প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালিত হয়। এদিন শিক্ষকদের অবদানের কথা তুলে ধরা হয় বিভিন্ন সেমিনার–সিম্পোজিয়ামে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই শিক্ষকের সম্মান রয়েছে। রয়েছে তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত সম্মানী, নিরাপত্তা ও আবাসনের সুব্যবস্থা। আমাদের দেশে নানা সুবিধা বাড়লেও এখনো শিক্ষকেরা সেভাবে কাঙ্ক্ষিত সম্মানী এবং অন্যান্য সুবিধা পান না। যদিও লোডশেডিং কর্মসূচি বাস্তবায়নে বর্তমানে সপ্তাহে এক দিনের পরিবর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুদিন ছুটি করা হয়েছে এবং আগামী বছর থেকে নতুন শিক্ষাক্রম ও শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।
আমি মনে করি, উপযুক্ত সম্মান ও সম্মানী পাওয়া শিক্ষকদের অধিকার। এ ক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময় এই বৈষম্যসহ নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষকেরা রাস্তায় নামেন, সরব থাকেন। প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করেন। সরকারকে শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিগুলো নিয়ে ভাবার অনুরোধ জানাই। শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবি কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কখনো অস্বীকার করেন না ঠিকই, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপও তেমন নিতে দেখা যায় না।

দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাতে লাখো শিক্ষক শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দান করে যাচ্ছেন। আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাদের মানুষ করার জন্য। এরপরও নানা সময় শিক্ষকেরা বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হন। সম্মুখীন হন নানা প্রতিকূলতার। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন সমাজের কিছু দুষ্ট লোক। তবে তারা সংখ্যায় অতি নগণ্য।

সম্রাট আলমগীরের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ দেওয়ার ঘটনাটি আমরা সবাই জানি। সেই ঘটনা নিয়ে লেখা কবিতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাংলা পাঠ্যপুস্তকে রয়েছে। সম্রাট তাঁর পুত্রের শিক্ষককে যেভাবে মর্যাদা দিয়েছিলেন, সে ধরনের মর্যাদা কি এখন আছে? বাদশাহর পুত্র পায়ে পানি ঢালছেন আর এটিকে অপরাধ মনে করেছিলেন শিক্ষক। কিন্তু সম্রাট অবাক করে দিয়ে শিক্ষককে দিলেন সম্মান। বললেন, পুত্র কেন শিক্ষকের পায়ে শুধু পানি ঢালবে! পুত্রের উচিত পানি ঢালার পাশাপাশি পায়ে হাত দিয়ে ধুয়ে দেওয়া।
শ্রদ্ধাবোধ কমে এলেও সমাজে শিক্ষকদের একটি সম্মানজনক স্থান রয়েছে। আগের দিনে মানুষ শিক্ষকদের যথোপযুক্ত সম্মান করতেন। সন্তানকে মানুষ করতে শিক্ষকের হাতে তাকে তুলে দিতেন। এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ শিক্ষকদের সম্মানের আসনে বসান, ছুটে যান তাঁদের যেকোনো সমস্যায়।

সমাজে আলো ছড়াচ্ছেন শিক্ষকেরাই। পর্যাপ্ত সুবিধাদি না পেলেও তাঁরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। থেমে নেই তাঁদের কর্মতৎপরতা। দেশে প্রতিবছর বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার যে আশা জাগানিয়া ফলাফল, তার কারিগর কিন্তু এই শিক্ষক সমাজ। তাদের প্রচেষ্টায়ই এই সফলতা। কিন্তু অপর্যাপ্ত বেতনে কীভাবে তাঁদের সংসার কাটছে, তা বলা মুশকিল। তাই শিক্ষকদের জন্য নতুন পে স্কেল বা মহার্ঘ্য ভাতার ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি।

দেশের সব স্তরে যাঁরা দায়িত্ব পালন করে চলেছেন, তাঁরা সবাই কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের ছাত্র। সে হিসেবে দেশের উন্নয়নের পেছনেও রয়েছে শিক্ষকদের অবদান।

শিক্ষকেরা বছর বছর দেশের জন্য তৈরি করছেন মেধাসম্পদ, যে সম্পদ দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সহায়ক। শিক্ষকদের প্রতি সবার উপযুক্ত শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত। এ শ্রদ্ধাবোধের মাত্রা আমাদের সমাজ থেকে দিন দিন উবে যাচ্ছে। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোলেই দেখা যায় অনেক ছাত্র শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান দেয় না। এমনকি সালামটুকুও দিতে চায় না, যা আমাদের জন্য অবশ্যই চিন্তার বিষয়। হ্যাঁ, দেখা যায়, বেশ কিছু শিক্ষক দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট তৎপর থাকেন না। এ ধরনের মন-মানসিকতা অবশ্যই পরিহার করা উচিত। এরপরও আমি বলব, দেশের শিক্ষকদের বেশির ভাগই দায়িত্ব পালনে অটল থাকেন, অব্যাহত রাখেন মানুষ গড়ার প্রচেষ্টা।

শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কমিশন গঠনপূর্বক উপযুক্ত সম্মানীর ব্যবস্থা করা, নানা সুবিধা বৃদ্ধি ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ করা দরকার। যথাযথ প্রশিক্ষণ, আবাসনব্যবস্থাসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো উচিত। শিক্ষকদের সম্মান ও সম্মানীর যেন কোনো ঘাটতি না থাকে। সুনিশ্চিত হোক তাঁদের অধিকার। এ ব্যাপারে সবার সচেতনতা কাম্য।

*লেখক: শিক্ষক