হুমায়ূন আহমেদকে চিঠি
প্রিয় হুমায়ূন স্যার,
আজ ১৯ জুলাই। শ্রাবণের আকাশে মেঘেদের ডাক আর এই বুকে এক অতলান্ত হাহাকার—ঠিক যেমনটি আপনার উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা কোনো এক বিরহিনী রাত। নুহাশপল্লীর নির্জন লিচুর ছায়ায় আপনি পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন; কিন্তু এপারে আমাদের বুকের ভেতর আজ এক উদাসী বিকেল আর অশান্ত ঝড় বয়ে চলেছে।
আচ্ছা স্যার, চৌদ্দ বছর আগের সেই বিষাদমাখা দিনটার কথা কি আপনার মনে পড়ে? কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তখন চারপাশের আকাশ-বাতাস কাঁদছিল। সেই কান্নার মেঘে মেঘাচ্ছন্ন হয়ে, দুটো কদম ফুল হাতে, হলুদ পাঞ্জাবি পরা একটা সদ্য কৈশোর পেরোনো হ্যাংলা-পাতলা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেটার নাম রাহাত। চারপাশের আকুল করা কান্না দেখে সে তার চোখের জল লুকিয়ে রাখতে পারেনি। আজ এত বছর পরও চোখ বন্ধ করলেই সেই অশ্রুসজল মুখখানি আমার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে! কেন আপনি এমন এক মায়ার বাঁধনে আমাদের বেঁধে দিয়ে হুট করে অন্য ভুবনে পাড়ি জমালেন?
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
তীব্র মন খারাপে আপনার শেষ ইন্টারভিউয়ের কথাগুলো শুনি। আপনি কি অবলীলায় বললেন—‘নুহাশপল্লীর ভোরটা অনেক সুন্দর... গাছ-পাখি-নারকেল ও তালগাছের সারি... কিন্তু আমি থাকব না...’ আপনি নেই; কিন্তু আপনার রেখে যাওয়া এই জাদুকরি সৃষ্টি আমাদের নিশ্বাসে মিশে আছে!
আপনার ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ আর ‘অপেক্ষা’র অবিনাশী সুর আমার মনের সব তারকে ঝঙ্কৃত করে তুলেছিল। সেই সুরের আবেশেই একদিন আমার ভেতরে শিশুর মতো ঘুমন্ত লেখক সত্তাকে আবিষ্কার করি। পাঠক আমায় বাহবা দিল কি দিল না, সে হিসাব আমি মেলাতে যাইনি; আমি স্রেফ লিখে চলেছি নিজের ভেতরের রুদ্রাক্ষকে শান্ত করতে, মনের তৃষ্ণা মেটাতে।
একটা সময় আপনার ‘হিমু’র নেশা আমাকে এমনভাবে পেয়ে বসেছিল যে নিজেকেই হিমু আবিষ্কার করে বসতাম! অদ্ভুত আচরণ, কংক্রিটে উদাসীন ছুটে চলা; কিন্তু হিমুর সেই ভেতরের ইস্পাতকঠিন উদাসীনতা কি সবাই ছুঁতে পারে? আমি পুরোপুরি হিমু হতে পারিনি কিংবা ‘বাকের ভাই’ হয়ে কোটি হৃদয়ে কাঁপন ধরাতে পেরেছি কি না তা–ও জানি না; তবে আপনার সৃষ্টির আগুনে পুড়েই আমি নিজেকে চিনতে শিখেছি। নিজেকে পড়তে শিখেছি৷
আমি জানি, এ চিঠির কোনো সাকিন নেই, কোনো ডাকপিয়ন এই খাম নিয়ে আপনার ঠিকানায় পৌঁছাতে পারবে না। এ আকুতি কেবল বন্দী পাখির খাঁচা ভাঙার আকুতি, এক উড়োচিঠি! বাতাসের ডানায় ভর করে আমার হৃদয়ের সব ভালোবাসা, আর্তি আর অশ্রু নিংড়ানো শ্রদ্ধা আপনার উদ্দেশে পাঠিয়ে দিলাম।
শব্দের জাদুকর, অদেখা ভুবনের মহাকাশে ওপাশে আপনি ভালো থাকুন, আলো হয়ে থাকুন।
আপনারই সৃষ্টির এক চিরন্তন অনুরাগী,
এক অবাধ্য একলব্য।
লেখক: তানভীর হাসান রামিম, বসুন্ধরা, ঢাকা।