প্রকৃতির কোলে চড়ুইভাতি
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে সিটি, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন আর পরীক্ষার চাপে মাঝেমধ্যে হয়তো সবারই ইচ্ছা করে শিক্ষাজীবনের সব ব্যস্ততা ফেলে এক দিন বন্ধুদের সঙ্গে দূরে কোথাও ঘুরতে যেতে কিংবা একবেলা রান্নাবান্না করে খেয়েদেয়ে সময় পার করতে। শৈশবে হয়তো সবারই চাঁদা তুলে ঘরের উঠানে রান্নাবান্না করে খাওয়ার স্মৃতি আছে। যেটিকে বলা হয় চড়ুইভাতি।
আমরা পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ২৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। অনার্স–জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন আর নেই আগের মতো দুরন্তপনা। ব্যস্ততা ঘিরে ধরেছে সবাইকে।
তবে সব ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে বেশ কয়েক দিন ধরেই আমরা এক হতে চড়ুইভাতি আয়োজনের পরিকল্পনা হাতে নিই। শুরুতে কোথায় হবে আয়োজন, এ নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমাদের কয়েক দিন চলে যায়। সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্তে আমরা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড সমুদ্রসৈকতে আমাদের আয়োজনের পরিকল্পনা করি। আমাদের চড়ুইভাতি আয়োজনের দিনটি ছিল গত ৩০ জানুয়ারি।
সকাল সাতটায় সময় দেওয়া থাকলেও আমাদের ভেতর সবচেয়ে বেশি দেরি করেছে ফাবিহা। তবে সবার আগে এসেছে আজিজ আর প্রান্ত। একে একে সবাই আসতে থাকে। অবশেষে সকাল ৯টায় সবাই চট্টগ্রাম নগরের অলংকার মোড়ে এসে উপস্থিত হয়। এ আয়োজনে আমাদের ১৩ জন ব্যাচমেট যাওয়ার কথা থাকলেও ব্যাচমেট রিয়ান আসতে পারেনি। আমরা আমাদের বন্ধু রিয়ানকে ভীষণ মিস করেছি।
অলংকার থেকে বাসে চেপে আমাদের যাত্রা শুরু হতে হতে সকাল প্রায় ১০টা। প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর বাড়বকুণ্ড নামার বাজারে নেমে আমরা রওনা হই আমাদের গন্তব্য অর্থাৎ বাড়বকুণ্ড সমুদ্রসৈকতের উদ্দেশে। স্থানীয় লোকজনের কাছে এ স্থানটি বেড়িবাঁধ নামেও পরিচিত।
চড়ুইভাতি আয়োজনের জন্য অসম্ভব সুন্দর একটি সমুদ্রসৈকত বাড়বকুণ্ড। পুরো সমুদ্রসৈকতে কেবল আমরা ১২ জন। এখানকার সমুদ্র পাড়ের সবুজ চর মনোমুগ্ধকর। আর এই চরের মধ্যে বেশ কয়েকটি গাছ যেন এখানকার সৌন্দর্যে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। এ ছাড়া এখানকার গ্রামীণ জনজীবন, পাখির কিচিরমিচির শব্দ, শীতের সকালের মিষ্টি রোদ, সমুদ্রের জেলেদের জীবন, মাছ ধরার দৃশ্য, অতিথি পাখির ছোটাছুটি, সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ ইত্যাদি যেন এই সমুদ্রসৈকতের অন্য রকম নিদর্শন৷ নির্জন-প্রাকৃতিক পরিবেশে আমাদের রান্নাবান্না শুরু হতে হতে দুপুর ১২টা বেজে গেছে।
প্রতিবার আমরা বিরিয়ানি রান্না করলেও এবার সবাই সাদা ভাত খেতে চাই। আমাদের রান্নাবান্নার কাজে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে নিগার। মুরগির ভুনা, সাদা ভাত, আলু ভর্তা, টমেটো ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা ইত্যাদির প্রস্তুতি শুরু হয়।
বাতাসের বেগ থাকায় চুলায় আগুন ধরাতে বেশ ভোগান্তি হলেও আমাদের প্রান্ত খুব সহজেই আগুন ধরানোর কাজটি করে, সহযোগিতা করেছে রবিন। আগুন ধরার কাজ শেষ হলে প্রথমে মুরগি রান্না শুরু হয়। এরপর একে একে সব রান্না হচ্ছে। এর মধ্যে কেউ গান শুনছে, কেউ ছবি তুলছে। এ ছাড়া দল বেঁধে সৈকতে হাঁটাহাঁটি, সমুদ্রের জলে দাপাদাপি যেন ভিন্ন রকম একটি আনন্দময় মুহূর্ত।
দুপুরে জোয়ারের সময় পানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় অপূর্ব রূপ ধারণ করে বাড়বকুণ্ড সমুদ্রসৈকত। আমাদের রান্না শুরু করতে দেরি হওয়ায় দুপুর গড়িয়ে গেলেও রান্না শেষ হয়নি। ততক্ষণে সবার ব্যাপক ক্ষুধা লেগেছে। তবে কারও এ নিয়ে মন খারাপ নেই। বিশেষ এই দিনগুলোর আনন্দ তো এখানেই। অবশেষে দুপুরের খাবার খেতে খেতে আমাদের বিকেল হয়ে যায়। সমুদ্রের সবুজ চরে সবাই গোল করে বসে একবেলা খাবার খাওয়ার যে প্রশান্তি, তা সত্যিই অন্য রকম। খাওয়া শেষ হতে হতে গোধূলি নেমে আসতে শুরু করেছে সমুদ্রের বুকে। সবাই শেষ মুহূর্তে নিজেকে ক্যামেরাবন্দী করে নিচ্ছে। সূর্য যখন পশ্চিম দিগন্তে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদেরও বিদায়ের পালা। সব গুছিয়ে আমরা রওনা হচ্ছি বাড়ি ফেরার পথে। ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছিল, সমুদ্র পাড়ের নতুন এই স্মৃতিগুলো একসময় হয়তো অতীত হবে, তবে দিনগুলো বরাবরের মতোই থাকবে জীবন্ত। এই আয়োজন আমাদের শুধু আনন্দই দেয়নি; বরং আমাদের বন্ধুত্বের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে। বাড়বকুণ্ডের সৈকতে কাটানো মুহূর্তগুলো ২৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের স্মৃতির অ্যালবামে চির অমলিন হয়ে থাকুক।
লেখক: আরিফুল ইসলাম তামিম, শিক্ষার্থী, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম