বিজি ৩৮৭, আমার অভিজ্ঞতা
আট দিনের একটা ফ্যামিলি হলিডে শেষে গতকাল ঢাকায় পৌঁছালাম আমরা চারজন কুয়ালালামপুর থেকে। খুব সহজ, সাধারণ এবং অত্যন্ত বোধগম্য একটি সেন্টিমেন্ট। আর একটা আর এটা বড়জোর কোনো ফ্যামিলি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একটা আপডেট হতে পারে। এর থেকে বেশি কিছু আপাতদৃষ্টে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তা–ই যদি হতো, আমি হয়তো কাগজ–কলম নিয়ে শীতের সকালের ঘুম বাদ দিয়ে বসতাম না। গতকালকের প্লেন জার্নিটা আমার একটা বিশাল অভিজ্ঞতা। আমার মন চাচ্ছে এটা নিয়ে লিখতে, শেয়ার করতে।
বিমান বাংলাদেশের বিজি ২৮৬ ফ্লাইটে সকাল পৌনে ৭টায় আমাদের কুয়ালালামপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু। যেহেতু বিমানের ফ্লাইট আর মালয়েশিয়া থেকে আসছে, তাই সফরসঙ্গী হিসেবে প্রবাসী আয় আনা ভাইদের সংখ্যাই ছিল বেশি।
উড্ডয়নের পর থেকে দুই-আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই চলছিল। আমি এখানে আলাদাভাবে একজন ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টের কথা বলতে চাই যার নাম গওহর। উনি খুবই শ্রদ্ধা আর আদর দিয়ে আমাদের প্রবাসী ভাইদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, মালপত্র রাখার ব্যাপার নিয়ে সাহায্য করছিলেন।
ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন হওয়াতে এমনিতেও জনমনে কিছুটা উৎসবের আমেজও হয়তো বা থেকে থাকবে। এভাবে গল্পটা শেষ করতে পারলে আমার ভালো লাগত। কিন্তু তাহলে আর গল্প কেন?
হঠাৎ পাইলট জানালেন কুয়াশার কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম আর সিলেট কোনো বিমানবন্দরেই বিমানের অবতরণের অনুমতি পাওয়া যায়নি। তাই আমরা ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরে ল্যান্ড করব। পরে আবহাওয়া পরিষ্কার হলে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হব। একটু মনে করিয়ে দিই, ততক্ষণে আমাদের তিন ঘণ্টা ভ্রমণ হয়ে গেছে। কুয়ালালামপুর থেক ঢাকার ফ্লাইট হলো ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট।
কী আর করা!
মেনে নিয়ে আশপাশের সহযাত্রীদের সঙ্গে আলাপে মেতে উঠলাম। সময় যত বাড়তে থাকে, পেট তত তলানিতে। আমার স্বামী আর আমি নিজেরা কথাবার্তা বলতে বলতে খেয়াল করছিলাম, মানুষজনের রাগের পারদটা উঠতির দিকে,
খুবই স্বাভাবিক। সকালের ফ্লাইট দেখে বিমানবন্দরের কাছে একটা আরামদায়ক হোটেল থেকে বিমানবন্দরে আসা আমরা একটা পরিবার, যারা ছুটিতে মালয়েশিয়া গিয়েছিলাম। বিপরীতে আমাদের এই প্রবাসী ভাইয়েরা রাতের বাসযাত্রা করে খুবই অল্পদিনের ছুটি নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে বিমানবন্দরে এসেছেন। আবার দেশে তাঁদের পরিবার অপেক্ষায় তাঁদের অনেক বছর পরে দেখবে বলে।
এই ক্লান্ত মানুষগুলোর অসহায়ত্ব আস্তে আস্তে রাগে রূপ নিতে দেখলাম। আমার মনে হচ্ছিল হয়তো একটা মব হলেও হতে পারে। বিভিন্ন ধরনের কথা শুনছিলাম বিভিন্ন আসন থেকে, ‘সবার একলগে খাড়ান লাগব’, কে যেন বলছেন, আপনি আগে যান, ইত্যাদি ইত্যাদি।
তখন আমার মনে হলো (স্বামীর পরামর্শে) আমাদের অন্তত কেবিন ক্রুদের জানানো উচিত যে উনারা যেন হালনাগাদ তথ্যটা দেন। যখন কারও কাছে কোনো ইনফরমেশন থাকে না, তখন সেই শূন্যস্থান মানুষ বিভিন্নভাবে ভুল আর অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে পূর্ণ করে আর এসব থেকে ঘটে বিপত্তি।
অনুরোধে কাজ হলো।
পাইলট আবারও একই কথা বললেন। ততক্ষণে তিন ঘণ্টা আমরা বদ্ধ প্লেনের ভেতরে। এ সি কাজ করছে কম, ভেতরে ফায়ার সেফটি গাইডেন্স ভাগ্যিস এখনো বাজেটের চক্করে পড়ে পাতলা কাগজে পরিণত হয়নি। তাই ওটা দিয়েই পাখার কাজ চলছিল বেশ, কিন্তু ওইটুকু বাতাস অবশ্যই প্লেনের ভেতরের ‘উত্তাপ’ কমাতে ব্যর্থ। তাই, আমরা দেখলাম, হঠাৎ করে তিন-চারজন ভাই বলে উঠলেন, ‘অ্যাঁই, ভাঙ্গেন সিট, এগুলো চোর বাটপার সবাই। এ জন্য বাঙালি কেউ দেখতে পারে না।’ (একটু মনে করিয়ে দেই, প্লেনের সিটগুলো পর্যন্ত বাঙালি) ইত্যাদি, ইত্যাদি।
ব্যস! (আমরা শুরু করে দিলাম মব, ৫ আগস্টের পরে আমরা যেটা বেশি ভালো করছি।)
কিন্তু এর মধ্যেও কিছু মানুষজন বাকিদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। এত উত্তেজনার মধ্যেও যখন চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পায় না, সেটাকেই হয়তো পূর্ণতা বলে। কোনো কোনো ভাই বললেন, এই পাইলটই চালিয়ে নিয়ে যাবেন, খামাখা ঝামেলা করে লাভ কী? আর প্লেন ভেঙে কী হবে? উনাদের নিজেদের কী ঠ্যাকা যে এখানে এতক্ষণ বসে থাকবেন? তারাও ক্লান্ত।
হঠাৎ একজন প্রবাসী শ্রমিক ভাইকে দেখলাম ভ্লগ করছেন। তিনি পুরো প্লেন হেঁটে হেঁটে রেমিট্যান্স না পাঠানোর অনুরোধ করছেন বাকি শ্রমিক ভাইদের। যাঁদের কারণে অর্থনীতির চাকা সচল, তাঁদের ভোগান্তির কারণেই এই প্রতিবাদ।
অবাক হয়ে লক্ষ করলাম ক্রু বা পাইলট কারও পক্ষ থেকেই তখন পর্যন্ত কোনো আপডেট নেই। এতগুলো মানুষের হতাশা, বিরাগ বেড়েই চলল। এর মধ্যে প্লেনের দরজা দুটো খুলে দেওয়ার ফলে কিছুটা বাতাস এল। উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন সম্মিলিত সিদ্ধান্ত হলো দু-চারজন গিয়ে পাইলটের সঙ্গে কথা বলে প্রকৃত অবস্থা জানতে চাইবেন।
তাঁরা ফিরে আসতে আসতে শোনা গেল বিমানের তেল কেনার টাকা নেই। তাই আবহাওয়া ঠিক হওয়ার পরও আমরা যেতে পারছি না। এই কারণটা যে একদমই জুতসই নয়, আমি আমার স্বামী এই কথাটা বলতে বলতেই পাইলটের গলা (অ্যানাউন্সমেন্ট) শুনতে পেলাম।
যা শুনলাম, তা হলো, মিয়ানমার জাতিসংঘ থেকে অবরোধ (স্যাংকশন) পাওয়া একটি দেশ, তাই ডেবিট/ক্রেডিট ট্র্যানজ্যাকশন হবে না। আর কেবিন ক্রু/পাইলট নিশ্চয়ই মিয়ানমারের মুদ্রা নিয়ে বসে নেই। তাই, আপাতত ভরসা বাংলাদেশ হাইকমিশন, যারা তখন নগদ টাকা নিয়ে এসে তেল কিনবেন এবং আমরা ঢাকায় ফেরত আসতে পারব। এই ঘোষণার সর্বশ্রেষ্ঠ অংশ ছিলো আমরা ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরে বিশ্রামের সুযোগ পেতে যাচ্ছি। তাদের এ কথায় ভালো লাগল। তাঁরা (মিয়ানমান) আমাদের এ সুযোগ না করলে আমাদের কিন্তু কিছু করার ছিল না। তাঁরা হয়তো বিনা মূল্যে করেনি, কিন্তু আমাদের দূতাবাস তো টাকার খনি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন (লঘু রসিকতা)।
যা–ই হোক, আমাদের সবাইকে গোলাপি রঙের ডামি প্লেন টিকিট দেওয়া হলো। বেসিক চেকিংয়ের পর ওখানে এক জায়গায় বসলাম, গেট নম্বর ১১ (gate no. 11.) । বিমানবন্দরটা দেখে অবাক হলাম। অবরোধ পাওয়া একটি দেশের বিমানবন্দর আমাদের বাংলাদেশের বিমানবন্দরের চাইতে অনেক গুণ সুন্দর, শৈলী আর পরিষ্কার। আসলে, টাকাই সব সমস্যার সমাধান নয়। এই বিশাল শিক্ষা নিয়ে ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরে বেশ কিছুক্ষণ (ঘণ্টাখানেক) পার করে শেষে বিমানে উঠলাম।
পাইলট বারবার ক্ষমা চাইলেন। উনাদের অবস্থাটাও বুঝতে পারছিলাম। খালি মূর্খ আমি কয়েকটি জিনিস বুঝতে পারছিলাম না,
১. অবরোধের মুখে পড়া দেশেই কেন নামতে হলো?
২. কুয়ালালামপুর থেকে ওড়ার সময় তেল নিলে কী হতো?
৩. যাত্রীদের সার্টেন ইন্টারভ্যালে (certain interval) জানানোর ক্ষেত্রে সমস্যা কী ছিল?
এ প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর আমার কাছে নেই। দীর্ঘদিন মানবসম্পদে কাজ করার ফলে একটা জিনিস খুব শক্তভাবে শিখেছি, তা হলো যাই হচ্ছে, খারাপ-ভালো সব জানিয়ে রাখা, তাতে করে মানুষকে সহযোগী হিসেবে পাওয়া যায়, প্রতিপক্ষ নয়। তখন সবাই মিলে একই সঙ্গে সমস্যার সমাধান করা যায়। আমাদের তীব্র শ্রেণিভিত্তিক সমাজে রাজা, প্রজা, বেশি জাতি–বর্ণ মাত্রে নিরো কী বুঝবে মানসিকতা থেকেই হয়তো, ইনফরমেশন ট্রান্সপারেন্ট এত বোঝার। যা–ই হোক, থিওরি কপচানোর পর আবার আপনাদের ইয়াঙ্গুনে নিয়ে যাই।
প্লেন চলা শুরু করল। সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে শান্তির নিশ্বাস ফেললাম। আমি খুব অবাক হয়ে দেখলাম এত কিছুর মধ্যেও আমার ১১ বছর বয়েসী আত্মজা আর ৫ বছর বয়েসী আত্মজ এই অবস্থায় একটা অংশ হয়ে দেখছে, কথা বলছে, নিজেরা খেলছে, কোনো বিরক্তি, ভয়, কোনো নেগেটিভিটি ছাড়াই। জেন আলফা–এর প্রতিনিধিত্ব করে আমার মেয়ে আমার প্লেন দিয়ে ভিডিও রেকর্ডও করে ফেলল। ফোন থাকতে মুখে কী? (‘হাত থাকতে মুখে কী’র বর্তমান ভার্সন)।
বাংলাদেশকে নিয়ে যতই সমস্যার ফিরিস্তি দেই না কেন, বাঙালি অনেক কিছুই মেনে নেয়, মানিয়ে নেয়।
আমরা দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা পর দেশের মাটিতে পৌঁছালাম। আমরা সবাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই যারা আমরা একসঙ্গে এই অবস্থার মধ্য দিয়ে গেলাম। কিন্তু কিছু কথা না বললে এই লেখাটা অসম্পূর্ণ থাকবে।
হাজারো বদনামের মধ্যে যখন সবুজ পাসপোর্টটা ধরে বলি, ‘ফর্ম বাংলাদেশ-From Bangladesh’ - আবেগে, গর্বে, প্রত্যয়ে কানায় কানায় ভরে উঠে হৃদয়।
১. বাঙালি অত্যন্ত উষ্ণ হৃদয়ের— চিনি না, জানি না লোকজন এসে বাচ্চাদের চকলেট, বিস্কুট দিয়ে গেলেন। যেহেতু এত দীর্ঘ সময়ে খাবারের পর্যাপ্ততা ছিল না।
২. বাঙালির রসবোধের সঙ্গে আসলে কোনো কিছুরই তুলনা চলে না। যখন বলা হলো ফাইনালি ঢাকায় নামব আমরা, তখন একজন সহাস্যে বলে বসলেন, ‘ঢাকা যাইয়া আবার নেপাল নিয়ে যাইব?’ একটি সিট ঠিকমতো কাজ করছিল না, ভদ্রলোক সহাস্যে বললেন, সিটও একটা পাইসি, এটা ভাঙা। জীবনের সমস্যাগুলো এ রকম হাসি দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারি ঠিকই আমরা বাঙালি।
৩. এক সিলেটি দম্পতি বসেছিলেন তিন সিটের জানালা আর মাঝখানে। আর পাসে সিটের সামনে বিশাল বস্তা আরেক যাত্রীর। উনি জুতা খুলে নিজের সিটের দিকে ছুড়ে দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে যেয়ে বসলেন।
৪. একটুকরা প্রেম একজন পুরুষ ও মহিলার কথাবার্তা শুনে বুঝলাম, মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর প্রমোদভ্রমণ শেষে উনারা ফিরছেন। বয়স ৪০-৫০ এর দিকে। সমস্যাটা তখনই হলো, যখন ভদ্রলোকের ফোন থেকে বাসায় জানাতে হলো ফ্লাইট লেট হবে। আমি আসলে জানি না উনাদের সবার কী অবস্থা বা আদৌ কোনো অবস্থা কি না।
৫. একটা দাবি উঠেছিল এখন হয় আমাদের কেন নামতে দেওয়া হচ্ছিল না। এক ভাইয়ের উক্তি, বাঙালি নামতে দিলে চিপাচাপা দিয়ে যাইব গা, আর আইব না। উত্তর সঠিক।
৬. এসব সময়ে সবচেয়ে বেশি যেটা দেখা যায়, সেটা হলো মানবিকতা। একজন ভদ্রলোক, স্ত্রী সন্তানসহ যাত্রা করবেন, দেখে মনে হয়, কোনো করপোরেটে কাজ করেন। নিজের ফোন থেকে অনেক প্রবাসী শ্রমিকদের সাহায্য করলেন তাঁদের বাসায় খোঁজ দিতে। বলতে চাই, এই ভদ্রলোক আমার জীবনসঙ্গী।
শেষ করতে চাই এক টুকরো স্বপ্ন নিয়ে। মানবেতর জীবনযাপন, ১৬ ঘণ্টা ডিউটি করা এই মানুষগুলোর যাতে হেলিকপ্টার, পুতুল সেট, কিংবা বড় ধরনের কম্বলগুলো শুধু জিনিস নয়, এক এক টুকরা স্বপ্ন। ছেলের জন্য, মেয়ের জন্য, স্ত্রীর জন্য, মা–বাবার জন্য একটুকরা ভালোবাসা। শত কষ্টের মধ্যেও এই মানুষগুলোর চিন্তার কারণ ছিল তাঁদের জন্য অপেক্ষমাণ সহতয়। নিজেদের কষ্ট এখানে গৌন। আর এই স্বপ্নীল মানুষগুলোর একতা সাধারণ নাম আছে, তা হলো ‘বাঙালি’। আর এই স্বপ্ন দেখা আর নিজের থেকেও অন্যকে ভালোবাসতে পারার ক্ষমতাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায় অনেক দূরে।
তাই, হাজারো বদনামের মধ্যে যখন সবুজ পাসপোর্টটা ধরে বলি, ‘ফর্ম বাংলাদেশ–From Bangladesh’ – আবেগে, গর্বে, প্রত্যয়ে কানায় কানায় ভরে উঠে হৃদয়। অনেক শুভকামনা সবার জন্য।
*লেখক: তানাকা ইসলাম, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]