চিঠির শহরে এক বিকেল: ‘পত্রালয়’ ছুঁয়ে গেল গণ বিশ্ববিদ্যালয়

একসময় চিঠি হাতে লেখা হতো। কালের পরিক্রমায় সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে ইলেকট্রনিক মেইল, এসএমএস, মেসেঞ্জার কত কী! এক ক্লিকেই এখন পৌঁছে যায় হাজার শব্দ, কিন্তু সেই হাতে লেখা চিঠি, সেই অপেক্ষার প্রহর এসব কি আর পুরোনো হয়ে গেছে? মোটেও না। বরং এই দ্রুতগতির সময়ে এসেই বোঝা যায়, কতটা মূল্যবান ছিল সেই ধীরতা। চিঠির জন্য অপেক্ষা করা, খামটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ শুধু ছুঁয়ে দেখা, তারপর ধীরে ধীরে ভাঁজ খোলা এই পুরো অনুভূতিটাই যেন একটা গল্প। ঠিক এই হারিয়ে যাওয়া অনুভূতিকেই ফিরিয়ে আনার চেষ্টা দেখা গেল গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে।

গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বৃষ্টিস্নাত এক দুপুর। ঈশানকোণে জমে থাকা মেঘের ভীষণ মন খারাপ। এই বুঝি কান্না করে...এমনি এক দুপুরে গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (গবিসাস) প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পালন করছে আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আয়োজনস্থল গবিসাস কার্যালয়সংলগ্ন মিডিয়া চত্বর। সেখানে সকাল থেকেই সেখানে জমে ওঠে ভিন্ন রকম এক উৎসবের আমেজ। আয়োজনের প্রাণকেন্দ্রে ছিল হাতে বানানো একটি ডাকবক্স, যার সুন্দর নাম দেওয়া হয়েছে ‘পত্রালয়’। কাগজ, রং আর যত্নে গড়া এই বক্সটি যেন হয়ে উঠেছিল আবেগের এক ঠিকানা। শিক্ষার্থীরা হাতে খাম বানিয়ে, নিজ হাতে চিঠি লিখে জমা দিচ্ছিলেন সেই পত্রালয়ে প্রিয় শিক্ষক, সহপাঠী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর উদ্দেশে। কেউ লিখেছেন কৃতজ্ঞতার কথা, কেউবা লিখেছেন লুকানো অভিমান কিংবা না-বলা ভালোবাসার কথা।

চিঠি লেখা আর জমা দেওয়ার এই দৃশ্য মনে পড়িয়ে দেয় প্রিয় কবি হেলাল হাফিজের প্রস্থান কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা ‘এখন তুমি কোথায় আছো, কেমন আছো, পত্র দিয়ো।’

এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালি তালপাখাটা

খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে, পত্র দিয়ো৷

ক্যালেন্ডারের কোন পাতাটা আমার মতো খুব ব্যথিত

ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে তোমার দিকে, পত্র দিয়ো

কোন কথাটা অষ্টপ্রহর কেবল বাজে মনের কানে

কোন স্মৃতিটা উসকানি দেয় ভাসতে বলে প্রেমের বানে

পত্র দিয়ো, পত্র দিয়ো৷’

অপরূপ এই আয়োজন যেন সময়কে থমকে দিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। ব্যস্ত ক্যাম্পাসের কোলাহলের মধ্যে হঠাৎই তৈরি হয় এক নিবিড় নীরবতা কলমের খসখস শব্দ, ভাঁজ করা কাগজের মৃদু আওয়াজ, আর চোখেমুখে জমে থাকা এক অনাবিল আনন্দ। যাঁরা কখনো চিঠি লেখেননি, তাঁরাও আজ প্রথমবারের মতো অনুভব করলেন কালিকলমে মনের কথা বলার সেই পুরোনো সুখ।

উৎসবে অংশ নিতে আসা শিক্ষার্থী তামান্না লিপি বলেন, ‘চিঠি লেখার মতো হারিয়ে যেতে বসা একটি সুন্দর ঐতিহ্যকে ক্যাম্পাসে আবারও ফিরিয়ে আনার উদ্যোগটি সত্যিই প্রশংসনীয়। ব্যস্ত জীবনের মধ্যে হাতে লেখা চিঠির মাধ্যমে মনের কথা প্রকাশ করার সুযোগ আমাদের জন্য এক ভিন্নধর্মী ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।’

আয়োজনে এক গভীর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক নিলয় কুমার দে। তিনি বলেন, মাত্র তিন বছর বয়সে তার মা মারা যান, এরপর খালা-ফুফু-চাচিদের কাছেই তিনি বড় হয়েছেন। ছাত্রজীবনে একসময় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি, ঠিক তখনই তাঁর ফুফু তাঁকে একটি চিঠি লেখেন, ‘প্রিয় নিলয়, আমি বিশ্বাস করি তুমি চেষ্টা করলেই সব পারবে। আর সবাই যা বলে, আমি তা বিশ্বাস করি না।’ অধ্যাপক দে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, সেই দুটি লাইনই আজ তাঁকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।

আয়োজকদের পক্ষে গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মোজাহিদুল ইসলাম নিরব বলেন, ‘আমাদের কাছে চিঠির বিষয়টা গল্পের মতো শোনায়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে চিঠির অনুভূতিগুলো হয়তো আমরা পুরোপুরি বুঝব না। আগে চিঠি পাঠানো হতো ডাকযোগে, পোস্ট অফিসে যেত, সেখান থেকে পৌঁছাত গন্তব্যে। এখনো পদ্ধতিটা মূলত একই বার্তা পাঠানোর পর প্রথমে স্যাটেলাইটে যায়, সেখান থেকে গন্তব্যে পৌঁছায়। কিন্তু এই ধারণা আসলে সেই পুরোনো চিঠির যুগ থেকেই নেওয়া। আমরা চেষ্টা করেছি পুরোনো ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে।’

আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভাগীয় প্রধান, অনুষদের ডিন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিসহ গবিসাস নেতারা। সবার উপস্থিতিতে আয়োজনটি হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত ও অর্থবহ।

আয়োজন শেষে অনেকেই মন্তব্য করেন, প্রযুক্তির এই দ্রুতগতির সময়ে এমন একটি আয়োজন যেন একপশলা স্বস্তির বাতাস। চিঠি যেন কাগজের টুকরা নয়, একটি সম্পর্কের সেতু, যেখানে সময় নিয়ে ভাবা যায়, অনুভব করা যায়, আর আন্তরিকভাবে প্রকাশ করা যায় মনের গভীরের কথা। ‘পত্রালয়’ এই ছোট্ট আয়োজন প্রমাণ করে দিল, প্রযুক্তির ভিড়েও মানুষ এখনো খুঁজে ফেরে সেই পুরোনো, নিবিড়, মানবিক যোগাযোগের ভাষা যার নাম চিঠি।