বাবা, পকেটে টাকা আছে?
রাত তখন সাড়ে ১১টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাহি আকাশ দেখছিল। চারপাশে বন্ধুদের হাসির শব্দ, কোথাও গিটারের টুংটাং, কোথাও পরীক্ষার পড়া নিয়ে ব্যস্ততা। অথচ তার হাতে থাকা ফোনটা কেমন ভারী লাগছিল। মাসের শেষ। হাতে টাকা নেই। বাড়িতে ফোন করবে কি না, অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিল। শেষ পর্যন্ত নম্বরটা ডায়াল করল।
তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ঘুমজড়ানো গলা—
‘হ্যালো, মা?’
মাহি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
‘বাবা...পকেটে টাকা আছে?’
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর সেই চেনা উত্তর
‘আছে তো মা। কত লাগবে?’
মাহি বলল,
দুই হাজার।
ঠিক আছে। কাল সকালে পাঠিয়ে দেব।
বাবা...এখন কি আছে?
আছে বললাম তো।
তাহলে এখনই দিতে পারবে?
হ্যাঁ, দিচ্ছি।
কথাটা বলে বাবা ফোন রেখে দিলেন।
বাবারা বোধ হয় একটা শব্দ খুব ভালো জানেন ‘চলবে।’ নিজের জন্য কম পড়লে চলবে। জুতাটা আরেকটু পুরোনো হলে চলবে। জামাটা আরেক বছর পরলে চলবে। ডাক্তারের কাছে যাওয়াটা কয়েক দিন পিছিয়ে দিলে চলবে। কিন্তু সন্তানের কোনো প্রয়োজন যেন না থামে। সন্তানের পড়াশোনা যেন না থামে। সন্তানের স্বপ্নের সামনে যেন কোনো দিন ‘টাকা নেই’ কথাটা না দাঁড়ায়।
মাহি জানত না, ফোনটা রাখার পর তার বাবা বিছানা থেকে উঠে বসেছেন। ঘরের বাতি জ্বালিয়েছেন।
পুরোনো পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিয়ে একটা মানিব্যাগ বের করেছেন।
মানিব্যাগ খুলে দেখলেন কয়েকটা পাঁচ শ টাকার নোট, কিছু খুচরা। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
পরদিন সকালে মাহির ফোনে টাকা চলে এল। সে আর কিছু ভাবল না। বন্ধুদের সঙ্গে নাশতা করল। ক্লাসে গেল। বিকেলে ক্যাম্পাসের চায়ের দোকানে বসে গল্প করল। রাতের দিকে রুমে ফিরে অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দিনটা অন্য দিনের মতোই কেটে গেল।
শুধু সে জানল না, সেই দুই হাজার টাকা পাঠানোর পর তার বাবার পকেট প্রায় খালি হয়ে গিয়েছিল।
আরও জানল না, টাকা পাঠানোর পর বাবা আবার মানিব্যাগটা খুলে দেখেছিলেন। ভেতরে পড়ে ছিল কয়েকটা খুচরা টাকা আর একটা পুরোনো পাঁচ শ টাকার নোট। বাবা নোটটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। তারপর খুব আস্তে মানিব্যাগটা বন্ধ করে রেখেছিলেন।
পরদিন সকালে বাজারে যাওয়ার সময় পকেটে হাত দিয়ে তিনি নিজেই হেসেছিলেন।
‘চলবে।’
বাবারা বোধ হয় এই একটা শব্দ খুব ভালো জানেন ‘চলবে।’
নিজের জন্য কম পড়লে চলবে। জুতাটা আরেকটু পুরোনো হলে চলবে। জামাটা আরেক বছর পরলে চলবে। ডাক্তারের কাছে যাওয়াটা কয়েক দিন পিছিয়ে দিলে চলবে। কিন্তু সন্তানের কোনো প্রয়োজন যেন না থামে। সন্তানের পড়াশোনা যেন না থামে। সন্তানের স্বপ্নের সামনে যেন কোনো দিন ‘টাকা নেই’ কথাটা না দাঁড়ায়।
এক শুক্রবার দুপুরে বাবা ফোন করলেন।
মা, কী করছিস?
রুমে আছি।
খেয়েছিস?
হ্যাঁ।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
টাকা লাগবে?
মাহি হেসে বলল,
না বাবা, এই তো দিয়েছো। এখন আর লাগবে না।
আচ্ছা।
আবার নীরবতা।
মেয়েটা বলল,
কিছু বলবে?
না। এমনিই ফোন দিলাম।
ঠিক আছে বাবা, পরে কথা বলি। একটু কাজ আছে। আচ্ছা মা।
ফোন কেটে গেল।
বাবা আরও কিছুক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকলেন। মেয়ের কণ্ঠটা যেন ফোন কেটে যাওয়ার পরও কানে বাজছিল। তিনি ফোনটা টেবিলে রেখে জানালার বাইরে তাকালেন। বিকেলের রোদ উঠানের এক পাশে পড়েছে। সেই উঠানেই মেয়েটা ছোটবেলায় খেলত। এক হাতে পুতুল, অন্য হাতে বাবার পুরোনো মোবাইল। বাবা কাজে যাওয়ার সময় সে দরজায় দাঁড়িয়ে বলত,
তাড়াতাড়ি এসো।
বাবা বলতেন,
কেন?
তোমার জন্য অপেক্ষা করব।
তখন বাবা হেসে বলতেন,
ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি আসব।
মেয়েটা জানত না, একজন বাবা সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরার সবচেয়ে বড় কারণটাও ছিল সেই ছোট্ট অপেক্ষা।
সন্ধ্যায় বাবা আলমারি খুললেন। একটা পুরোনো বাক্স বের করলেন। বাক্সের ভেতর কিছু ছবি। মেয়ের স্কুলের প্রথম দিনের ছবি। একটা পুরোনো রিপোর্ট কার্ড। প্রথম পুরস্কার পাওয়ার সনদ। আর একটা ছবি - বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার দিন। মেয়েটা নতুন জামা পরে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে বাবা। মেয়েটার মুখে বড় হাসি। বাবার মুখেও হাসি। কিন্তু ছবিটা যতবার দেখেন, বাবার মনে হয়, সেই দিনের চেয়ে আজকের মেয়েটা কত বড় হয়ে গেছে। সময়টা কোথায় গেল? তিনি ছবিটা হাতে নিয়ে আঙুল দিয়ে মেয়ের মুখটা ছুঁয়ে দিলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন,
বড় হয়ে গেলি রে…
কথাটা যেন ছবিটাকেই বললেন।
সেদিন রাতে মেয়েটার ফোনে বাবার একটা মেসেজ এল।
ঘুমাসনি এখনো?
মেয়েটা তখন অ্যাসাইনমেন্ট লিখছিল।
মেসেজ দেখে উত্তর দিল,
না। অ্যাসাইনমেন্ট করছি।
কিছুক্ষণ পর বাবার উত্তর
বেশি রাত করিস না।
মেয়েটা হেসে ফোনটা পাশে রেখে দিল।
তারপর আবার লেখায় মন দিল।
কিন্তু কয়েক মিনিট পর ফোনটা আবার হাতে নিল।
কী মনে হলো, বাবাকে একটা মেসেজ পাঠাল
বাবা, তুমি ঘুমাওনি?
অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
মেয়েটা ভেবেছিল, বাবা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন।
প্রায় আধঘণ্টা পর ফোনটা বেজে উঠল।
বাবার মেসেজ
ঘুম আসছিল না। এখন আসবে।
সেদিন বাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার পথে বাবা আবার দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন। বাবা আবার বললেন, ‘টাকা আছে তো?’ মাহি হেসে বলল, ‘আছে।’ কম পড়লে বলিস।
মেয়েটা শুধু একটা লাইক রিঅ্যাক্ট পাঠিয়ে ফোনটা রেখে দিল। সে জানত না, সেই সময় বাবা বারান্দায় বসে ছিলেন তার ছোটবেলার একটা ছবি হাতে নিয়ে।
কয়েক দিন পর মেয়েটা বাড়ি গেল।
বাড়িতে ঢুকেই দেখল, বাবা বারান্দায় বসে জুতা পলিশ করছেন।
মেয়েটা অবাক হয়ে বলল,
‘নতুন জুতা কিনছ না কেন?’
বাবা বললেন,
‘এখনো তো ভালো আছে।’
মেয়েটা জুতার দিকে তাকাল।
সামনের চামড়া উঠে গেছে।
সেলাই করা।
তবু বাবা বললেন,
‘আরেকটু চলবে।’
মেয়েটা কিছু বলল না।
শুধু বাবার পায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ মনে হলো-
এই মানুষটা কি সত্যিই সবকিছুতে এত কমেই চলে যেতে পারে? নাকি আমাদের জন্যই তাকে কমে চলতে হয়?
সেদিন দুপুরে খাওয়ার সময় বাবা মেয়ের প্লেটে মাছের বড় টুকরাটা তুলে দিলেন।
মেয়েটা বলল,
‘তুমি নাও।’
বাবা বললেন,
‘আমি মাছ খাই না।’
মেয়েটা হেসে বলল,
‘মিথ্যা কথা। তুমি তো মাছ খুব পছন্দ করো।’
বাবা একটু থেমে বললেন,
‘তোর ভালো লাগে, তুই খা।’
মেয়েটা আর কিছু বলল না।
মাছটা বাবার প্লেটে ফিরিয়ে দিল।
‘আজ তুমি খাবে।’
বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
‘তুই বড় হয়ে গেছিস।’
মেয়েটা হেসে বলল,
‘অনেক আগে।’
বাবা মাথা নাড়লেন।
‘না। আজ বড় হলি।’
মেয়েটা বুঝতে পারল না, বাবা কী বলতে চাইলেন।
কিন্তু সেদিন প্রথমবার বাবার প্লেটে মাছের টুকরাটা দেখে তার চোখে পানি এসে গেল।
সেদিন বাড়ি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার পথে বাবা আবার দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন। বাবা আবার বললেন,
‘টাকা আছে তো?’
মাহি হেসে বলল,
‘আছে।’
‘কম পড়লে বলিস।’
‘ঠিক আছে বলব।’
‘সাবধানে যাস।’
মাহি মাথা নাড়ল।
‘হুম।’
‘পৌঁছে ফোন দিস।’
‘দেব, বাবা।’
আর কিছু বলল না কেউ।
মেয়েটা রাস্তায় হাঁটতে শুরু করল।
কিছু দূর গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল।
পেছনে তাকাল।
বাবা তখনো দরজায় দাঁড়িয়ে।
যেমন দাঁড়িয়ে থাকত সে ছোটবেলায় স্কুলে যাওয়ার সময়। শুধু মানুষটা আগের মতো নেই। মাথার চুল আরও সাদা হয়ে গেছে, মুখে ভাঁজ পড়ে গেছে, হাতের শিরাগুলো আরও স্পষ্ট।
মাহি দূর থেকেই তার বাবার পকেটের দিকে তাকাল।
হঠাৎ তার মনে হলো—
এই পকেটটাই তো তার শৈশবের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা ছিল। যেখানে হাত ঢুকিয়ে সে টাকা খুঁজেছে।
চকলেট খুঁজেছে। ছোট ছোট স্বপ্ন খুঁজেছে। কিন্তু কোনো দিন খুঁজে দেখেনি—
বাবার জন্য সেখানে কী ছিল। মাহি আর এগোতে পারল না। দৌড়ে ফিরে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
বাবা অবাক হয়ে বললেন,
‘কী হলো?’
মাহি কিছু বলল না।
শুধু বাবার বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল।
অনেকক্ষণ পর বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
‘আবার কাঁদছিস কেন?’
মাহি চোখের পানি মুছে খুব আস্তে বলল,
‘বাবা…’
‘হুম?’
‘তোমার পকেটে টাকা আছে?’
বাবা হেসে ফেললেন।
‘আছে তো।’
মেয়েটা এবার বাবার পকেটে হাত দিল না।
শুধু হাতটা ধরে বলল,
‘থাক। আজ আর লাগবে না।’
বাবা কিছু বুঝলেন না।
মাহি শুধু বলল,
‘আজ তোমার পকেটটা খালি থাকলেও চলবে।’ তারপর বাবার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল,
‘শুধু…হাতটা আমার হাতে রেখো।’
বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কিছু বললেন না। শুধু হাতটা শক্ত করে ধরলেন।
মেয়েটা আবার হাঁটতে শুরু করল।
পেছনে তাকাল না। কারণ, এবার সে জানে, পেছনে একজন বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। আর বাবারা যত দিন দাঁড়িয়ে থাকেন, সন্তানেরা তত দিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাটুকু সঙ্গে নিয়ে হাঁটে।
---
আজ চারটা ক্লাস পরপর থাকায় মাহি খুব ক্লান্ত হয়ে গেছে। সন্ধ্যায় কিছু নোট দোকান থেকে ছাপিয়ে আনার পথে বাইরে থেকে একেবারে রাতের খাবারও খেয়ে এল। রাত প্রায় ১০টার কাছাকাছি। হলে ফিরে মাহি একটা ব্যাগ খুলল। বাবার দেওয়া পুরোনো একটা রুমাল বেরিয়ে এল। সে রুমালটা হাতে নিয়ে বসে রইল।
তারপর ফোনটা হাতে নিল। বাবার নম্বরটা স্ক্রিনে জ্বলছে। কল করবে কি না, কিছুক্ষণ ভাবল। শেষ পর্যন্ত কল করল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
ওপাশ থেকে ফোন ধরা হলো না। মেয়েটা ফোনটা নামিয়ে রাখল। হাতে ফোন। চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে অন্ধকার আকাশের দিকে। তারপর ফোনের স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়াল। একটা অডিও ফাইল খুলল।
তারিখটা এক বছর আগের। মাহি প্লে করল।
হঠাৎ সেই পরিচিত কণ্ঠ—
‘হ্যালো, মা?’
মেয়েটার ঠোঁট কেঁপে উঠল। চোখ বন্ধ করল সে।
আবার সেই কণ্ঠ—
‘পকেটে টাকা আছে?’
না। প্রশ্নটা বাবাকে নয়। প্রশ্নটা করেছিল সে। তার নিজের কণ্ঠ। এক বছর আগের।
তারপর বাবার সেই উত্তর—
‘আছে তো মা। কত লাগবে?’
মেয়েটার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
সে জানে, এই কথোপকথনটা এখন আর কোনো দিন নতুন করে হবে না। তবু সে শোনে। বারবার শোনে। মাঝে মাঝে রাত গভীর হলে পুরোনো কল রেকর্ড খুলে বসে থাকে। কেউ জানে না, কেন সে একই কথাগুলো বারবার শোনে। হয়তো সে টাকার জন্য বাবাকে ফোন করেনি। হয়তো সে বাবার কণ্ঠটা একটু বেশি সময় ধরে রাখতে চেয়েছিল। কারণ, মানুষের চলে যাওয়ার পর তার ছবি দেখা যায়।
তার জামা ছোঁয়া যায়।
তার ঘর খোলা যায়।
তার পুরোনো জিনিস গুছিয়ে রাখা যায়।
কিন্তু তার কণ্ঠটা?
কণ্ঠ তো ছুঁয়ে দেখা যায় না।
তাই মেয়েটা কল রেকর্ডিংয়ে বাবাকে খুঁজে বেড়ায়।
‘বাবা…’
অডিওতে তার নিজের কণ্ঠ ভেসে আসে।
‘হুম?’
মেয়েটা এবার ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরে।
ফিসফিস করে বলে, ‘আরেকটু কথা বলো বাবা…”
কিন্তু রেকর্ডিংয়ে বাবার কণ্ঠ এগিয়ে যায়।
‘কত লাগবে?’
‘দুই হাজার।’
‘ঠিক আছে। কাল সকালে পাঠিয়ে দেব।’
‘বাবা...এখন কি আছে?’
‘আছে বললাম তো।
তাহলে এখনই দিতে পারবে?’
‘হ্যাঁ, দিচ্ছি।’
‘পড়াশোনা করিস। বেশি রাত করিস না।’
মেয়েটা চোখ বন্ধ করে।
এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে ফোনের স্ক্রিনে।
‘বাবা, আমি এখনো রাত জাগি…’
রেকর্ডিং অবশ্য তার কথা শুনতে পায় না।
শুধু এক বছর আগের সেই মানুষটা নিজের মতো করে বলে যায়—
‘আবার রাত জাগবি?’
মেয়েটা এবার হেসে ফেলে। কান্নার ভেতর দিয়ে।
‘হুম বাবা…’
তারপর খুব আস্তে বলে,
‘তুমি তো আর বকতে আসো না।’
রেকর্ডিং চলতে থাকে।
‘ভালো থাকিস মা।’
এই একটা বাক্যে এসে মেয়েটার বুকটা ভেঙে যায়।
সে ফোনটা শক্ত করে ধরে ফেলে।
‘তুমিও ভালো থেকো বাবা…’
কথাটা বলতে বলতে তার গলা আটকে যায়।
কিছুক্ষণ পর দরজার শব্দ হলো। তার রুমমেট এসে দাঁড়াল পাশে। মেয়েটা খেয়াল করেনি। রুমমেট কিছু বলল না। শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে কাছে এসে মেয়েটার হাত থেকে ফোনটা নামিয়ে দিল। রেকর্ডিংটা বন্ধ হয়ে গেল।
হঠাৎ চারপাশটা অসম্ভব নীরব হয়ে গেল। মেয়েটা স্থির হয়ে বসে রইল। রুমমেট তার পাশে এসে বসে মাথায় হাত রাখল। কিছু জিজ্ঞেস করল না। কীই–বা জিজ্ঞেস করবে? কিছু মানুষকে নিয়ে কোনো প্রশ্নের উত্তর হয় না। মেয়েটা ফোনটা বুকে চেপে ধরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। আকাশে তখনো কোনো চাঁদ নেই।
শুধু অন্ধকার। এক বছর আগে এই সময়ে সে বাবাকে ফোন করেছিল। আজও একই সময়ে সে বাবার কণ্ঠ শুনতে বসে।
শুধু পার্থক্য একটাই—
তখন ফোনের ওপাশে বাবা ছিলেন।
এখন আছে শুধু একটি কল রেকর্ডিং। কারণ, এক বছর হয়ে গেছে তিনি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন।
হঠাৎ মাহির মনে হয়,
একটা প্রশ্ন সে হয়তো সেদিন ঠিকমতো করতে পারেনি।
তাই আজও মাঝরাতে ফোনটা হাতে নিয়ে খুব আস্তে বলে—
‘বাবা…পকেটে টাকা আছে?’
কোনো উত্তর আসে না।
তবু সে ফোনটা কানের কাছে ধরে রাখে। অনেকক্ষণ।
হয়তো সে জানে—
কোনো উত্তর আসবে না।
তবু ও সে অপেক্ষা করে।
কিসের জন্য—
সে নিজেও জানে না।
*লেখক: শিক্ষার্থী: গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]