বিজ্ঞান চেনায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ড!

দীর্ঘ ৯ মাস পর পৃথিবীতে ফিরেছেন মার্কিন নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামসছবি: এএফপি

মানুষের জ্ঞানের পরিধি যতই বাড়ছে, ততই প্রসারিত হচ্ছে মহাকাশ অভিযানের দিগন্ত। আমাদের কাছে নভোচারীরা শুধু বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রী নন, বরং তাঁরা মানবজাতির দূরদর্শিতা, অধ্যবসায় ও সীমাহীন জ্ঞানের প্রতীক। নাসার অ্যাস্ট্রোনট কোরের সদস্য হওয়া নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ যোগ্যতার স্বীকৃতি। মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখার সৌভাগ্য সবার হয় না; এর জন্য প্রয়োজন প্রগাঢ় সাধনা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য ও অসীম ত্যাগের মানসিকতা।

বাংলাদেশ সময় গত মঙ্গলবার দিবাগত রাত ৩টা ৫৭ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপকূল থেকে ৫০ মাইল দূরে সমুদ্রে অবতরণ করেছে নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোরকে বহনকারী ক্যাপসুল। স্পেসএক্সের মহাকাশযান তাঁদের নিয়ে ফ্লোরিডার সমুদ্রে সফলভাবে অবতরণ করে। এরপর হাসিমুখে ক্যাপসুল থেকে বেরিয়ে আসেন তাঁরা, যা বিশ্বজুড়ে মানুষকে উচ্ছ্বসিত করেছে। সুনিতা ও বুচ মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার নভোচারী। এই দুজন গত বছরের জুন থেকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) ছিলেন। নাসা এই নভোচারীদের ফিরে আসার গোটা পর্বের লাইভ টেলিকাস্ট করেছে, হাঁ করে দেখেছে বিশ্ববাসী। কেউ হেসেছে আনন্দে, কেউ কেঁদেছে আবেগে।

দ্য ওয়াল জানাচ্ছে, ঐতিহাসিক এই মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২৩ বছর আগের এক করুণ অধ্যায়। ২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, নাসার কলাম্বিয়া মহাকাশযান দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে সাতজন অভিজ্ঞ মহাকাশচারী প্রাণ হারান, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নভোচারী কল্পনা চাওলা। ১৯৬১ সালে ভারতের হরিয়ানায় জন্ম নেওয়া কল্পনার জন্য মহাকাশযাত্রা ছিল এক অকল্পনীয় স্বপ্ন। নারীবিদ্বেষী সমাজব্যবস্থাকে অতিক্রম করে তিনি নাসার প্রথম ভারতীয় নারী নভোচারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর অবদান মহাকাশবিজ্ঞান ও নারীর অগ্রগতির অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে।

কলাম্বিয়া ট্র্যাজেডির পর মহাকাশ অভিযানের নিরাপত্তা আরও কঠোর হয়। কিন্তু তবু ঝুঁকি থেকেই যায়।

২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে কলাম্বিয়ার দুর্ঘটনা বড় বিষাদ–জাগানিয়া। সেদিন ব্যর্থ হয়েছিল প্রযুক্তি, সাড়া দেয়নি যন্ত্র। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে গোটা কন্ট্রোলরুম দেখেছিল অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত সাত-সাতজন মহাকাশচারী কীভাবে মহাকাশের বুকেই অনন্তসমাধি নেন। এ দুর্ঘটনার পর টানা দুই বছর সব রকমের মহাকাশ অভিযান বন্ধ রেখেছিল নাসা।

এমন বাস্তবতা ও উৎকণ্ঠা মাথায় নিয়ে ২৮৬ দিন মহাকাশে কাটানোর পর স্পেসএক্সের মহাকাশাযানে পৃথিবীতে ফিরলেন সুনিতা উইলিয়ামস, বুচ উইলমোরসহ চার নভোচারী। সুনিতারা এখন নিজেদের বাড়িতে বা পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন না। তাঁদের ক্রু কোয়ার্টারে থাকতে হবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হবে। তারপর তাঁরা ফিরতে পারবেন নিজেদের পরিবারের কাছে। গত বছর জুন মাসে সুনিতা উইলিয়ামসরা আট দিনের জন্য মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন। কিন্তু বোয়িং স্টারলাইনারের মহাকাশযানে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। তাঁদের ফিরে আসার সময় পিছিয়ে যায়।

সুনিতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর যে ২৮৬ দিন মহাশূন্যে কাটিয়েছেন, তা এক অনিশ্চিত, চরম শারীরিক ও মানসিক চাপের জীবন।

আচ্ছা, এই ৯ মাসের অনিশ্চিত জীবনযাপনের আর্থিক মৃল্যমান কেমন? ৯ মাসের জন্য সুনিতা ও বুচ ৯৩ হাজার ৮৫০ থেকে ১ লাখ ২২ হাজার ৪ ডলার পাবেন। এ ছাড়া ১ হাজার ১৪৮ ডলার ইনসিডেন্টাল পে পাবেন।

দেখুন, বাংলাদেশে যেভাবে টাকা উড়ে এ দেশ থেকে ও দেশে চলে যায়, তার তুল্যমূল্যে এই অর্থ একটা পান খাওয়ার মূল্যের সমানও নয়। অথচ সুনিতারা মহাশূন্যে থেকে কতশত জাদুকরি গবেষণাই না করেন, যার বিনিময়ে আমরা পাই পৃথিবীর আনন্দকর ও সাবলীল জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। তাঁদের গবেষণা ও সংগ্রামের সুফলেই পৃথিবীর মানুষ ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির সুবিধা ভোগ করে।

সুনিতা উইলিয়ামসদের মতো নারী মহাকাশচারীরা আমাদের আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন জাগান। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, নারীদের জন্য অন্তরাল নয়, আকাশের বিশালতাই প্রকৃত জীবন। বাংলাদেশের নারীদেরও সুনিতা ও কল্পনার জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত—সীমাবদ্ধতা নয়, মহাবিশ্বের অবারিত সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়াই নারীর প্রকৃত পরিচয়।

সুনিতা উইলিয়ামসদের এই ত্যাগ–তিতিক্ষা কোনো মূল্যেই বিচার্য নয়। তাঁরা সশরীরে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন, স্বজনদের সান্নিধ্যে আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারবেন, নতুন অ্যাস্ট্রোনটদের স্পেস সায়েন্স শেখাবেন—এটুকুই তাঁদের পরম পাওয়া।

আমাদের নারীদের বলব, সুনিতা ও কল্পনা চাওলাদের প্রেরণায় রাখুন। অন্তরাল কোনো জীবন নয়, জীবন হলো আকাশের মতো উদার।

‘নাগরিক সংবাদ’-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: ns@prothomalo.com