টাঙ্গুয়ার হাওরের গিনিপিগ শৈশব

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা দুটি ভিডিও ফুটেজ হৃদয়ে গভীর ক্ষতচিহ্ন এঁকে দিয়ে গেল।

প্রথম ফুটেজে দেখা গেল, সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক সদলবলে টাঙ্গুয়ার হাওরের পর্যটন এলাকা ওয়াচ টাওয়ার ও নীলাদ্রী লেকের পাড়ে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া বর্জ্য পরিষ্কার অভিযানে নেমেছেন। নিজ হাতেও কুড়িয়ে নিচ্ছেন বর্জ্য। উদ্যোগটি ইতিবাচক। এ জন্য জেলা প্রশাসক সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

কিন্তু দ্বিতীয় ফুটেজটি যেন সেই পরিচ্ছন্নতার ছবির আড়ালে থাকা অন্য এক টাঙ্গুয়ার হাওরকে সামনে নিয়ে এল। ছয়-সাত বছরের একটি শিশু আনাড়ি হাতে নৌকা বাইছে। ক্যামেরার ওপাশ থেকে এক পর্যটক প্রশ্ন করছেন, ‘তুই গান গাইতে পারিস?’ শিশুটি বলল, ‘হ্যাঁ, পারি।’ পর্যটক বললেন, ‘তাহলে গেয়ে শোনা তো, একটু জোরে গাইবি।’

দুই হাতে বইঠা বেয়ে হাপিয়ে ওঠা শিশুটি বেসুরো গলায় গাইতে শুরু করল- ‘ওই লাল টুকটুক শাড়ি পরা মাইয়া, আমার মনপ্রাণ সবই নিছে কাইড়া...।’ পর্যটক হয়তো বিনোদিত হয়েছেন। কিন্তু শিশুটির চোখেমুখে যে ক্লান্তি ও অসহায়তা, তা আনন্দের কোনো দৃশ্য ছিল না। দৃশ্যটি দেখে মনে হলো আমরা কি একটি শিশুর শৈশবকেও বিনোদনের উপকরণে পরিণত করেছি?

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

‘ছয় কুড়ি বিল আর নয় কুড়ি কান্দা,

টাঙ্গুয়ার হাওরে আমরার জীবন বান্ধা।’

হাওরপারের মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত এই কথাই বলে দেয়, টাঙ্গুয়ার হাওর কেবল জল আর সৌন্দর্যের নাম নয়। মাছ, পাখি, জলজ উদ্ভিদ, হিজল-করচের বন, পানি, কৃষি এবং তীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা মিলেই এর অস্তিত্ব। হাওরের সৌন্দর্যও সেই জীবন্ত প্রতিবেশেরই ফল।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হাওরকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক পর্যটনের সবচেয়ে নির্মম অভিঘাত পড়ছে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ওপর। বিলাসবহুল হাউজবোটের ঝলমলে আলোর বিপরীতে তাদের জীবনে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা, নিরাপদ যাতায়াত কিংবা শৈশবের নিশ্চয়তা। পর্যটন বাড়ছে, অর্থের প্রবাহ বাড়ছে; অথচ সেই অর্থনীতির প্রান্তে থাকা শিশুরা ক্রমেই শ্রম ও বিনোদনের পণ্যে পরিণত হচ্ছে।

টাঙ্গুয়ার হাওরকে ঘিরে হাউজবোট, ছোট নৌকা, স্পিডবোট, খাবার ও নানা সেবাকে কেন্দ্র করে বড় একটি পর্যটন অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। একেকটি হাউসবোট নির্মাণ ও সাজসজ্জায় বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ হাওরে আসছেন। প্রশ্ন হলো এই অর্থনীতির সুফল স্থানীয় শিশুদের জীবন ও শিক্ষায় কতটা পৌঁছাচ্ছে?

হাওরের মধ্যবর্তী গোলাবাড়ি, জয়পুরসহ আশপাশের জনপদে পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগব্যবস্থার অভাবের বাস্তবতা সামনে এলে প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়। একটি শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথ যদি দীর্ঘ, ব্যয়বহুল বা অনিরাপদ হয়, তবে দরিদ্র পরিবারের কাছে তাকে স্কুলে পাঠানোর চেয়ে কাজে পাঠানোই সহজ হয়ে ওঠে।

সেখানেই শুরু হয় বিপজ্জনক চক্র। ৮-১০ বছরের ছোট ছোট শিশুর হাতে উঠে আসে নৌকা ও বইঠা। পর্যটন মৌসুমে তারা ওয়াচ টাওয়ার কিংবা হাউসবোটের আশপাশে ঘুরে বেড়ায়—কখনো বকশিশের আশায়, কখনো জীবিকার তাগিদে। যে বয়সে তাদের হাতে বই, খাতা ও কলম থাকার কথা, সে বয়সে তারা পর্যটকের পেছনে বইঠা হাতে ছুটছে।

সমস্যা আরও নির্মম হয় যখন এই শিশুশ্রম বিনোদনে রূপ নেয়। পর্যটকের অনুরোধে শিশুরা গান গায়, কেউ মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করেন, কেউ তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। কখনো গণমাধ্যমেও তাদের বেসুরো গানকে বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু শিশুটির দারিদ্র্য, শ্রম ও অসহায়ত্বকে বিনোদনের উপাদানে পরিণত করা কি সত্যিই আনন্দের বিষয়?

এটি নিছক একটি শিশুর গান নয়; এর ভেতরে রয়েছে শৈশবের পণ্যায়ন। একটি সভ্য সমাজে কোনো শিশুই অন্যের বিনোদনের বস্তু হতে পারে না। পর্যটন ব্যবসায়ীরা মুনাফা করছেন, পর্যটকেরা বিনোদন পাচ্ছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পাচ্ছে কনটেন্ট—কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই শিশুটি, যার শৈশব ও ভবিষ্যৎ একই সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে।

কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজমের কথা বলা হয় স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য। অথচ স্থানীয় শিশুরা যদি পর্যটনের সুফল না পেয়ে শিক্ষার বদলে শ্রমের দিকে ঠেলে যায়, তাহলে সেটি টেকসই পর্যটন হতে পারে না। এটি এমন এক অর্থনীতি, যেখানে মুনাফা কেন্দ্রে থাকে আর তার সামাজিক মূল্য দেয় প্রান্তিক মানুষ।

এ অবস্থার অবসানে হাওরপারের দুর্গম জনপদে স্থায়ী বা ভাসমান প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিরাপদ যাতায়াত এবং শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে স্থানীয় শিশুদের শিক্ষা ও সুরক্ষার সম্পর্ক নীতিগতভাবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। একই সঙ্গে পর্যটন এলাকায় শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত করা কিংবা তাদের অসহায়ত্বকে বিনোদনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার বন্ধে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ করতে হবে।

প্রকৃতি রক্ষার নামে শুধু হাওরের পানি, পাখি, মাছ কিংবা গাছের হিসাব নিলে চলবে না; হিসাব নিতে হবে হাওরের শিশুদেরও। কারণ যে পর্যটন প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখাতে গিয়ে একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেয়, তাকে উন্নয়ন বলা যায় না।

টাঙ্গুয়ার হাওরের জলরাশি পরিষ্কার করা জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও জরুরি আমাদের বিবেক পরিষ্কার করা। ওয়াচ টাওয়ারের পাড় থেকে বর্জ্য কুড়িয়ে নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সেই শিশুটির হাত থেকে বইঠা সরিয়ে বই-খাতা তুলে দেওয়া। নইলে হাওর হয়তো পর্যটকের চোখে আরও সুন্দর হবে, কিন্তু হাওরের সন্তানদের শৈশব হারিয়ে যাবে সেই সৌন্দর্যের আড়ালেই।

[email protected]