বইমেলায় কে হবেন পরবর্তী জাদুকর

বইমেলাফাইল ছবি: প্রথম আলো

ভাষার মাসে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলছে অমর একুশে বইমেলা। প্রতিদিন মেলায় আসছেন অসংখ্য পাঠক-দর্শক। মেলায় লেখক ও পাঠকের এই মিলনমেলা বইমেলার সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি করে। পাঠকেরা অপেক্ষায় থাকেন তাঁদের প্রিয় লেখক কোন দিন মেলায় আসবেন। লেখকের দেখা পাওয়া অনেকের কাছেই পরম প্রাপ্তি। কোনো কোনো লেখকের অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য লম্বা লাইন দিতেও দেখা যায়। সম্প্রতি মৌলিক লেখকদের পাশাপাশি বইমেলাকেন্দ্রিক বই আনছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও। মেলায় তাঁদের উপস্থিতিও লক্ষণীয়। মূলধারার লেখক না হওয়ায় মেলাভিত্তিক বইয়ের চেয়েও তাঁদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দর্শকদের বেশি কাছে টানছে। আবার অনেক জনপ্রিয় তারকা একটিমাত্র বই লেখছেন বিধায় পরের বইমেলায় তাঁকে বইসমেত পাওয়া যাচ্ছে না।

বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতা লক্ষ করলে বোঝা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত, কিন্তু লেখক হিসেবে যথেষ্ট শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে না পারায় লেখালেখিতে টিকে থাকতে পারেননি অনেকেই। তবে কেউ কেউ আছেন যাঁরা অন্য প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি লেখক হিসেবেও বেশ সফল। তবে এ সংখ্যা নেহাত অল্প।

বাংলাদেশে যাঁরা শুধু লেখক হিসেবে জনপ্রিয়, বোধ করি তাঁদের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন। জনপ্রিয়তায় তাঁর প্রতিযোগী হিসেবে কেউ নিজেকে কল্পনা করবে অন্তত এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া ভার। তাঁর লেখা কয়েকটি প্রজন্মকে এমনই মাতাল করে তুলেছিল, যা এখনো চলমান। ভক্তরা মেলায় তাঁর উপস্থিতির জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন। অনেক লম্বা লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতেন। সমালোচক ব্যতীত অন্যরা বলতেন, বইমেলায় জাদুকর এসেছেন। কলমের খোঁচায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভক্তদের তিনি ছোট ছোট জাদু দেখাতেন, বড় জাদু রাখতেন দুই মলাটে বন্দী করে বইয়ে ভেতর।

হুমায়ূন আহমেদের চলে যাওয়ার প্রায় এক যুগ পার হতে চললেও বইমেলায় নতুন কেউ কি জাদুকর হয়ে উঠছেন? প্রশ্নটা পাঠকদের কাছে। লেখালেখির বাইরে অন্যান্য ক্ষেত্রে জনপ্রিয়, এমন লেখকদের সামনে ভক্তরা ভিড় করলেও ধারাবাহিকভাবে তাঁদের মেলায় পাওয়া যায় না। বর্তমানে সাহিত্যাঙ্গনে লেখক হিসেবে অনেকের পরিচিতি রয়েছে। তবে লেখকের উপস্থিতি পাঠকদের আলাদাভাবে আকৃষ্ট করে, এমন লেখকের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও কোনো কোনো লেখক পাঠকদের কাছে আগ্রহের ব্যক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

কয়েক বছর যাবৎ ধারাবাহিকভাবে মেলায় যে লেখকদের জন্য পাঠকেরা অপেক্ষা করেন কিংবা যাঁদের সামনে অটোগ্রাফের জন্য অপেক্ষা করেন, তাঁদের মধ্যে অনেক নবীন-প্রবীণ লেখকও রয়েছেন। অনেক জনপ্রিয় লেখকের বই মেলায় এলেও তাঁরা মেলায় কম আসেন, ফলে পাঠকেরা তাঁদের প্রত্যক্ষ করা কিংবা তাঁদের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নেওয়া থেকে বঞ্চিত হন। এ ছাড়া অনেক সিনিয়র লেখক রয়েছেন, যাঁদের প্রদত্ত অটোগ্রাফ কিংবা পাঠকের লম্বা লাইন দিয়ে বিবেচনা করা উচিত হবে না।

প্রায় প্রতিদিন অনেক কবি, সাহিত্যিক ও লেখক মেলায় আসেন, কেউ কেউ মেলায় ঘুরেন, কেউ আড্ডা দেন পাঠক, লেখক ও বন্ধুদের সঙ্গে আবার অনেকের সামনে অটোগ্রাফ নিতে পাঠকদের লম্বা লাইন দেখা যায়। তবুও মেলায় হাঁটতে হাঁটতে পাঠকদের মধ্য থেকে কেউ বলে ওঠেন, যদি হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকতেন! তাঁর উপস্থিতি পাঠককে জানান দিতে কোনো কোনো প্রকাশক নকল হুমায়ূন আহমেদকে হাজিরও করেন। কিন্তু ভক্তদের তাতে প্রাণ ভরে না, মনের গহিনে হু হু করে ওঠে অজানা হাহাকার। এক যুগ ধরে কত বই আসছে, কত নতুন-পুরোনো লেখক আসছেন, একজন জাদুকর হয়ে কি কেউ আসবেন আগামী মেলায়?

*লেখক: এম এম উজ্জ্বল