ঘুরে এলাম মক্কা–মদিনা
জীবনে কিছু ভ্রমণ থাকে, যার ছবি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আর কিছু ভ্রমণ থেকে যায় হৃদয়ের গভীরে। সময় পেরিয়ে গেলেও যার অনুভূতি মুছে যায় না। মক্কা ও মদিনার সফর আমার কাছে তেমনই এক যাত্রা।
রমজানের শেষ ১৫ দিন। মা ও সিফাত খালাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম পবিত্র ভূমির উদ্দেশে। যাত্রার আগে অবশ্য ছিল অনিশ্চয়তা। তখন ইরান যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট বাতিল হওয়ার খবর আসছিল প্রায় প্রতিদিন। আমাদের ফ্লাইটটি আদৌ ছাড়বে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়েই বিমান আকাশে উঠল।
বিমানের জানালা দিয়ে নিচের পৃথিবীকে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যেতে দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল, জীবনের ব্যস্ততা, দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তি যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। সামনে শুধু একটি গন্তব্য—মক্কা।
প্রথমবার কাবা দেখার মুহূর্ত
জেদ্দা বিমানবন্দরে পৌঁছে মক্কার পথে যাত্রা শুরু হলো। রাস্তার দুই পাশে পাহাড়। বিস্তীর্ণ শুষ্ক প্রান্তর। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি সেই শহরের দিকে, যার নাম ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি।
হোটেলে পৌঁছে আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। ১৫ জনের একটি দল পায়ে হেঁটে ইহরাম পরে রওনা হলাম মসজিদুল হারামের দিকে।
যতই এগোচ্ছিলাম, হৃৎস্পন্দন ততই বাড়ছিল।
তারপর হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল কাবা শরিফ।
আমি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কতবার ছবিতে দেখেছি। কতবার টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি। কিন্তু নিজের চোখে প্রথমবার কাবা দেখার অনুভূতি একেবারেই আলাদা। অজান্তেই চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
মনে হলো, বহু বছরের অপেক্ষা যেন আজ শেষ হয়েছে।
লেখক আহমেদ ফাইয়াদ ফেরদৌস রমজানের শেষ ১৫ দিন মা–খালাসহ মক্কা-মদিনা সফর করেন। প্রথমবার কাবা দেখে আবেগে কেঁদে ফেলেন। তাওয়াফ, সায়ি, দুটি ওমরাহ ও ঐতিহাসিক স্থান দেখার পাশাপাশি মসজিদে নববিতে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন।
তাওয়াফে হারিয়ে যাওয়া
তাওয়াফ শুরু হলো। চারপাশে অসংখ্য মানুষ। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা মুসলমান। ভাষা আলাদা, চেহারা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা। কিন্তু সবার মুখে একই উচ্চারণ, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...’
তাওয়াফের এক পর্যায়ে দলের অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। শুধু মা, সিফাত খালা আর আমি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হাত ধরে এগিয়ে চললাম।
আমি নিজের জন্য দোয়া করেছি। মা–বাবা, দাদা–দাদু, নানা–নানুসহ পরিবারের সবার জন্য দোয়া করেছি। বন্ধুদের জন্য দোয়া করেছি। দোয়া করেছি পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য।
কাবার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, মানুষের চাওয়া আসলে কত দীর্ঘ! অথচ সেই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চাওয়া হয়ে উঠেছিল একটাই, আল্লাহ যেন আমাদের ওপর সন্তুষ্ট থাকেন।
হাজেরা (আ.)-এর স্মৃতির পথে
তাওয়াফের পর শুরু হলো সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ি।
ছোটবেলা থেকে হজরত হাজেরা (আ.)-এর সেই ঘটনা শুনেছি। শিশু ইসমাঈল (আ.)-এর জন্য পানির সন্ধানে তিনি সাফা ও মারওয়ার মাঝে ছুটে বেড়িয়েছিলেন। তাঁর সেই ধৈর্য, সংগ্রাম ও আল্লাহর ওপর আস্থা আজও মুসলমানদের ইবাদতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। জমজম কূপের আবিষ্কার।
সায়ির সময় বারবার সেই ইতিহাস মনে পড়ছিল।
একজন মায়ের সন্তানের জন্য ছুটে চলা, তাঁর উদ্বেগ এবং আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাসের সেই ঘটনা শত শত বছর পরও আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে আছে।
মক্কায় রমজানের শেষ দিনগুলো
মক্কায় রমজানের শেষ দিনগুলো ছিল অন্য রকম। ইফতারের সময় মসজিদুল হারামের বিশাল চত্বর মুহূর্তের মধ্যে ভরে উঠত। খেজুর, জমজমের পানি ও নানা ধরনের খাবার নিয়ে মানুষ বসে পড়ত। কেউ কাউকে চেনে না। তবু সবাই যেন আপনজন।
অচেনা মানুষ একে অন্যকে ইফতার এগিয়ে দিচ্ছে। কেউ খেজুর দিচ্ছে। কেউ পানি দিচ্ছে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষগুলো যেন কয়েক মিনিটের জন্য একটি পরিবারের সদস্য হয়ে উঠছে।
রাত গভীর হলে শুরু হতো তারাবিহর নামাজ। ইমামের কণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াত। সামনে হাজারো মুসল্লি। কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনছেন, কেউ চোখের পানি মুছছেন, কেউ হাত তুলে দোয়া করছেন—এ দৃশ্য পুরোপুরি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
কাবা দেখার সেই প্রথম মুহূর্ত। তাওয়াফের ভিড়। সাফা ও মারওয়ার পথ। রমজানের ইফতার। রাতের তারাবিহ। মদিনার প্রশান্তি। সবুজ গম্বুজ। রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম জানানোর সেই মুহূর্ত। সবকিছু মিলে আমার জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায়।
ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে
মক্কায় ইবাদতের পাশাপাশি ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন স্থান দেখেছি। গিয়েছি জাবালে নুরে। হেরা গুহার কথা মনে পড়ছিল। গিয়েছি জাবালে সাওর, আরাফাতের ময়দান, মিনা ও মুজদালিফায়।
স্বপ্ন ৭১ থেকে প্রকাশিত ফেরদৌস ফয়সালের লেখা ‘মক্কা মদিনার মুসাফির’ বইতে এসব নাম পড়েছি। এবার সেই স্থানগুলো সামনে থেকে দেখলাম। তখন মনে হচ্ছিল, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নেই। কিছু জায়গায় দাঁড়ালে ইতিহাসকে আরও কাছ থেকে অনুভব করা যায়।
তায়েফ থেকে আবার ইহরামে
একদিন সকালে দলেবলে রওনা হলাম তায়েফের উদ্দেশে। মরুভূমির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তায়েফের কাছে আসতেই দৃশ্যপট বদলে গেল। পাহাড়ি পথ, উপত্যকা ও তুলনামূলক শীতল আবহাওয়া।
তায়েফ দেখা শেষে আমরা এগিয়ে গেলাম কারনুল মানাজিলের দিকে। বর্তমানে ‘আস সাইল আল কাবির’ নামে পরিচিত। এই স্থান মক্কার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিকাত।
সেখানেই ইহরাম পরলাম। সাদা ইহরামের কাপড় পরার পর মনে হলো, এতক্ষণ আমরা শুধু পথের যাত্রী ছিলাম। এখন আমরা ইবাদতের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলেছি। বাসে শুরু হলো তালবিয়া, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক।’
প্রথমে একজনের কণ্ঠে শুরু হয়েছিল। তারপর আরেকজন যোগ দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো বাসে ছড়িয়ে পড়ল সেই ধ্বনি।
কারনুল মানাজিল থেকে মক্কায় পৌঁছানো পর্যন্ত তালবিয়া চলতে থাকল। বাইরে পাহাড় ও মরুভূমির পথ পিছিয়ে যাচ্ছিল। ভেতরে একসঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছিল আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার সেই বাক্য।
সাত দিনে দুটি ওমরাহ পালন হয়ে গেল।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
মদিনায় অন্য রকম প্রশান্তি
মক্কায় সাত দিন কাটানোর পর যাত্রা করলাম মদিনার দিকে। মদিনায় পৌঁছে অনুভূতিটা ছিল মক্কার চেয়ে আলাদা। মক্কায় কাবা শরিফকে ঘিরে যে মহিমা অনুভব করেছি, মদিনায় এসে তার সঙ্গে যোগ হলো একধরনের প্রশান্তি।
মসজিদে নববিতে নামাজ পড়েছি। তারাবিহর নামাজে ইমামের সুললিত কণ্ঠ শুনেছি।
মদিনার ঐতিহাসিক স্থানগুলোও দেখেছি। বদর যুদ্ধের ময়দান, ওহুদ যুদ্ধের ময়দান ও খন্দকের স্থান। গিয়েছি মসজিদে কুবা, মসজিদে কিবলাতাইন, মসজিদে গামামা ও জান্নাতুল বাকিতে। এসব জায়গায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, ইসলামের ইতিহাসের নানা অধ্যায় যেন চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে।
মসজিদে নববিতে প্রথম ঈদ
এরপর এল ঈদুল ফিতরের সকাল। সৌদি আরবে এটাই ছিল আমার প্রথম ঈদ। ফজরের পর থেকেই মানুষের ঢল নেমেছিল মসজিদে নববির দিকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষ একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য জড়ো হয়েছেন।
লাখো মানুষের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ পড়লাম।
চারদিকে তাকবিরের ধ্বনি।
নামাজ শেষে মানুষ একে অন্যকে কোলাকুলি করছে। ভাষা আলাদা, দেশ আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, কিন্তু আনন্দের মুহূর্তে সবাই যেন একই পরিবারের।
সেই ঈদের সকাল আমার স্মৃতিতে আলাদা করে থেকে যাবে।
সবুজ গম্বুজের সামনে
মসজিদে নববির সবুজ গম্বুজ প্রথম দেখার মুহূর্তটি আজও চোখে ভাসে। মনে হচ্ছিল, বহুদিনের চেনা কোনো প্রিয় মানুষের শহরে এসে পৌঁছেছি।
এরপর এল রওজা মোবারক জিয়ারতের সুযোগ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি সালাম জানাতে গিয়ে বুক কেঁপে উঠছিল।
ফেরদৌস ফয়সালের লেখা ‘মক্কা মদিনার মুসাফির’ বইতে তাঁর জীবনী পড়েছি। কতবার তাঁর নাম শুনে দরুদ পড়েছি। আজ তাঁর শহরে দাঁড়িয়ে তাঁকে সালাম জানাচ্ছি। চোখের পানি থামানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
সেই মুহূর্তে কোনো বড় কথা মনে আসেনি। শুধু মনে হয়েছে, আল্লাহ আমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন। এর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই।
মায়ের সঙ্গে অমূল্য স্মৃতি
এই পুরো সফরে আমার মা ছিলেন আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। তাঁকে নিয়ে কাবার সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া করা। মসজিদে নববিতে একসঙ্গে নামাজ পড়া। জমজমের পানি পান করা। পবিত্র শহরের পথে পাশাপাশি হাঁটা। প্রতিটি মুহূর্তই ছিল বিশেষ।
সিফাত খালাও ছিলেন পুরো সফরের প্রাণ। আমরা একসঙ্গে হেঁটেছি, দোয়া করেছি, কেঁদেছি, আবার অনেক মুহূর্তে হেসেছিও।
এই সফর আমাদের পরিবারের স্মৃতিতে নতুন অনেক গল্প যোগ করেছে। ফিরে এলাম, স্মৃতি রয়ে গেল, অবশেষে দেশে ফেরার দিন এল।
বিমান যখন সৌদি আরবের আকাশ ছেড়ে উড়তে শুরু করল, জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। মক্কা ও মদিনা ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমার হৃদয়ের একটি অংশ যেন ওই দুই শহরেই রয়ে গেছে।
সফর শেষ হয়েছে। কিন্তু অনুভূতিটা শেষ হয়নি। বরং মনে হয়েছে, এই যাত্রা আমাকে নিজের দিকে নতুন করে তাকাতে শিখিয়েছে। জীবনের ব্যস্ততা থাকবে, দুশ্চিন্তা থাকবে, পাওয়া না–পাওয়ার হিসাব থাকবে। কিন্তু সবকিছুর ওপরে রয়েছে নিজের রবের সঙ্গে সম্পর্ক।
মক্কা আমাকে বিনয়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। মদিনা আমাকে ভালোবাসা ও প্রশান্তির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। আর পুরো সফর আমাকে শিখিয়েছে, পবিত্র ভূমির পথে যাত্রা শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি নিজের ভেতরের দিকে ফিরে তাকানোরও একটি সুযোগ।
দেশে ফিরে এসেছি। কিন্তু মক্কা ও মদিনার স্মৃতি এখনো সঙ্গে আছে। কাবা দেখার সেই প্রথম মুহূর্ত। তাওয়াফের ভিড়। সাফা ও মারওয়ার পথ। রমজানের ইফতার। রাতের তারাবিহ। মদিনার প্রশান্তি। সবুজ গম্বুজ। রওজা মোবারকের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম জানানোর সেই মুহূর্ত।
সবকিছু মিলে আমার জীবনের একটি বিশেষ অধ্যায়। জীবনের সেরা ভ্রমণ যদি একটি নামেই পরিচিত হয়, তবে আমার কাছে সেই নাম—মক্কা ও মদিনা।