাঠ চুকিয়ে যাত্রা করলেন অনন্ত জীবনে।
আব্বা প্রায়ই বলতেন, ১৩ তাঁর জন্য লাকি নাম্বার।
১৩ অক্টোবর তাঁর বিবাহবার্ষিকী। আম্মাকে বিয়ে করে আব্বা সত্যিই ভীষণ সুখী ছিলেন।
১৩ নভেম্বর আমার দাদার ইন্তেকালের দিন। সদ্য প্যারালাইজড দাদার মৃত্যু আব্বা তাঁর কষ্টের অবসান হিসেবেই দেখতেন; সেই অর্থে তাঁর অন্তিমযাত্রাকে শুভই ভাবতেন।
১৩ জানুয়ারি তাঁর ছোট আম্মার জন্মদিন। দ্বিতীয়বার কন্যাসন্তান জন্মানোয় দাদু নাকি খুবই বিমর্ষ হয়েছিলেন। আমার সুপারম্যান আব্বা তখন নতুন চাকরি ফেলে গ্রামে ফিরেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি বহু কান্নাকাটি করে জায়নামাজ ভিজিয়ে আল্লাহর কাছে চেয়ে এই মেয়ে এনেছেন! দাদুর মুখে শুনেছি, তাঁর জীবনের একটাই দুঃখ! তাঁর মান্নানের কোনো পোলা নাই! ‘মেদ্দার ছাতা চাওয়ার কী আছে?!’
আর আব্বার বহুল প্রত্যাশিত পদোন্নতিটিও তিনি পেয়েছিলেন ১৩ তারিখেই।
১৩ নিয়ে এত কথা বলার কারণও আছে।
৩০ জুন সকালে আব্বা আমাকে বললেন, ‘আজ কত দিন হলো আমি এই হাসপাতালে আছি?’
তারপর নিজেই আঙুল গুনে হিসাব করলেন, ‘শুক্রে শুক্রে আট দিন, আর শনি, রবি, সোম, মঙ্গল, আজ বুধ—পাঁচ দিন। আজ ১৩ দিন আমি হাসপাতালে। ওরা আমার চিকিৎসা করে না মা, ডাক্তারও দেখে না!’
বলাবাহুল্য, আব্বা করোনার ডেলটা ধরনে আক্রান্ত ছিলেন। যে কারণে ৯৫% ফুসফুস বিকল হয়ে গিয়েছিল, সঙ্গে ছিল উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস ও স্থূলতা। তিনি আইসিইউতে ঘণ্টায় ৮০ লিটার অক্সিজেন নিচ্ছিলেন।
এদিকে ডিউটি ডাক্তার আপুকে বলে দিয়েছিলেন ‘আপনার বাবার হাতে সর্বোচ্চ আর দুই দিন সময় আছে।’
তবু আব্বার শেষ ইচ্ছার কথা ভেবে আপু হাসপাতাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেন।
নতুন হাসপাতালে আব্বা মাত্র ত্রিশ মিনিট ছিলেন, তা–ও লাইফ সাপোর্টে।
আমার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আমাকে বেঁধে রেখে আমার বুকের ভেতর থেকে কলিজাটা ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে।
বারবার মনে হচ্ছিল, এখন থেকে আমার জন্য তাহাজ্জুদের সেজদায় কেঁদে কেঁদে দোয়া করবে কে?
আমি কেন আব্বার শেষ সময়ে সারাক্ষণ পাশে থাকতে পারলাম না?
কেন একটি রাতও তাঁর সেবা করে কাটাতে পারলাম না?
আম্মার মুখে শুনেছি, ছোটবেলায় একবার দুষ্টুমি করতে গিয়ে আমার সামনের দুটি দাঁত একসঙ্গে মাড়ির ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। আব্বা একটি বের করতে পারলেও আরেকটি পারেননি। পরে ডেন্টিস্টের সহযোগিতায় সেটি বের করা হয়। সেদিন মাড়ির রক্তক্ষরণ আর ব্যথায় আমি সারা দিন দুধও খেতে পারিনি।
সারা দিনের ধকলের পরও সেই পুরো রাত আব্বা সজাগ ছিলেন...তাঁর ক্ষুধার্ত মেয়ের জন্য।
চামচের ডগায় ফোঁটা ফোঁটা করে দুধ দিয়ে সারা রাতে এক ফিডার দুধ খাইয়েছিলেন আব্বা!
আমি কেবলই ভাবি, এই ঋণ কীভাবে শোধ করব!
আমি তো আব্বার জন্য তেমন কিছুই করতে পারিনি। আইসিইউতে অ্যাটেনড্যান্টের অনুমতি না থাকায় আমাদের তো আব্বা সব আক্ষেপ বয়ে বেড়ানো থেকে দায়মুক্ত করে গেছেন। একটা রাতও জেগে থাকতে হয়নি তাঁর জন্য!
একরাশ আক্ষেপ দিয়ে আব্বা চলে গেলেন আল্লাহর মেহমান হয়ে।
আমি খুব মিস করি, আমার সব মুশকিল আসান করে দেওয়া সব সময় দোয়া করা আব্বাকে।
আব্বার দোয়ার প্রতি আমার অটল বিশ্বাস ছিল, আব্বার যেমন ছিল তাঁর অঙ্কের প্রতি! অঙ্ক সমাধান করলে, আব্বা উত্তরমালা দেখার আগেই বলতেন, ‘রাখ বেটি! তোর বাপ অঙ্কের জন্ম দেয়! মিলবে না মানে, ওর বাপ মিলবে!’ আসলেই সব মিলত!
আব্বার দোয়াও ছিল তেমনি অব্যর্থ! আব্বা দোয়া করেছেন, অথচ তা কবুল হয়নি—এমন কিছু আমার মনে পড়ে না।
আমার আক্দের দিন উপস্থিত এক ভাই বলেছিলেন, ‘লিয়া, তোমার আব্বা কেমন মানুষ ছিলেন, তোমাদের বিয়ের মোনাজাতে তাঁর কান্না দেখেই তা বোঝা যায়।’
সত্যিই, আমার বিয়ের মোনাজাতে দুজন মানুষ কেঁদেছিল আব্বা আর আমি।
আমার আব্বা ছিলেন একজন সহজ–সরল, সত্যবাদী, অল্পতে তুষ্ট ভালো মানুষ। মেহমান দেখলেই খুব খুশি হতেন; খেতে ভালোবাসতেন, খাওয়াতে ভাল্যবাসতেন! উপহার পছন্দ করতেন! উদ্যাপনও পছন্দ করতেন!
আমার ভেতরের যতটুকু ভালোবাসা আছে, তার সবটাই আমি পেয়েছি আব্বার কাছ থেকে।
আমি আব্বার সঙ্গে কাটানো আমার দুর্দান্ত শৈশব আর কৈশোরের নানা রঙের দিনগুলো প্রচণ্ড মিস করি।
আবার আব্বাকে দেখার প্রত্যাশায় আমার তৃষ্ণার্ত চোখ আজও তাঁকেই খুঁজে বেড়ায়।
সবাই আমার আব্বার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন তাঁকে অনন্ত জীবনে সর্বোত্তম শান্তি ও মর্যাদা দান করেন। আর আমাকেও যেন তাঁর সান্নিধ্যের যোগ্য বানান, যেন আবারও তাঁকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে পারি!
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]