কোরবানি হাটের স্মৃতি: দায়িত্ববোধ থেকে জীবনবোধ শেখার পাঁচটি দিন
সন্তানের মতো বড় করা অবোলা প্রাণীটাকে হাটে এনে যখন দুই হাত জোড় করে বুড়ো খামারি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন, ‘বাবা, একটাই গরু আমার... ও না বাঁচলে আমার পুরো পরিবারটা না খেয়ে মরবে! আমারে বাঁচান বাবা, আমারে বাঁচান!’ তখন নিছক এক ‘সরকারি ডিউটি’ করতে আসা আমাদের মতো ইন্টার্ন ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের বুকের ভেতরটাও এক পৃথিবীর সমান মায়ায় দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিল।
বইয়ের পাতা আর ক্লাসরুমের চার দেয়ালে লাইভস্টকের চিকিৎসা বা গরু-ছাগলের রোগবালাই নিয়ে পড়াশোনা তো কম করা হয়নি। কিন্তু একটা অবোলা প্রাণীর চোখের ভাষা বোঝা কিংবা তার পেছনের মানুষটার বুকফাটা আর্তনাদ কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। সেই সুযোগটা করে দিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস)। কোরবানির হাটে তাদের ফ্রি ভেটেরিনারি সেবার মেডিক্যাল টিমে যুক্ত হয়ে জীবনের এক নতুন অধ্যায় যেন চোখের সামনে খুলে গেল। ডিএলএস এবার রাজধানীর মোট ২৯টি কোরবানির হাটে বিনা মূল্যে ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম পরিচালনা করেছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের (গবি) মোট ৮৭ জন ইন্টার্ন ভেটেরিনারি চিকিৎসক এই টিমে দিন-রাত কাজ করেছেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মোট ২৯টি হাটে এই অবোলা প্রাণীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহের বাকৃবি ক্যাম্পাস থেকে যখন ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম তখনো জানতাম না, বুকের ভেতর এক অবর্ণনীয় দায়বদ্ধতা নিয়ে বাড়ি ফিরব। ২২ মে রাত থেকেই মাথায় একটা মৃদু প্রজাপতি ওড়ার মতো অনুভূতি আর চিন্তা - পরের দিন সকাল ৯টার মধ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে পৌঁছাতে হবে। ময়মনসিংহ থেকে একা একা যাওয়ার চেয়ে কাউকে সঙ্গে পেলে মন্দ হয় না। আমাদের বাকৃবির হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটা মেসেজ দিতেই সাড়া দিল মাসহারুল। ওর বাড়ি সাভারে, আর আমার বাড়ি ধামরাইয়ে—প্রতিবেশীই বলা চলে। ঠিক হলো, পরের দিন ২৩ মে ভোর ৫টায় রওনা দেব।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
কিন্তু বিধিবাম! ভোরে ফজরের আজানের আগেই শুরু হলো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ক্যাম্পাসে রিকশা খুঁজতে খুঁজতে ব্যাপক বিড়ম্বনা পোহাতে হলো। বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল সাড়ে ৫টা। অবশ্য কপাল ভালো ছিল বলে সঙ্গে সঙ্গেই বাস পেয়েছি। বাসে উঠেই দুজন মিলে দিলাম এক লম্বা ঘুম। যখন চোখ খুললাম, তখন দেখি বাস থমকে আছে টঙ্গীর বোর্ডবাজারের জ্যামে। এর মধ্যেই টিম লিডার ডা. মো. সাইফুল্লাহ মাহমুদ স্যার ফোন দিয়ে খোঁজ নিলেন। একটু পর নদী নামের এক সহকর্মীও কল দিল—‘ভাইয়া, কোথায় আপনি?’ ব্যস, অচেনা মানুষদের প্রতি একটা অদ্ভুত ভরসা তৈরি হয়ে গেল মুহূর্তেই। মহাখালী নেমে স্যারকে ফোন দিয়ে বললাম, ‘স্যার, আমি সরাসরি হাটেই চলে যাচ্ছি।’ মাসহারুল চলে গেল ফার্মগেটের দিকে, আর আমি আগারগাঁও হয়ে মেট্রোরেল ধরে সোজা গোলাপবাগ হাটে। সেখানে গিয়ে দেখি আমার বাকি টিমমেটরা আগেই পৌঁছে গেছে। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহরিয়ার সুজনের আসার কথা থাকলেও এসেছে মাহিরা।
আমার দুই সহকর্মী শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নুসরাত জাহান নদী আর গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহিরা বিনতে আলম। দুজনই যেমন কাজের, তেমনই ভীষণ নরম মনের মানুষ। আমাদের সঙ্গে ছায়ার মতো ছিলেন প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের তোফাজ্জল হোসেন ভাই আর মো. ইমরান হোসেন ভাই। তাঁদের কাজের এনার্জি দেখে আমাদেরও ক্লান্তি উবে যেত। তবে যার কথা না বললেই নয়, তিনি আমাদের টিম লিডার সাইফুল্লাহ মাহমুদ স্যার। আমরা ভেবেছিলাম, সরকারি ডিউটি—না জানি কত কড়া মেজাজের মানুষের আন্ডারে পরিশ্রম করতে হবে! কিন্তু স্যার আমাদের সঙ্গে মিশে গেলেন একদম বন্ধুর মতো। তবে একটা বিষয়ে তাঁর কড়া নির্দেশ ছিল—কোনো অবস্থাতেই অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যাবে না। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক পরিহার করে প্রতিটি ক্ষেত্রে বিকল্প, নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এর ফলে শুধু প্রাণীর স্বাস্থ্যই সুরক্ষিত হয়নি জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আমরা এই সমন্বিত পদ্ধতির মাধ্যমে পশু, মানুষ ও পরিবেশের সম্মিলিত স্বাস্থ্যের জন্য ‘ওয়ান হেলথ’ নীতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছি।
মঞ্জুরুল মিয়া আমাদের দেখেই কাঁদো কেঁদে গলায় বললেন, ‘স্যার, সেই রাত থেকে আপনাদের জন্য বসে আছি। আমার গরুটার খুব কষ্ট হচ্ছে স্যার, একটু এসে দেখেন।’ এইটুকু বলেই ময়লা গামছাটা দিয়ে চোখের জল মুছলেন।
আমাদের প্রথম দিনটা হাটের অলিগলি ঘুরে, খামারিদের সঙ্গে কথা বলে আর প্রাথমিক কিছু ওষুধপত্র দিয়েই কেটে গেল। কিন্তু একজন চিকিৎসকের আসল আনন্দ যে কোথায়, তা বুঝলাম দ্বিতীয় দিন। আগের দিন যে খামারিদের গরুকে আমরা দেখেছিলাম তাঁরা যখন আমাদের স্টলে এসে চওড়া হাসিতে বললেন, ‘বাবা, আপনাদের দেওয়া ওষুধে আমার গরু তো চাঙা! আমরা তো ভাবতাম ইনজেকশন ছাড়া গরুর জুত হয় না। এত তাড়াতাড়ি যে ব্যথা-অরুচি কমে যাবে, ভাবি নাই।’ বুকটা এক অদ্ভুত গরবে ভরে উঠেছিল তখন।
ক্যাম্পাসে যখন আমরা ইন্টার্নি করি তখন অ্যানিমেলকে জাস্ট একটা ‘কেস’ বা রোগী হিসেবে ট্রিট করি। কিন্তু এই হাটে এসে বুঝলাম এই একটা গরুর ভালো-মন্দের সঙ্গে একটা আস্ত পরিবারের ভাগ্য জড়িয়ে আছেনুসরাত জাহান নদী, শিক্ষার্থী
আসলে হাটে আসা বেশির ভাগ খামারিই বড় কোনো ব্যবসায়ী বা ব্যাপারী নন। তাঁরা প্রান্তিক চাষি। সারা বছর নিজের পেটে খিদে রেখে এই একটা গরুকে সন্তানের মতো খাইয়ে-দাইয়ে বড় করেছেন। কোরবানির হাটে এটা বিক্রি করে টাকা পাবেন, সেই টাকা দিয়ে পরিবার নিয়ে একটু ভালোমন্দ খাবেন, ঈদের আনন্দ করবেন—এই তো স্বপ্ন! আমাদের একটা ছোট গাফিলতিতে যদি সেই স্বপ্নটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়? এই ভয়টাই আমাদের তাড়া করে ফিরত প্রতিটা মুহূর্ত।
লেখাটা বড় হয়ে যাচ্ছে তারপরও দুজন গৃহস্থের কথা বলি। সবার কথা তো আর বলা যাবে না। পত্রিকার পাতাতেও এত লেখা আটবে না। চুয়াডাঙ্গা থেকে আতিকুর মিয়া এসেছিলেন তাঁর বেয়াইকে সঙ্গে নিয়ে। সম্বল বলতে ওই একটাই নিজের হাতে পালা গরু। অত দূর থেকে ট্রাকে করে আসার ধকলে গরুটার পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা, সঙ্গে পেটের ভেতর বদহজম হয়ে গেছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছিল না গরুটা। আতিকুর মিয়া আমাদের স্টলে এসে প্রায় কেঁদেই দিলেন, ‘স্যার, আমার গরুডা তো দাঁড়াইতে পারতেছে না, কিচ্ছু মুখেও তুলছে না।’ আমরা ওষুধপত্র বুঝিয়ে দিলাম। কিন্তু তাঁর মন মানল না। দুই হাত জোড় করে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, ‘স্যার, আপনারা একটু আমার সঙ্গে চলেন। আমরা গরুটার পাশে গিয়ে দাঁড়াইলে আমার ভালো লাগবে নে, মনটারে তা–ও একটু বুঝ দিতে পারবা নে। একটাই গরু আমার স্যার। ওর জন্য আমার মনটায় একটুও শান্তি পাচ্ছি নে। ও নিজেও খাচ্ছে নে, আমিও খাতি পাচ্ছি নে।’ এক মধ্যবয়সী কৃষকের সেই আকুতিভরা চোখের দিকে তাকিয়ে আমরা আর স্থির থাকতে পারলাম না। সাইফুল্লাহ স্যার তখনই আমাদের তিনজনের একটা টিম পাঠিয়ে দিলেন তাঁর সঙ্গে।
ঈদের আগের দিনগুলোর দিকে ঘরমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকে রাস্তায়। ২৬ মে ২০২৬ তারিখ জ্যাম ঠেলে হাটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমাদের সকাল সাড়ে ৯টা বেজে গেল। আমরা স্টলে পা দেওয়া মাত্রই কুষ্টিয়ার খামারি মঞ্জুরুল মিয়া হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। তাঁরও সেই এক অবস্থা—সম্বল বলতে একটিই গরু, আর তার পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা, খাবারে একদম অরুচি।
মঞ্জুরুল মিয়া আমাদের দেখেই কাঁদো কেঁদে গলায় বললেন, ‘স্যার, সেই রাত থেকে আপনাদের জন্য বসে আছি। আমার গরুটার খুব কষ্ট হচ্ছে স্যার, একটু এসে দেখেন।’ এইটুকু বলেই ময়লা গামছাটা দিয়ে চোখের জল মুছলেন। যে মানুষটা নিজের সন্তানের মতো যত্ন করে অবোলা প্রাণীটাকে বড় করেছেন, বিদায়বেলায় তার কষ্ট সইতে পারছিলেন না তিনি। এই বিদায়ের সময়েও চাচ্ছিলেন তার আদরের টুকরাটা যাতে ভালো চিকিৎসা পায় আর যাতে গরুটার কষ্ট না হয়। তাঁকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, পুরো পরিবারের একমাত্র সম্বলটাকে বিক্রি করে, কোরবানির আসল ত্যাগ বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে এসেছেন তিনি।
এই পুরো জার্নিটা নিয়ে নুসরাত জাহান নদী বলছিল, ‘ক্যাম্পাসে যখন আমরা ইন্টার্নি করি তখন অ্যানিমেলকে জাস্ট একটা ‘কেস’ বা রোগী হিসেবে ট্রিট করি। কিন্তু এই হাটে এসে বুঝলাম এই একটা গরুর ভালো-মন্দের সঙ্গে একটা আস্ত পরিবারের ভাগ্য জড়িয়ে আছে। যখন একজন খামারি তাঁর সুস্থ গরুর দিকে তাকিয়ে আমাদের মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করেন, তখন মনে হয় ভেটেরিনারি পড়াটা সার্থক।’
মাহিরা বিনতে আলমও আবেগ ধরে রাখতে পারল না, ‘ঈদের ঠিক আগে যখন সবাই বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত তখন আমরা হাটের কাদা, গোবর আর গন্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে ডিউটি করছি—শুরুতে একটু খারাপ লাগছিল। কিন্তু যখন একজন বৃদ্ধ খামারি এসে বলেন, ‘মাগো, তোমার ওষুধে আমার গরুটা সুস্থ হইছে, দোয়া করি বড় ডাক্তার হও’- তখন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। মানুষের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও চোখের পানির মূল্য কোটি টাকা দিয়েও কেনা সম্ভব নয়।’
পশুর হাটের এই দিনগুলো আমাদের শুধু ভালো চিকিৎসক হওয়া শেখায়নি, আরও ভালো মানুষ হতে শিখিয়েছে। এই সরকারি সেবা তো আসলে জনগণেরই করের টাকায় চলে তাই জনগণের দুয়ারে সেই সেবা পৌঁছে দিতে পেরে এক পরম তৃপ্তি পেয়েছি। ২৯টি মেডিকেল টিমের প্রতিটি সদস্য নিজের পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে, কাদা-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত হাটে পড়েছিলেন। দিনশেষে বাড়ি ফেরার পথে যখন চারপাশটা ফাঁকা হয়ে আসছিল, তখন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল খামারিদের সেই অশ্রুসজল চোখ আর পরম তৃপ্তির হাসি। নিজের পরিবারকে ছেড়ে এসে কাদা-গোবরের হাটে কাটিয়ে দেওয়া এই ঈদটাই যেন আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে সার্থক ঈদ হয়ে রইল।
* লেখক: মো. আশিকুজ্জামান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ