ডিজিটাল পাল্লার দাপটে বিলুপ্ত ‘আড়ং দাঁড়ি’, এখন ড্রয়িংরুমের শোভাবর্ধক

একসময় গ্রামবাংলার হাটবাজারে পণ্য কেনাবেচার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ ছিল প্রাচীন তুলাদণ্ড ‘আড়ং দাঁড়ি’ বা ‘বিশি’। ধান, চাল, পাট—সবকিছুর ওজন নির্ধারণে এই যন্ত্রের ওপরই ছিল ব্যবসায়ীদের নির্ভরতা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল পাল্লার দাপটে ঐতিহ্যবাহী সেই যন্ত্র আজ প্রায় বিলুপ্ত। এখন তা কেবল জাদুঘর বা স্মৃতির পাতায় ঠাঁই পাচ্ছে।

তবে ব্যতিক্রমী এক দৃশ্য দেখা গেল ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া থানার বারঘরিয়া এলাকায়। সেখানকার প্রবীণ ধান-চাল ব্যবসায়ী আবদুল রাজ্জাক এখনো যত্ন করে আগলে রেখেছেন কয়েক দশক পুরোনো একটি আড়ং দাঁড়ি। একসময় এই দাঁড়িতেই মণকে মণ ধান–চাল ওজন করা হতো। প্রযুক্তির উৎকর্ষে এর ব্যবহার বন্ধ হলেও তিনি এটি ফেলে দেননি; বরং নিজের বাড়ির ড্রয়িংরুমে ফ্যান ঝোলানোর আংটার সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছেন স্মৃতি হিসেবে।

আবদুল রাজ্জাক বলেন, ‘এই আড়ং দাঁড়ি আমাদের ব্যবসার শুরুর দিনের সাক্ষী। একটা সময় ছিল, এই দাঁড়ি ছাড়া ধান-চালের কারবার কল্পনাই করা যেত না। কতশত মণ ধান যে এতে ওজন করা হয়েছে, তার হিসাব নেই। এখন যুগ বদলেছে, কম্পিউটার স্কেল এসেছে। কিন্তু পুরোনো এই জিনিসের প্রতি মায়া ছাড়তে পারিনি। তাই অবহেলায় ফেলে না রেখে ঘরের ফ্যানের আংটায় ঝুলিয়ে দিয়েছি। এটা দেখলে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে, মনটাও ভালো থাকে। বাড়ির সৌন্দর্য যেমন বাড়ে, তেমনি নাতি-পুতিরাও জানতে পারে, আমরা আগে কীভাবে কাজ করতাম।’

বাড়িতে আসা নতুন অতিথিরাও কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে দেখেন পুরোনো দিনের এই অনন্য নিদর্শন। এটি এখন আর শুধু একটি যন্ত্র নয়; বরং বাড়ির আভিজাত্য, স্মৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে এটি যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত টুকরা।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে আড়ং দাঁড়িটি বিজ্ঞানের ‘লিভার নীতি’র ওপর ভিত্তি করে তৈরি। একটি দীর্ঘ লোহার দণ্ডের এক প্রান্তে বড় হুক থাকে, যেখানে পণ্য ঝোলানো হয়। দণ্ডের গায়ে থাকা ছোট ছোট খাঁজ বা দাগ অনুযায়ী নির্দিষ্ট বাটখারা এদিক-ওদিক সরিয়ে নিখুঁত ওজন নির্ধারণ করা হতো। একসময় বড় বড় ধানের আড়ত কিংবা পাটের গুদামে এই যন্ত্র ছিল অপরিহার্য।

প্রযুক্তির জোয়ারে হারিয়ে যাওয়া এমন অসংখ্য লোকজ ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। আবদুল রাজ্জাকের মতো মানুষদের হাত ধরেই এসব স্মৃতি বেঁচে আছে। তাঁদের সংরক্ষণপ্রচেষ্টার মাধ্যমেই নতুন প্রজন্ম জানতে পারছে আমাদের অতীতের সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক ইতিহাস ও গ্রামবাংলার কর্মসংস্কৃতির কথা।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]