আসন্ন নির্বাচন ও গণভোট: বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্নিপরীক্ষা

ভোট দিচ্ছেন ভোটাররাফাইল ছবি

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে। এদিন অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ (জুলাই চার্টার) নিয়ে সাংবিধানিক গণভোট।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এটি হবে প্রথম জাতীয় ভোটাভুটি, যা শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসানের পর দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের ঘোষিত তফসিল অনুসারে, ভোট গ্রহণ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলবে। প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ ভোটারের ভোট গ্রহণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রস্তুত করা হয়েছে ৪২ হাজারের বেশি কেন্দ্র।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, বরং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নে প্রথম ধাপ হতে চলছে। অনুষ্ঠেয় গণভোটে ভোটাররা ‘জুলাই সনদ’-এর প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোকে অনুমোদন করবেন কি না, তা নির্ধারণ করবেন। এই সনদে প্রস্তাবিত হয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা (দুই মেয়াদ), বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, নির্বাহী ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ও ২০২৪-এর গণ–অভ্যুত্থানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি।

এসব সংস্কারের লক্ষ্য হলো একক ব্যক্তি বা দলের কর্তৃত্ববাদী শাসন রোধ করা ও গণতন্ত্রকে আরও স্থিতিশীল করা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এটিকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের সুযোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণও।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তারা অংশ নিতে পারবে না, যা নির্বাচনী মাঠকে নতুন রূপ দিয়েছে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যারা জরিপে এগিয়ে আছে এবং জামায়াতে ইসলামী। ছাত্র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) নতুন একটি শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, যদিও সাংগঠনিক দুর্বলতা তাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া বিভিন্ন জোট গঠনের চেষ্টাও চলছে।

এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসী ভোটাররা পোস্টাল ব্যালটে অংশ নিতে পারবেন এবং ‘নো ভোট’ অপশন ফিরে এসেছে। তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও সংস্কার নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভেদ নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কিছু দল গণভোটের সময়সূচি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে, আবার অনেকে এটিকে সংস্কারের জন্য অপরিহার্য মনে করছেন।

নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি প্রশংসনীয়, কিন্তু জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা ও অবাধ-সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

তাই এটি কেবল সরকার বদলের নির্বাচন নয়, বরং গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের সুযোগ। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণই নিশ্চিত করবে যে ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে কি না। আর দেশের স্বার্থে সবাইকে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

*লেখক: জাহিদ আহমেদ চৌধুরী, সদস্য, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ