ঈদকেন্দ্রিক বিয়ের সংস্কৃতি

বিবাহপ্রতীকী ছবি

ঈদের পরদিন নিজ জেলা সিরাজগঞ্জ থেকে খুলনা ফিরছিলাম। পথে বেশ কিছু সাজসজ্জাপূর্ণ বিয়ের গাড়ি চোখে পড়ল। পাশে বসা চালক তো বলেই বসল, এখন বিয়ের মৌসুম চলছে। এখন তো ঈদ মানেই বিয়ে! বিষয়টি ভাবার তো! বিয়ের আবার মৌসুম আছে নাকি?

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদকে কেন্দ্র করে নানা আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম সংগঠিত হয়। এ উৎসব উপলক্ষে পরিবারের সদস্যদের একত্র হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেক পরিবার বিয়েশাদি বা অন্যান্য পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এতে ঈদের উৎসব পর্বটি আরও প্রলম্বিত হয়। ইদানীং ঈদ–পরবর্তী সময়ে বিয়ে, জন্মবার্ষিকী, বিবাহবার্ষিকী, আকিকা, ঈদ পুনর্মিলনী, ঈদ আনন্দমেলা ইত্যাদি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এসব অনুষ্ঠান পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে, যা বর্তমান অস্থির বিশ্বে খুব প্রয়োজন।

আসলে মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের একটি হচ্ছে বিয়ে। বাঙালি জীবনে বিয়ে এমন একটি উৎসব। দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নারীদের বিয়ের বয়স ১৮ এবং পুরুষদের ২১ বছর। আইন বলছে, এই বয়সের আগে কোনো বিয়ে নয়। তবে বাস্তবতা হলো, পড়ালেখা শেষ করে ব্যক্তির নিজের একটি মানানসই পরিচয় তৈরি করতে প্রয়োজন হয় আরও কিছু সময়। এই বিয়ের সঙ্গে ব্যক্তির মানসিক ও আর্থিক বিষয়গুলোও প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত। সাধারণত ২৫ বছর বয়সের মধ্যে ব্যক্তি হিসেবে সমাজে নিজের আলাদা একটি অবস্থান তৈরি হয়। জীবনের উদ্দেশ্যও নিজের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। এ সময়ের মধ্যে জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসা হয় অনেকেরই কিংবা অন্যের জীবনের মধ্য দিয়ে জানা হয়ে যায় বাস্তবতা। তাই সমাজ–গবেষকেরা মনে করেন, বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর হওয়া উচিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের উচাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উলফিঙ্গার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিয়ের জন্য আদর্শ বয়স ২৮ থেকে ৩২ বছর। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এই বয়সের মধ্যে বিয়ে হলে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কম থাকে। প্রকৃতপক্ষে স্থান–কাল–পাত্রভেদে বিয়ের বয়সের তারতম্য পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, বর্তমান দেশের পুরুষদের বিয়ের গড় বয়স ২৫ দশমিক ৪ বছর এবং নারীদের ১৮ দশমিক ৮ বছর। হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশ জনসংখ্যাই বিবাহিত। এর মধ্যে ৬২ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ এবং ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। আর অবিবাহিত জনসংখ্যা ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

দেশে সারা বছর বিয়েসহ নানা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও শীতকালকে বলা হয় বিয়ের মৌসুম। কারণ, বছরে যত বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়, তার একটি বড় অংশই শীতকালে সম্পন্ন হয়। পুরো শীতকালে সারা দেশে বিয়েশাদির যেন ধুম লেগে থাকে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও শীতকালে বিয়ের আধিক্য চোখে পড়ে। এক হিসাবে ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ভারতে বিয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। ২০২৩ সালে বিয়ে শুরু হয় ২৩ নভেম্বর, যা চলে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে ভারতীয় মুসলমানরা সাধারণত মহররম মাসে বিয়ের আয়োজন করা থেকে বিরত থাকেন। কারণ, এটি শোকের মাস। অন্যদিকে পাকিস্তানে বিয়ের মৌসুমকে বলা হয় ডিসেম্বরকে। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানে বেশির ভাগ বিয়ের আয়োজন করা হলেও ডিসেম্বর মাসেই সর্বাধিক বিয়ের আয়োজন করা হয়। বিয়ের ক্যালেন্ডার অনুসারে, মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর এবং মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি ছাড়া নেপালে বারো মাসই বিয়ের আয়োজন করার রীতি প্রচলিত। এদিকে শ্রীলঙ্কা একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপ। বৃষ্টির আবহাওয়া সারা বছরই অনুভূত হয়। তবে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মধ্যে এবং জুন থেকে আগস্ট সময়ে রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে বেশির ভাগ বিয়ে এ সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। আবার যুক্তরাষ্ট্রে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আবহাওয়া ও ঋতু পরিস্থিতি সবচেয়ে সুন্দর ও আরামদায়ক মেজাজ তৈরি করতে সহায়তা করে। তাই সেখানে এ সময়ে বেশির ভাগ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

আসলে শীতের সঙ্গে বাঙালির উৎসবের একটা যোগসূত্র রয়েছে। শীতকালে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে দেশে সব সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, আন্দোলন, সংগ্রাম, মিছিল, মিটিং বেশি হয়ে থাকে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে বেশির ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আগেকার দিনে কৃষিখামারে শ্রম দেওয়ার জন্য অধিক জনবল প্রয়োজন হতো। ফলে সে সময়ে অল্প বয়সে বিয়ের প্রচলন ছিল এবং পরিবারপ্রতি গড় সদস্যসংখ্যা আজকের তুলনায় অধিক ছিল। গ্রামীণ বাংলাদেশে ফসল ঘরে তোলার পর বিশেষ করে অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে বেশি বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। কারণ, এ সময়ে ধান কাটা হয় এবং মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা আসে। আবার আমন ধান ও পাট কাটার পর (আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে) কিছুদিন অবসর সময় পাওয়া সম্ভব হয়। মূলত গ্রামীণ এ দেশে কৃষকের হাতে অর্থ যোগ হলে নানা আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। গ্রামাঞ্চলে এখনো নতুন বউ বা জামাইকে ঘরের নতুন ধানের চাল দিয়ে রান্না করা বিভিন্ন পদের খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। এ ছাড়া শীতকাল বছরের শেষে আসে। সে কারণে এ সময় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সমস্ত প্রতিষ্ঠানেই বার্ষিক ছুটি চলে। ফলে আত্মীয়স্বজন যে যেখানে আছেন, সবাই একসঙ্গে মিলিত হওয়ার অধিক সুযোগ থাকে। ফলে বিয়ের মতো একটা বড় আয়োজনের জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়।

বিয়ের আয়োজনে কনেকে সবচেয়ে সুন্দর দেখানো চাই। তাই সব মেয়েই বউ সাজার জন্য পছন্দ করেন শীতকাল। কারণ, গরমকাল হলে অধিক তাপমাত্রার কারণে ঘামে বউয়ের সাজগোজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। শীতকালে সেই ভয় নেই। ইচ্ছেমতো বউ সাজানোর স্বাধীনতা পাওয়া যায়।

বিয়ে হবে আর ফুল থাকবে না, তা হয় নাকি? আর শীতকাল হলো ফুলের মৌসুম এবং ফুলও বেশিক্ষণ তাজা থাকে। এ ছাড়া শীতকালে ফ্যান বা এসির ঝামেলা নেই। অল্প সময়ে স্বল্প আয়োজনে বিয়ের উৎসবের ব্যবস্থা করে ফেলা যায়। আবার শীতকালে নানা ধরনের বাহারি পিঠা তৈরি করা হয়। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিয়ে উপলক্ষে নানা ধরনের পিঠার আয়োজন করা হয়, যা অন্য কোনো সময়ে দেখা যায় না। এ ছাড়া শীতের সময়টা ঘোরাঘুরির জন্য এক্কেবারে সঠিক। বিয়ের পরে নবদম্পতির একসঙ্গে ছুটি কাটানোর অর্থাৎ হানিমুনের জন্য সবচেয়ে ভালো মৌসুম এটি।

তবে ইদানীং বিয়ের মৌসুম পাল্টে যাচ্ছে। বর্তমানে ঈদ উৎসবের পাশাপাশি সারা দেশে ছুটিতে আরেক উৎসব হলো বিয়ে। ঈদেও ছুটিতে শহর কিংবা গ্রাম সবখানেই বাজে বিয়ের সানাই। সম্প্রীতির বন্ধনে এ যেন ঈদকেন্দ্রিক বিয়ে–সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। দিন দিন মানুষের কর্মব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় ঈদের ছুটিতে তাই বিয়ের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। কারণ, বছরের এ সময়ে সবাই ছুটির আনন্দে থাকে। তাই বিভিন্ন উৎসব ও আয়োজনে পরিবার, বন্ধুবান্ধবসহ সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া যায়। ফলে দেশে ঈদের ছুটিতে অধিক বিয়ের আয়োজন করা হয়। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষ নানা ধরনের পেশা ও কর্মের সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। এসব কর্মের প্রয়োজনে বাড়ি থেকে অনেক দূরে গিয়ে অবস্থান করতে বাধ্য হয় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বসবাসকারী জনগোষ্ঠী বড় বড় শহরে আবাস গড়ে তোলে। তাই ঈদের তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ ছুটিতে তাদের অধিকাংশই চায় পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে। এ সময়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা পরিবারের সব সদস্য বাড়িতে ফিরে আসে। ফলে এ ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। ঈদের সময় আত্মীয়স্বজনসহ সবার উপস্থিতিতে সামাজিক সম্প্রীতি যেমন বাড়ছে, তেমনি ঈদের উৎসবও বর্ণিল হচ্ছে।

ঈদ মানুষে–মানুষে আত্মিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। দিন যত যাচ্ছে, ঈদকে কেন্দ্র করে এ দেশের মানুষের মধ্যে উৎসবমুখিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি একটি উপলক্ষ হিসেবে কাজ করছে, যাকে কেন্দ্র করে আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে অনেক নতুনত্ব যোগ হচ্ছে। এখন সরকারি ছুটিকে ছেলেমেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য বেছে নেওয়া হয়। তাই ঈদ উৎসবের আগে বা পরে বিয়েসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানাও আয়োজন করা হয়ে থাকে। এসব উৎসবে দৃঢ় হয় পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন, বৃদ্ধি পায় সামাজিক সংহতি।

লেখক: সমাজ–গবেষক ও শিক্ষক, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

‘নাগরিক সংবাদ’-এ নানা সমস্যা, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]