ইগো

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

আমাজন জঙ্গলের গভীরে, সভ্যতার সীমান্ত থেকে অনেক দূরে এক বিস্ময়কর জায়গায় ‘ঋদ্ধি নির্মল রিসোর্ট’। এখানে আসতে হলে নৌপথে কয়েক ঘণ্টা, তারপর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পায়ে হেঁটে আসতে হয়। চারদিকে নিস্তব্ধতা। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে অচেনা পাখির সুর ভেসে আসে। এখানে সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছায় না। এই জায়গাটা পুরো বাইরের জগৎ থেকে আলাদা।

এই রিসোর্টের মালিক বাঙালি, ‘ঋদ্ধি চৌধুরী’। বয়স চল্লিশের কোঠায়, শান্তমুখ, আত্মবিশ্বাসী মন। এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, যা জন্মেছে জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকে।

এই রিসোর্টে সাধারণত কেউ দ্বিতীয়বার আসে না, তবে যাঁরা একবার আসেন, তাঁরা ফিরে গিয়ে আবার আসার জন্য এক অদ্ভুত টান অনুভব করেন। তাঁদের খাবারগুলো বেশ ট্র্যাডিশন আর ট্রেন্ডের সমন্বয়ে সাজানো যা অন্যান্য রিসোর্টের থেকে একেবারেই আলাদা। জায়গাটি দূরবর্তী আর ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে আসলেও আসেন ধনীর দুলাল, নতুন ক্যাপেল, নায়ক-গায়ক না হয় সন্ন্যাসি লেখক।

এই প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম ব্যতিক্রমধর্মী। মালিক ঋদ্ধি হলেও এখানের ওয়েস্টেস হতে সেইফ, সবাই পাটনার। স্ট্রং পার্সোনালিটি নিয়ে লেখা পড়া করেছেন ফুড সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে। বিদেশে উচ্চশিক্ষা জন্য এসে নিজেই এখানের উদ্যোক্তা। পেরুর আমাজন জঙ্গলের মধ্যে রিসোর্ট খুলে বসা মানে জীবনকে বাজি রাখা।

সকালে রিসোর্টেও টেবিল পরিষ্কার করতে গিয়ে ওয়েট্রেস টেবিলের নিচে একটি মানিব্যাগ পেলেন। সেটি তুলে এনে ঋদ্ধির হাতে দেন। ব্যাগটা হাতে নিয়ে ঋদ্ধির মনে হলো, কেউ ভুল করে রেখে গেছেন। কদিন কেটে গেলেও কেউ খোঁজ করতে এল না। কৌতূহল আর ঠিকানা চেক করতে ব্যাগটি খুলল, দুটি বিদেশি ব্যাংকের মাস্টারকার্ড, কিছু ডলার, একটি সাদা-কালো লেমিনেটেড করা পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

ছবিটির দিকে তাকিয়ে গা শিউরে উঠল ঋদ্ধির। এই ছবিটি তাঁর, নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশনের সময় তোলা। কিন্তু এই ছবিটি কে রেখেছেন?

ঋদ্ধি দ্রুত সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলেন। ক্যামেরায় দেখা যায় একজন বিদেশিনী ও দুটি বাচ্চা। পাশে একজন পুরুষ, যার মুখ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। বাচ্চাদের ভাষা ও চেহারায় মনে হচ্ছে এরা ফরাসি।

এলোমেলো হয়ে আসে সব ভাবনা। মন যেন একটা ঘূর্ণিপাকের মধ্যে আটকে গেল।

কে? জ্যোতি স্যার..! না বন্ধু সালেনূও ? হয়তো... জ্যোতি স্যার।

অলংকরণ: আরাফাত করিম

উনি তো এ দেশে সেটেলড। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ঋদ্ধি। বাবার তিক্ততায় আজ উনাকে মিস করছেন। চারপাশে সবকিছু থেকেও আজীবন যে মানুষটিকে মিস করা, সেটাই কি ভালোবাসা? উত্তর জানা নেই ঋদ্ধির। মানুষ যে বলে পৃথিবীটা গোল। একসময় না একসময় প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা হয়। দার্শনিকদের এমন কথার উত্তর মিলেনি ঋদ্ধির কাছে।

পড়ালেখায় ভালো না হলেও, মেয়েটি বাবার কলিজার টুকরা। তাঁর তিন ছেলের পরে আদরের একমাত্র মেয়েটি। নবম শ্রেণিতে কোনোভাবেই এলাও হলো না। চৌধুরী সাহেবের টাকাপয়সার অভাব নেই। কিন্তু শিক্ষাটা যেন অধরা রয়ে গেল উনার পরিবারের কাছে। অঙ্কে কম নম্বর পাওয়ায় স্কুলের বান্ধবীদের হিংসাত্মক মন্তব্য, কটাক্ষ, ভুল–বোঝাবুঝি মিলিয়ে ঋদ্ধির মনে দোলাচল তৈরি হয়।

বাবার সঙ্গে গাড়িতে বসে গুম হয়ে থাকে।
মা কী হয়েছে?
: বাবা, আমি অঙ্কে নম্বর কম পেয়েছি।
এখন কি মাস্টার বদলাবে, তা–ই না মা?
: তুমি না বাবা! একটু শুনো না!”
আগে আমার কথাটা  শোন।
: আমাকে নামিয়ে দাও।
ড্রাইভার বাপ-মেয়েকে ভালো বুঝতে পারেন। মাঝখানে বলে ওঠেন ও মা, আগে বাবার কথা শুনেন, তারপর আপনি বলেন।

মা আমার বাবা বলতেন তোমার ইগো থাকলে তুমি বাঁচাতে শিখবে। আর বাঁচতে হলে লড়তে হবে। থাকতে হবে দৃঢ়তা এবং শক্ত মানসিকতা। পাখিদের মধ্যে ঈগল হচ্ছে রাজা, এরা কখনো মরা প্রাণীর মাংস খায় না। কারও মুখের খাবার বা শিকারের দিকে চোখ তুলে তাকায় না। এটা হচ্ছে ওদের আত্মসম্মান বা ইগো বলা যায়। ঈগলের মতো উঁচুতে উঠতে শিখ। নিচের কিছু সম্পর্কের বাঁধ কেটে দাও। তোমার আত্মীয় বা পরিবারে যখন তোমার প্রয়োজনীয়তা নেই, সেখান থেকে বিনা বাক্য ব্যয়ে দূরে সরে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। সেখান থেকে তোমার উপকার হবে মানুষ চিনতে পারবে। সম্পর্কের ব্যালান্স করে চলতে হবে। কিছু কিছু দূরত্ব ভালো কিছু পাইয়ে দেয়। সাময়িক বিচ্ছেদ শক্ত বাঁধন তৈরি করে। মনকে মানসিক দৃঢ়তায় লোহার মতো আগুনে পুড়লে ভালো কিছু পাওয়ার আশা করা যায়। কখনো কখনো দূরত্বই—শক্ত বন্ধন তৈরি করে। পুড়তে শেখো, তাহলেই গড়া শিখবে।

ঋদ্ধি চুপচাপ বাবার কথা শুনেছিল সেদিন। বুঝতে পারেনি কেন, কথাগুলো মনের গভীরে গেঁথেছিল।

সেই বছরই নতুন অঙ্কের শিক্ষক জ্যোতি স্যারকে রাখলেন। চুপচাপ, পরিপাটি, আর চোখে অদ্ভুত এক নরম দৃঢ়তা। প্রথম দিন থেকেই ঋদ্ধির মনে স্যারকে নিয়ে এক অজানা কৌতূহল জাগল।

স্যারের পড়ানোর ভঙ্গি ছিল ভিন্ন। কখনো বকতেন না, সব সময় তাঁর মুখে একচিলতে হাসি লেগে থাকত।

ঋদ্ধির অঙ্কের নম্বর যেমন বাড়ছে, তেমনি এক অদ্ভুত টানও বাড়ছে স্যারের জন্য।
একদিন স্কুল শেষে বৃষ্টির মধ্যে ছাতার জন্য অপেক্ষা করছিল ঋদ্ধি। স্যার এসে ছাতা এগিয়ে দিলেন। দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য একে অপরের চোখে আটকে গেল। এক মুহূর্তেই যেন সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। কোন কথা বলা হয়নি, সেই না-বলা কথাগুলোই ছিল..।

একদিন, হঠাৎ জ্যোতি স্যার আর পড়াতে আসে না। কিছুদিন পর শোনা যায়, স্যার বিদেশে পড়তে চলে গেছেন। তবে যাওয়ার আগে ঋদ্ধির বাবার কাছে স্যার গিয়েছিলেন ঋদ্ধিকে ভিক্ষে চাইতে। কিন্তু, দেননি।

ঋদ্ধি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে আমাজনের রাত, চারদিকে ঝিঁঝিপোকার আওয়াজ। রাতের নিস্তব্ধতায় জ্যোতিকে বেশ মিস করছে। ঋদ্ধি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘তুমি চলে গেলে, কারণ তোমার ইগো ছিল। আমিও বাঁচতে শিখেছি, তোমার শেখানো সেই ইগো নিয়েই।” দুই ফোঁটা অশ্রু চিবুক স্পর্শ করে।

হয়তো আর কোনো দিন বলা হবে না। ভালোবেসে সারা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু, বলতে না পারাটা...।