শহীদ সাফওয়ান আখতার সদ্যর মায়ের আবেগঘন কিছু কথা
দিন যায়, মাস যায়। আজ দুই বছর হয়ে গেল, কেউ আর আমাকে সেই দুনিয়া কাঁপানো ডাকটি দেয় না, ‘মা’। সেই জড়তামাখা ভাষায় প্রথমবার তুমি যখন আমায় ‘মা’ বলে ডাকলে, সেই ডাকের সরলতা, সেই কোমলতার সুর হারিয়ে গেল। আজ সেই ডাক হারিয়ে গেছে, হারিয়েছে সেই মুহূর্তের সরলতা আর নির্মল আনন্দ।
যেদিন প্রথমবার ছেঁড়াফাটা শরীর নিয়ে তোমাকে বুকের মাঝে চেপে ধরেছিলাম। সেই মুহূর্তটিই আজ স্মৃতির পাতায় ধোঁয়াটে হয়ে গেছে। তোমার বাবা আর আমি থাকতাম তোমার শৈশবের প্রতিটি কোণে। তুমি ছিলে আমাদের পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু। তবে তোমার শৈশব, সেই প্রাণবন্ত মুহূর্তগুলো আমার হৃদয়ে আজীবন দীপ্তি ছড়াবে। তোমাকে ঘুম পাড়ানো, তোমার খেলনা গোছানো, ভালোবাসায় ভিজিয়ে রাখা দিনগুলো কখনো ভোলার নয়। মনে পড়ে, তোমার ছোট্ট হাতের টান, দুধের গন্ধমাখা শরীরের উষ্ণতা, তোমার সেই অবুঝ নির্ভরতায় ভরা ভালোবাসা—এই অনুভূতিগুলোর আর কোনো বিকল্প নেই। কারণ, তুমি ‘সদ্য’ একবারই এসেছিলে...।
আজও খুব জানতে ইচ্ছা করে, কেমন আছ তুমি, বাবা? কিন্তু কান্না থাকে যা শব্দ নয়, বিলাপ নয়, কোনো আর্তনাদ নয়; শুধু বুকের ভেতর এক অসমাপ্ত ভার। আমরা কিচ্ছু ঠেকাতে পারি না। আজ দুই বছর ধরে আমরা আত্মাহীন প্রেতের মতো বেঁচে আছি, যেন সময় আমাদের কেবল গুনছে পূর্ণতা নয় এক অপূর্ণতার দিকে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
তোমাকে নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকতাম—পড়াশোনা, স্কুল, গৃহশিক্ষক, তুমি কী খাবে, কী করলে খুশি থাকবে, কেমন করে ভবিষ্যৎ গড়বে—এসব নিয়েই আমার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল পূর্ণ। নিজের কোনো স্বাধীনতা পাইনি, হারিয়ে ফেলেছি শান্তির ঘুম, পারিনি নিজেকে সময় দিতে। নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম তোমার স্বপ্ন, তোমার ভবিষ্যৎ।
এখন আর আমাকে সকাল সকাল উঠে তোমার স্কুলব্যাগ গোছাতে হয় না, ড্রেস ইস্তিরি করতে হয় না, টিফিন বানাতে হয় না। আর শখ করে তোমার জন্য ঘড়ি, খেলনা কিংবা জামাকাপড় কেনা হয় না। সন্ধ্যা হলেই আর তুমি বায়না ধরো না ফুচকা বা চটপটি খাবে বলে।
তোমার জন্য আলাদা রান্না করা, সেই ছোট ছোট পেরেশানিও আজ আর হয় না। আমি না এখন আর ভুনা খিচুড়ি রান্না করি না, বাবা।
তুমি তো নেই, কেউ আর খেতে চায় না। তোমার বাবাকে দেখে কেউ আর দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে না। তার চোখে সেই উচ্ছ্বসিত ভালোবাসা আর দেখা যায় না। এই দুই হাত দিয়ে তোমাকে গোসল করিয়ে আদর করে মুছে দিয়ে বুকে চেপে ধরার সেই মুহূর্ত—সব আজ অতীত। ঘুমানোর আগে আর কেউ বারবার বলে না, ‘গুড নাইট, মা’।
এই দুটি বছর আমাদের কাছে কেবল সময় নয়, যেন এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঝুলে আছে চারদিকে। ‘সদ্য’ একবার এসেছিল, আমাদের জীবনে আলো জ্বালিয়েছিল, ভালোবাসার অর্থ শিখিয়েছিল, আর চিরতরে চলে গেল। সেই কঠিন দিনটি হলো ২০২৪–এর ৫ আগস্ট , যা জুলাই গণ–অভ্যুত্থান দিবস হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখ্য, সদ্য সাভার ক্যান্টেনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের একজন মেধাবী ছাত্র ছিল এবং তার ব্যবহার ও মায়াবী চেহারার কারণে সবার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিল।
লক্ষ্মীসোনা, তোমার রেখে যাওয়া আদর্শ ও স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে দেশ ও দশের কল্যাণে কাজ করে যাব, ইনশা আল্লাহ।
লেখক: খাদিজা বিন জুবায়েদ, শহীদ সাফওয়ান আখতার সদ্যর মা, মা-মণি প্রপার্টিজ-২, ১০৮/৫ ডগরমোড়া, সিআরপি রোড, সাভার, ঢাকা।