আমাদের দিদি কিংবা একজন শিক্ষিকার গল্প

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

তিনি আমাদের সবার দিদি। তাঁর একটি নাম আছে—কল্পনা রানী দাস। বরিশাল শহরতলির কাশীপুর হাইস্কুলে (বর্তমানে কাশীপুর হাইস্কুল ও কলেজ) তিনি শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘকাল। আমিও তাঁর ছাত্র ছিলাম।

তিনি বাংলায় স্নাতক পাস করে আমাদের স্কুলে যোগ দেন গত শতকের আশির দশকে। আমাদের ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণিতে ইংরেজি ২য় পত্র পড়িয়েছিলেন। অসম্ভব সুন্দর ছিল তাঁর কথা বলার ধরন। তাঁর শুদ্ধ উচ্চারণ আমাদের মুগ্ধ করত। যখন তিনি পড়াতেন, শুধু মুখেই পড়াতেন না, শারীরিক ভাষাও ব্যবহার করতেন।

ইংরেজি ২য় পত্রের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর বেশ ভালো ধারণা ছিল। তাই আমাদের খুব ভালো করেই গ্রামার সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিলেন। এরপর ৮ম শ্রেণিতে তিনি বাংলা বিষয়টি পড়িয়েছিলেন। চমৎকার ছিল তাঁর বাংলা পড়ানোর কৌশল। আমাদের যেমন অশুদ্ধ উচ্চারণ শুধরে দিয়েছেন, তেমনি বাক্য গঠনের কৌশলও হাতে ধরে শিখিয়েছেন।

একদিন তিনি আমাদের ক্লাসেই কোনো একটি গল্প থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর লিখতে দিলেন। আমি যথারীতি গল্পটি পড়ে উত্তর লিখে ফেললাম। দিদি সে উত্তর দেখে তাতে আরও কিছু যোগ করে দিলেন। উপদেশ দিলেন প্রতিটি গল্পের শেষে যে সারসংক্ষেপ থাকে, সেটাও পড়তে এবং মূল গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে উত্তর লিখতে। ওই উপদেশ মেনে চলে ভালো ফলও পেয়েছি।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

দিদিকে দীর্ঘদিন ৯ম ও ১০ম শ্রেণিতে বাংলা বিষয়টি পড়াতে দেওয়া হয়নি। যদিও বিষয়টি পড়ানোর জন্য তিনিই ছিলেন সবচেয়ে যোগ্য। অন্য যাঁরা বাংলা পড়াতেন, একজন বাদে বাকিদের বিষয়টি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান ছিল না।

ক্লাশে তিনি এক মিনিটও দেরি করতেন না। স্কুলে আসতেন অত্যন্ত পরিপাটি হয়ে। ইস্ত্রি করা শাড়ি পরতেন; পরতেন হাতঘড়ি, ভয়জাগানিয়া বড় বড় চোখে ছিল মোটা ফ্রেমের চশমা। তবে মানুষটির হাতে অত্যন্ত বেমানানভাবে একটি বেত থাকত। আমাদের মতো দুষ্টু শিক্ষার্থীদের জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি ওই বেত রাখতেন। পড়াশোনা না পাড়ার জন্য তিনি বিশেষত মারতেন না। দুষ্টুমি করা কিংবা নিয়মকানুন না মানলে বেত চালাতেন। আমিও দুবার বেতের স্পর্শ পেয়েছি। দিদি কখনো প্রাইভেট পড়াননি। প্রাইভেট পড়ালে একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক রাগ করতে পারেন বলে তিনি আর ও পথে যাননি।

স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে তিনিও আমাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গম্ভীরভাবে শপথবাক্য পাঠ করতেন এবং জাতীয় সংগীত গাইতেন। একসময় আমাদের স্কুলে প্রতি বৃহস্পতিবার বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। সেখানে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি বিতার্কিকদের শব্দচয়ন, উচ্চারণ ও যুক্তির দুর্বলতাগুলো ধরিয়ে দিতেন।

২০১৫ সালে দিদি অবসরে যান। শেষ বয়সে এসে তিনি বিয়ে করেন। এক যুগের অধিক দাম্পত্য জীবন ছিল তাঁদের। তাঁর স্বামীর অনিয়মিত ব্যয়ের ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই অবসরের সময় যে টাকা পেয়েছিলেন, তা শেষ হয়ে যায়। ২০১৮ সালে তাঁর স্বামী মারা যান।

এরপর তাঁর জীবনে শুরু হয় অগ্নিপরীক্ষা। তিনি চরম অর্থসংকটে পড়ে যান। তাঁর মা-বাবা অনেক আগেই মারা যান। ভাই-বোনদের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন না যে তাঁকে এই অর্থকষ্ট থেকে মুক্ত করবেন। দিদি দীর্ঘদিন বিষয়টি কাউকে বলেননি। আমার সঙ্গে তাঁর ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ হতো। হঠাৎ তিনি একদিন তাঁর আর্থিক দুরবস্থার কথা আমাকে জানালেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে কয়েকবার টাকা পাঠিয়েছি। আমাদের স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা আমার পরিচিত ও বর্তমানে সচ্ছল, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে কয়েকবার সাহায্য করার ব্যবস্থা করেছি। তবে তাঁর দরকার ছিল একটি স্থায়ী সমাধান।

এ বছর আমাদের স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অনলাইনে একটি গ্রুপ খুলল। সেই গ্রুপে সবাই দিদির বিষয়টি নিয়ে আলাপ করল এবং সভা করে একটি স্থায়ী সমাধানের পথ বের করল। সিদ্ধান্ত হলো, প্রতিটি ব্যাচ থেকে দিদিকে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়া হবে, যা এখন চলমান।

গত ৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দিদিকে দেখতে আমি ও আমার বন্ধু সাখাওয়াত হোসেন (কামরুল) তাঁর বাসায় যাই। আমাদের দেখে তিনি খুব খুশি হলেন এবং এ উদ্যোগের প্রশংসা করলেন। কয়েক বছর আগেও তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। এখন দিদিকে একটু বেশি নির্ভার মনে হলো। তিনি আমাদের সঙ্গে তাঁর জীবনের অনেক গল্প করলেন, যা আমরা আগে জানতাম না।

গল্পে গল্পে প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেছে। আমাদের বিদায় নেওয়ার সময় হলো। তিনি জানালেন যে তিনি আগের থেকে ভালো আছেন। নিজের কোনো সন্তান না থাকলেও অসংখ্য সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর করেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করতে চান। এ কথা বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠ ধরে আসছিল, আমাদেরও চোখ ছলছল করে উঠল। আমরা দোয়া চেয়ে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। ভালো থাকবেন, দিদি।

  • মো. মাইন উদ্দিন, অধ্যাপক, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়