ঠিকানা বদলালেই কি বদলায় শিক্ষার সুযোগ?
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
শিক্ষার আলো সবার জন্য সমান হওয়ার কথা, অথচ সেই আলোতেও আজ বৈষম্যের ছায়া দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু আজ সেই শিক্ষাকে কেন্দ্র করেই তৈরি হচ্ছে বৈষম্য। এটি সত্যিই দুঃখজনক ও অবাক করার মতো বিষয়।
আমরা একই দেশে বসবাস করি, অথচ স্থানভেদে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধায় রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। হ্যাঁ, আমি শহর ও গ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্যের কথাই বলছি।
শহরের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সুযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, অলিম্পিয়াড, সেমিনারসহ নানা আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তাদের সামনে রয়েছে। এসব কার্যক্রম একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী এসব সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
পড়াশোনার ক্ষেত্রেও এই বৈষম্য স্পষ্ট। এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীরা খুব বেশি সময় পায় না। শহরের অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস, ভালো শিক্ষকের দিকনির্দেশনা এবং বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতির সুযোগ পায়। অনেক ক্ষেত্রে টেস্ট পরীক্ষার আগেই তাদের পাঠ্যসূচি শেষ করে দেওয়া হয় এবং পরীক্ষার জন্য আলাদা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকে।
অন্যদিকে, গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী একই পরীক্ষায় অংশ নিলেও তারা সমান সুযোগ পায় না। কোথাও শিক্ষক–সংকট, কোথাও পর্যাপ্ত ক্লাসের অভাব, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ তাদের স্বপ্ন, মেধা ও পরিশ্রম শহরের শিক্ষার্থীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
নটর ডেম কলেজের মতো স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যে মানসম্মত শিক্ষা, পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, প্রত্যন্ত গ্রামের একজন শিক্ষার্থী অনেক ক্ষেত্রেই সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। আবার সরকারি কলেজের শিক্ষকেরা বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ ও মান এক নয়। ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানেও পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
এই পার্থক্যের প্রভাব শুধু বর্তমানেই সীমাবদ্ধ নয় এর প্রভাব আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনেও পড়তে পারে। একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই শিক্ষার্থীর প্রস্তুতির সুযোগ যদি এক না হয়, তাহলে তাদের কাছ থেকে একই ফলাফল আশা করাও কতটা যুক্তিসংগত?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। গ্রামের অনেক পরিবার দিনমজুরি, কৃষিকাজ বা ছোটখাটো আয়ের ওপর নির্ভরশীল। যাঁদের নিজেদের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়, তাঁদের পক্ষে সন্তানকে শহরে রেখে পড়ানো অনেক সময় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। উচ্চশিক্ষা কিংবা শহরের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা তখন তাঁদের কাছে প্রয়োজনের চেয়ে বিলাসিতার মতো মনে হতে পারে।
অথচ সেই পরিবারের সন্তানটিরও হয়তো বড় স্বপ্ন আছে। তারও হয়তো ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিচারক, শিক্ষক কিংবা অন্য কোনো পেশায় যাওয়ার স্বপ্ন আছে। কিন্তু শুধু অর্থ ও সুযোগের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থেমে যাওয়া উচিত নয়।
তাই মাননীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন—শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। শিক্ষার মান ও সুযোগের বৈষম্য দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক। প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ তার জন্মস্থান বা পরিবারের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে না।
শহর হোক কিংবা প্রত্যন্ত গ্রাম—প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন তার মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নেওয়ার সমান সুযোগ পায়।
কারণ, মেধার কোনো শহর-গ্রাম নেই, স্বপ্নেরও কোনো ঠিকানা নেই। সুযোগটাই শুধু সবার সমান হওয়া প্রয়োজন।
* লেখক: তানহা আক্তার, শিক্ষার্থী, সরকার বরিশাল কলেজ, বরিশাল