ক্ষুদ্রঋণের ব্যাংক কেন নয়
কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ সম্পর্কিত কিছু প্রতিবেদন দেখে বেশ ভালো লেগেছে। শিরোনামগুলো ছিল—‘এখনো গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি ক্ষুদ্রঋণ’, ‘সংস্কারের বাইরে থেকে যাবে কি এনজিও’, ‘ক্ষুদ্রঋণ হয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র অর্থায়ন, ‘আইন পরিবর্তন হচ্ছে’। তথ্যবহুল এসব প্রতিবেদন আমার নজর কেড়েছে। প্রতিবেদনগুলোয় যেসব তথ্য–উপাত্ত উঠে এসেছে, বলার অপেক্ষা রাখে না যে ক্ষুদ্রঋণ আর ক্ষুদ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম বিশেষায়িত কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে।
এখন ক্ষুদ্রঋণের সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গেই ছাপানো হচ্ছে। অনেক নেতিবাচক মন্তব্য এমনকি কখনো কখনো কটাক্ষ করে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ‘সুদখোর’ গালিও শুনতে হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সবকিছুই বদলায়। মানুষও বদলায়।
দেশে বর্তমানে ৭১৪টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও ৩৬৩টি সাময়িক অনুমোদনপ্রাপ্ত অর্থাৎ ১ হাজার ৮৭টি ক্ষুদ্র অর্থায়নের জন্য ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালু রয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের শাখার সংখ্যা ২৬ হাজারের অধিক। যেখানে কর্মরত কর্মীর সংখ্যা ২ লাখ ২৪ হাজার। ক্ষুদ্রঋণের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি, এর মধ্যে সক্রিয় ঋণী গ্রাহক রয়েছেন ৩ কোটি ২৫ লাখের বেশি। ঋণের স্থিতি প্রায় ১৬০ লাখ কোটির বেশি। এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্য নিরসনে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, গ্রামীণ ক্ষমতার ও সুশাসন কাঠামোতে এবং পরিবেশ উন্নয়নে। গ্রামীণ অর্থনীতির ৭৩ শতাংশ অর্থায়ন বেসরকারি সংস্থা দ্বারা হয়েছে।
কমবেশি সবাই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ মডেলের অনুকরণে এবং ব্যবস্থাপনার কিছু সংযোজন ও বিয়োজন করে স্ব–স্ব প্রতিষ্ঠানের ঋণের মডেল চালু রেখেছেন। ক্ষুদ্রঋণের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো জামানতবিহীন ঋণ ও ৯৫ শতাংশ নারী সদস্যের মধ্যে ঋণ বিতরণ করা। ঋণ ব্যক্তিগত হলেও ব্যবস্থাপনা সমিতিভিত্তিক। সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তি, ঋণের সঙ্গে সাপ্তাহিক, বাধ্যতামূলক সঞ্চয়, স্বেচ্ছা সঞ্চয় বা মাসিকভিত্তিক মেয়াদি সঞ্চয় এবং ঋণ ঝুঁকি তহবিল, অভ্যন্তরীণ ঋণ বিমা ব্যবস্থা ইত্যাদি আর্থিক সেবা রয়েছে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আর্থিক সেবা গ্রহণের জন্য সদস্যদের বছরে একবার শাখায় আসতে হয় ঋণ নিতে। কিন্তু বছরের ৫২ সপ্তাহে কর্মীরা সদস্যদের বাড়ি থেকে ঋণের কিস্তি ও সঞ্চয় আদায় করে আনেন। তাই ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো সুদ না বলে সেবা মাশুল (সার্ভিস চার্জ) বলে। কারণ, কর্মীদের ৮০ শতাংশ সময় ব্যয় হয় মাঠে ময়দানে ও সদস্যদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানোর জন্য।
ক্ষুদ্রঋণের প্রভাব নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান গবেষণা করেছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), মাইক্রো ক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ), ইনস্টিটিউট অব মাইক্রো ফিন্যান্স (আইএনএম)সহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন গবেষণায় এটা প্রমাণিত যে ক্ষুদ্রঋণের ইতিবাচক প্রভাব বহুমুখী। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী তা স্বীকৃত। বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশকে অনেক ঊর্ধ্বে তুলে ধরে পরিচিত করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর গ্রামীণ ব্যাংক মডেল। বিশ্ববাসী জানে যে বাংলাদেশ ক্ষুদ্রঋণের জন্মভূমি ও তার জনক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বেসরকারি সংস্থার অনেক ধরন আছে। কাজে আছে বৈচিত্র্য। কেউ ক্ষুদ্রঋণের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, কেউ আবার ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি সামাজিক কার্যক্রম করে। আবার কেউ কাজ করে বিদেশিদের অনুদান নিয়ে। কেউ আছে আবার অনুদানমুক্ত। কেউ আছে মানবাধিকার নিয়ে শুধু কাজ করে। দেশের বাইরে অনেক দেশে যেমন ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, কেনিয়া, উগান্ডা, তানজানিয়া, রুয়ান্ডা, জাম্বিয়া, ঘানা, সিয়েরা লিওন, নাইজেরিয়া, লাইবেরিয়া, ইরিত্রিয়া, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, জর্ডান ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান কাজ করে। বিদেশে গ্রামীণ ব্যাংক, আশা, ব্র্যাক, সাজেদা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কোটির বেশি পরিবার ক্ষুদ্রঋণের আর্থিক সেবা পাচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণের জন্য কাঠামোগতভাবে তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে, যা বিশ্বের অন্য কোথাও নেই। যেমন এমআরএ, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও সদস্যদের থেকে সঞ্চয় নেওয়ার সুযোগ দেওয়া। মূলত বেসরকারি সংস্থার ঋণের স্থিতির প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে জনগণের সঞ্চয় থেকে, ৩৪ শতাংশ আসে উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে, ২৭ শতাংশ তহবিল আসে পিকেএসএফসহ অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে। এটা হচ্ছে গতানুগতিক ব্যাংকিংয়ের বিপরীত চিত্র।
এনজিও কর্তৃক আদায়কৃত সঞ্চয়ের ১০০ ভাগই সদস্যদের জন্য ঋণের কাজে ব্যবহৃত হয়। এমআরএ কর্তৃক ঋণের স্থিতির বিপরীতে সঞ্চয়ের হার নানাভাবে ফিক্সড করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে তোলে দেওয়া উচিত। ব্যাংকের যে ঋণের স্থিতি থাকে তাতে দেখা যায় জনগণের ১০০ শতাংশ সঞ্চয় আমানত থাকলে তার ৮০ শতাংশ থাকে ঋণের স্থিতি। অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ সদস্যদের সঞ্চয় তার দ্বিগুণের বেশি স্থিতি থাকে ঋণী সদস্যদের হাতে। একমাত্র ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমেই সমিতির সদস্য ও এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো উভয়কে বিদেশি অনুদানমুক্ত করে আত্মনির্ভর করতে পেরেছে।
এনজিওরা সংস্কারের বাইরে থাকবে কি না, কেউ কেউ এ প্রশ্ন এখন করছে। আসলে এনজিও কখনো সংস্কারের বাইরে ছিল না, এখনো নেই, ভবিষ্যতেও রাইরেও থাকবে না।
সরকার ২০০৬ সালে ক্ষুদ্রঋণের জন্য আইন তৈরি করে এবং ২০১০ সালের বিধিমালা দ্বারা সার্বিক বিষয়ে তদারকি করছে। এনজিওদের মাঠ পরিদর্শন হচ্ছে। এমআরএ থেকে নির্দিষ্ট ছকে প্রতি মাসে এমআইএস ও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের সার্বিক তথ্যাবলি শাখাভিত্তিক এমআরএকে দিতে হচ্ছে। ক্ষুদ্রঋণের অর্থায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে সরকার পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) প্রতিষ্ঠা করেছে।
এমন এক সময় ছিল যখন এনজিওকর্মীদের কোনো সার্ভিস বিধিমালা ছিল না। কর্মীরা কাজ করতেন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে। সামান্য ভাতা ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দেওয়া হতো। এখন প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের মাসিক বেতন কাঠামো আছে, মানসম্পন্ন বিধিমালা আছে। একজন নতুন মাঠকর্মী বিনা খরচে থাকার সুযোগ পান। মাসিক ন্যূনতম ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেতন পান তাঁরা। তা ছাড়া প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য স্বাস্থ্য বিমার আওতায় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগও রয়েছে। সুতরাং এনজিও সংস্কারের মধ্য দিয়ে বিকশিত হচ্ছে নিজেদের স্ব-স্বাশিত হয়ে এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে।
অনেকে প্রশ্ন করেন পারিবারিক সম্পৃক্ততা নিয়ে। এটা সত্য। কারণ, কোনো প্রতিষ্ঠান করতে চাইলে নিজেদের আপনজন ছাড়া সহজে কাউকে পাওয়া যায় না। সাধারণ পরিষদের ন্যূনতম ১৫ থেকে ৩০ জন এবং এর থেকে আবার ৫ থেকে ৭ জনকে নিয়ে নির্বাহী পর্ষদ গঠন করতে হয়। তাই আপনজন নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দলাদলি, গ্রুপিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব প্রতিষ্ঠানগুলোকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানে অনেক অভিজ্ঞ লোক কেউ থাকে, এমনকি স্থানীয় ও ছোট ছোট এনজিওতে। এখন সময় এসেছে পেশাদারি লোকদের সমন্বয়ে কমিটিগুলোতে পুনর্গঠন করার।
সম্প্রতি একটি বিষয় লক্ষ করছি যে জাতীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতারা তাঁদের সন্তানদের নির্বাহী পরিচালকের আসনে বসিয়েছেন অর্থাৎ প্রথম জেনারেশনের তাঁদের হাতে ক্ষমতা থাকতেই সেকেন্ড জেনারেশনদের রিটায়ার্ড করে তৃতীয় জেনারেশনের অর্থাৎ তাঁদের সন্তানদের নির্বাহী পদে বসিয়েছেন। তবে নবাগত ইয়াং জেনারেশন যাঁরা নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও বয়স কম হলেও শিক্ষাদীক্ষায় খুবই উচ্চ মানের। অনেকেরই বিদেশে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁদের অভিজ্ঞতা কম হলেও, তাঁদের অযোগ্যও বলা যাবে না। অনেকেই খুবই ভালো করছেন, তাই চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ দেখি না।
প্রশ্ন হচ্ছে এনজিও আর কতদিন মালিকানাবিহীন নট ফর প্রফিট প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকবে? বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণের মডেল অনুসরণ করছে সারা বিশ্ব। বাংলাদেশকে বলা হয় ক্ষুদ্রঋণের মাতৃভূমি। ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনায় বিশ্বে ব্যক্তিমালিকানার ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনার মাইক্রো ফিন্যান্স ব্যাংকের (এমএফবি) ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে এখনো তা মালিকানাবিহীন রয়েছে। আমার মতে, মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘস্থায়ী করা সব সময়ই ঝুঁকিতে থাকে। ব্যক্তিমালিকানার সুযোগ হলে এনজিওদের গুড গভর্নেন্সের সামান্য যে ঘাটতিটুকু রয়েছে, তা পূরণ হয়ে যাবে। অনেক উদ্যোক্তাই এখানে বিনিয়োগ করতে আসবেন। বিনিয়োগের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার এখানে বিনিয়োগ হবে বা মেয়াদি ঋণ পাওয়া যাবে। তাই ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষুদ্রঋণের ব্যাংক অর্থাৎ (এমএফবি) হিসেবে নতুন নামকরণ করা হোক।
বর্তমানে শুধু নির্বাহী কমিটি দ্বারাই এমএফআইগুলো পরিচালিত হচ্ছে। ক্ষুদ্রঋণ নানামুখী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় ভবিষ্যতের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে রিস্ক ও অডিট কমিটি থাকা বাঞ্ছনীয়। বাইরের দেশগুলোর বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের অধীনে লাইসেন্স নিয়ে কাজ করে। ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের জন্য ব্যাংকের বাধ্যবাধকতা থাকে ন্যূনতম ২-৩ জন ইনডিপেনডেন্ট বোর্ড মেম্বার। বাংলাদেশের সবই কিন্তু ইনডিপেনডেন্ট বোর্ড মেম্বার, তবে প্রয়োজনে আরও প্রফেশনাল বোর্ড মেম্বার অন্তর্ভুক্তি করা যেতে পারে।
গ্রামীণ ব্যাংকের জন্য যে বিশেষ আইনটি রয়েছে একই আইনের আওতায় অর্থাৎ বিশেষায়িত ব্যাংকের আইনের আওতায় ও বড় বড় ১০টি এনজিওকে পরীক্ষামূলকভাবে মালিকানার বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। সিআইবি না থাকায় এনজিওদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে অন্ধকারে ঋণ বিতরণ করছে। একটি প্রতিষ্ঠান ঋণ দেওয়ার আগে জানতে পারে না তার অন্য প্রতিষ্ঠানের কী পরিমাণ ঋণ রয়েছে। যদিও সিআইবি কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তবে তা ব্যাপকতা পায়নি বলে ঋণের ওভারলেপিং ও সক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত ঋণ অনেক বাড়ছে, তার মানে ঋণের ঝুঁকিও বাড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায়ের হার ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে এবং প্রভিশন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ করতে হচ্ছে। দ্রুত এর সমাধান না হলে ক্ষুদ্রঋণের আমাদের যে গর্ব রয়েছে, তা বিলীন হয়ে যাবে। ভারতে তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এতে তারা খুবই সফল হয়েছে। একজন ঋণীর তথ্য জানতে চাইলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে জানা যায় এবং এর জন্য সামান্য অর্থ ব্যয় হয়।
সুদ বা সার্ভিস চার্জ নিয়ে একটি বিতর্ক সব সময় থাকে। আমার জানা মতে পৃথিবীর সবচেয়ে কম সুদে ঋণ দেয় একমাত্র বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের ঋণের সুদের হারের ঊর্ধ্বসীমা (ইনসার্ট ক্যাপ) নির্ধারিত নেই। কয়েক বছর আগে শ্রীলঙ্কা ও ভারতে বাংলাদেশের অনুসরণে সুদের হার নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
শ্রীলঙ্কার হার ছিল ৩৫ শতাংশ এবং ভারতের ছিল ২৬–২৭ শতাংশ। অভিজ্ঞতা তেমন ভালো হয়নি, তাই শ্রীলঙ্কা ও ভারতের সুদ রহিত করেছে ২ বছর আগেই। এনজিওর সার্ভিস চার্জ নির্ধারিত হয় কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে। এক, মূলধনের সুদ; দুই ব্যবস্থাপনা ব্যয়; তিন, লোন লস। যে প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বেশি ইফিশিয়েন্ট তার সুদের হার কম থাকা উচিত, আবার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা যার কম তার সার্ভিস চার্জের হার একটু বেশি এটাই স্বাভাবিক। তাই ঋণের সুদের হার ওপেন করে দেওয়া উচিত। অনেকেই ব্যাংকের সঙ্গে তুলনা করে এনজিও সুদ কম কি বেশি তা বিচার করে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অবাস্তব। দুটো মডেল একেবারে ভিন্ন। এনজিও সার্ভিসটা সদস্যদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে বাড়তি জনবল রাখতে হয়, তার জন্য ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়ে যায় আয়ের প্রায় অর্ধেক। তাই এনজিওদের সার্ভিস চার্জ ব্যাংক থেকে বেশি হবেই। এ কারণে সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত না করে মার্কেটের ওপরেই ছেড়ে দেওয়াই সমীচীন হবে।
সবশেষে বলব, ক্ষুদ্রঋণের আইন পরিবর্তনের যে চিন্তা করা হচ্ছে তার সঙ্গে ব্যক্তিমালিকানায় বা শেয়ার স্ট্রাকচার ক্ষুদ্রঋণের ব্যাংক বিষয়টি চিন্তা করা যেতে পারে, এতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ হবে। পরিশেষে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এমআরএ ভবন উদ্বোধনের সময় এনজিওদের ব্যাংকে রূপান্তর করার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: এনামুল হক, সাবেক প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা, আশা ইন্টারন্যাশনাল