সুসংগঠিত আর্থিক জীবন মানেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ

টাকাফাইল ছবি

অর্থই অর্থনীতির মেরুদণ্ড। যদিও অর্থ জীবনের সবকিছু নয়, তবে সঠিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া জীবন অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠতে পারে। ছাত্র, কর্মজীবী, ব্যবসায়ী বা শিক্ষক সবার ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সাফল্যের জন্য সঠিক অর্থ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা অর্থ উপার্জনের প্রতি যতটা আগ্রহী, ততটাই কি অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মনোযোগী? দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা মেটাতে আমাদের মুদ্রাস্ফীতি, উচ্চ সুদহারসহ নানা আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো, আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা। আয় যেমনই হোক না কেন, সঠিক বাজেটিং না থাকলে খরচ দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো ৫: ৩: ২। এই পদ্ধতিতে মোট আয়ের ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকবে মৌলিক চাহিদার জন্য (যেমন বাসাভাড়া, বিভিন্ন বিল, শিক্ষা ইত্যাদি)। ৩ শতাংশ ব্যয় করা যাবে ভ্রমণ, বিনোদনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে। আর ২ শতাংশ সঞ্চয়, বিনিয়োগ বা ব্যাংকে জমার জন্য রাখা উচিত।

ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা নতুন কিছু নয়; এটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে হিজরির প্রাক্কালে ধনীরা জাকাত ও কর্জে হাসানা দিতেন দরিদ্র মুসলিমদের। ফলে খলিফা উমর (রা.)-এর শাসনামলে দরিদ্রতার হার এতটাই কমে গিয়েছিল যে জাকাত গ্রহণের জন্য কাউকে খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ জাকাত ও কর্জে হাসানা মানবিক সহযোগিতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নেও কার্যকর ছিল। এ ছাড়া ইসলামি অর্থব্যবস্থায় হিজরত ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল। সংকট মোকাবিলা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে অনেকেই স্থানান্তরিত হতেন, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলত।

সঠিক অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য করণীয়

১. বাজেট তৈরি করা: আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও সংরক্ষিত তহবিলের পরিকল্পনা করা। এতে আর্থিক লক্ষ্য স্থির করা সহজ হয় এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো সম্ভব হয়।

২. জরুরি তহবিল রাখা: ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার জন্য কমপক্ষে তিন থেকে ছয় মাসের প্রয়োজনীয় খরচ (বাসাভাড়া, খাবার, ইউটিলিটি বিল, বিমা, ঋণের কিস্তি ইত্যাদি) সঞ্চয় রাখা উচিত।

৩. সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করা: ঝুঁকি ও মুনাফার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। বিনিয়োগের জনপ্রিয় মাধ্যমগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থায়ী আমানত (কম ঝুঁকি) স্টক ও মিউচুয়াল ফান্ড (মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকি) বন্ড ও রিয়েল এস্টেট (মাঝারি ঝুঁকি)। তবে বিনিয়োগের আগে মূল্যস্ফীতি ও ঝুঁকি সহনশীলতা বিবেচনা করা উচিত।

৪. প্রারম্ভিক অবসরের পরিকল্পনা করা: পেনশনসহ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত, যাতে কর্মক্ষম সময় শেষে আর্থিক সংকটে পড়তে না হয়।

৫. আয় বাড়ানোর কৌশল: প্রযুক্তির বিকাশ, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রসারকে কাজে লাগিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

৬. বাজার পরিস্থিতির প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা: অর্থনৈতিক পরিবর্তন, বিনিয়োগের ঝুঁকি ও বাজারের মুদ্রাস্ফীতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

৭. পরিকল্পনার পর্যালোচনা ও সামঞ্জস্য রক্ষা করা: সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা উচিত। এর ফলে অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হয় এবং ভবিষ্যতের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।

আধুনিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা: বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সন্দেহজনক লেনদেনের সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ১০৬টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ হাজার ৫৩৫টি বেশি। এটি প্রমাণ করে সঠিক আর্থিক পরিকল্পনার অভাব আর্থিক অনিয়ম ও ঋণের বোঝা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনা শুধু বিল পরিশোধ বা সঞ্চয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, মানসিক শান্তি ও আর্থিক স্বাধীনতার চাবিকাঠি। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া আয় যতই হোক, অর্থসংকট আসতে পারে। বাজেট তৈরি, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরা শুধু আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জনই করি না; বরং নিশ্চিন্ত জীবনযাপন ও স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যেতে পারি। তাই ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অনুধাবন করা ও সেটিকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত।

*লেখক: সুমাইয়া আক্তার, শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়