বাদল দিনের স্মৃতিবিজড়িত শৈশব

ঝুম বৃষ্টি
ছবি: জাহিদুল করিম

বসন্তকে ঋতুরাজ বলা হলেও রূপ ও সৌন্দর্যের দিক দিয়ে বর্ষাকালই মনে হয় শ্রেষ্ঠ। প্রখর রৌদ্রময় খরতাপের দিনগুলোতে মানুষ যখন অসহ্য গরমে ছটফট করতে থাকে, তখন বর্ষা আসে প্রবল গর্জনের মধ্য দিয়ে। প্রকৃতি যেন নিজের বুক জুড়ানোর জন্য বর্ষাকে আহ্বান করে। বাংলার আকাশ ও বাতাস এক নতুন খেলায় মেতে ওঠে। মানুষের মনে আসে আনন্দের জোয়ার। শুধু বর্ষার কারণেই এ দেশ সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা নামের অধিকারী হতে পেরেছে। শ্রাবণবেলার এ অঝোর ধারা মনে সেতার বাজিয়ে নিয়ে যায় সুদূর অতীতে।

শৈশবে বর্ষাকাল ছিল অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা। বর্ষা এলে মন ছুটে যায় শৈশবের অর্ধেক সময় বেড়ে ওঠা বাহাদুরপাড়া গ্রামে। মন ছুটে যায় বৃষ্টির দিনে সেই চারপাশে কবরস্থান, মাঝখানের পুকুরটিতে। যেখানে বন্ধুরা দল বেঁধে বৃষ্টির দিনে কাকভেজা শরীর নিয়ে আবারও পুকুরে গোসল করতাম। বিভিন্ন রকমের খেলা খেলতাম পুকুরের পানিতে। বর্ষা এলেই মনে পড়ে যায় আমার সেই প্রাইমারি স্কুল, ১৬১ নম্বর বাহাদুরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা। যখন বৃষ্টি হতো, সহপাঠীরা জোরে জোরে গান করতাম, লুকোচুরি খেলতাম এবং ভিজে ভিজে মাঠে দৌড়ঝাঁপ করতাম। স্কুলের পাশেই ছিল নদী, যেখানে স্কুল ফাঁকি দিয়ে গোসল করতাম সহপাঠীরা মিলে।

বর্ষাকাল মানেই ফলের আমেজ—আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, আরও বাহারি রকমের ফল। যখন বাতাস বয় এবং সঙ্গে বৃষ্টি আসে, বন্ধুরা দল বেঁধে আম কুড়াতে যেতাম। কখনো বাগানমালিকের দৌড়ানিও খেতে হতো। তবু বন্ধুরা মিলে আম কুড়িয়ে আনতাম। মানুষের গাছের কাঁঠাল থেকে শুরু করে লিচু চুরি করেছি। গ্রামের মেঠো পথ ধরে বৃষ্টিতে ভিজে বন্ধুরা মিলে টায়ার চালাতাম। সুপারির পাতা দিয়েও খেলতাম। একজন পাতার ওপর বসত অন্যজন টেনে টেনে নিয়ে যেত। এখনো মন ফিরে যেতে চায় হারানো সেই বৃষ্টিস্নাত শৈশবে। আহা! তখনকার বৃষ্টির দিনগুলো ছিল শ্রুতিমধুর, যা চাইলেও আর ফিরে পাব না।

ছোটবেলায় দেখতাম, আমাদের গ্রামের কৃষকেরা মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেও কাকভেজা হয়ে খেতের মধ্যে ধান রোপণ করতেন। সেই সব মুহূর্ত ছিল সত্যি অতুলনীয়। সেই ছোটবেলার হারানো বন্ধুবান্ধব, হারানো সেই শৈশব বুঝি আর কখনো ফিরে পাব না। এখন সবাই জীবনের তাগিদে বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। প্রকৃতিও যেন তার নিজ মহিমায় নিজেকে সাজিয়ে তুলেছে। যেন আগের মতো সঠিক সময়ে বৃষ্টি হয় না। কৃষকদেরও বৃষ্টিতে ভিজে ধান রোপণ করতে দেখা যায় না। গ্রামে শৈশবের অর্ধেক সময় বৃষ্টি, কাদামাটিতে কাটিয়েছি, কোনো জ্বর-সর্দি-কাশি কিছুই হতো না। বর্তমানে বৃষ্টিতে একটু ভিজলেই নানা রকম রোগ বাসা বাঁধে শরীরে।

শৈশবে সময় নানিবাড়ি যেতাম বেড়াতে সালের হাট গ্রামে বর্ষাকালে, তখন সময়টাও ছিল স্মৃতিমধুর। আমার গ্রাম থেকে নানিবাড়ি ছিল ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে। তখন নানিবাড়ি ছিল মাটি দিয়ে তৈরি, ওপরে টিনের চালা। তখন সেই গ্রামে বিদ্যুৎও ছিল না। হারিকেন বা কুপি দিয়ে তাদের দিব্যি চলত। নানিবাড়িতে যখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ত, টিনের চালের ঝুম ঝুম শব্দে সকালে ঘুম ভেঙে যেত। সকালে উঠে হাত-মুখে পানি দিয়ে নাশতা করতাম পান্তা, সঙ্গে থাকত শুকনা মরিচ, কাঁচা পেঁয়াজ এবং গ্রামের শর্ষের খাঁটি তেল। কখনো শুকনা মরিচ পুড়িয়ে পান্তাভাতের সঙ্গে মিশিয়ে মাটির ঘরের বারান্দায় বসে সবাই একসঙ্গে বসে খেতাম আর সকালের মুষলধারার বৃষ্টিকে উপভোগ করতাম। খাওয়াদাওয়া শেষে মামাদের সঙ্গে চলে যেতাম বৃষ্টিতে ভিজে মাছ ধরতে।

সালের হাট গ্রামে, অর্থাৎ আমার নানির বাড়িতে চাষাবাদকৃত জমিতে সেই সময়ে বর্ষাকালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। মামারা আল কেটে বাঁশের ভোলং পেতে দিতেন। এমন আরও বেশ কিছু ভোলং পেতে দিতেন, যেখানে প্রচুর মাছ আটকাত। মাছ ধরতে ধরতে আমাদের বেলা গড়িয়ে যেত। মাছ ধরা শেষে আবার নানিবাড়িতে মামাসহ ফিরে আসতাম এবং বাঁশের ভোলংগুলো থেকে মাছ বের করতাম। সেখানে মাছ আটকা পড়ত মাগুর, টাকি, পুঁটি, শিং, কই, আরও বাহারি রকমের মাছ। সেই মাছগুলো নানি কেটে  ভালোভাবে ধুয়ে ঝোল করে রান্না করতেন। আহ! কী অসাধারণ ছিল নানিবাড়িতে বর্ষাকাল। নানির রান্না খুব ভালো ছিল। সন্ধ্যায় সবাই পেট ভরে নানির হাতের রান্না মজার মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে নিতাম।

এখনো সেই সব স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই, ফিরে যেতে চাই বৃষ্টিস্নাত শৈশবে। সময়ের সঙ্গে লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তার মধ্যে বেঁচে নেই নানা-নানি। শৈশবের বৃষ্টিস্নাত দিনগুলোর মতো এখন আর যাওয়া হয় না নানিবাড়িতে। সঙ্গে মামাদের সঙ্গে মাছ ধরা খুব মিস করি।

স্মৃতির পাতায় রয়ে গেল আমার প্রিয় জন্মভূমি বাহাদুরপাড়া গ্রাম এবং আমার বাল্য বন্ধুবান্ধব, যাদের সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্ত খেলাধুলা করতাম। বর্ষাকালে গ্রামের পুকুরে গোসল করা, মাঠে বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলা। আর চাইলেও ফিরে যেতে পারব না স্মৃতির পাতায় রেখে আসা বৃষ্টিস্নাত শৈশবে।

লেখক: মো. আজাদ হোসেন, শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা