শুভ্রাংশের চোখে ফিরে দেখা সেই দুর্গাপূজা
আজ থেকে ১২ বছর আগের কথা। যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তাম। প্রতিদিন মন্দিরের সামন দিয়ে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতাম। এটা ছিল নিয়মিত দিনের অভ্যাস।
যখন আশ্বিন মাস আসে, চারপাশ শরৎকালের আবহাওয়ায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাতের বেলায় হালকা শীত অনুভব হয়, আবার দিনের বেলায় গরম। এই সময়ের অনুভূতিটা ছিল অন্য রকম। এই প্রকৃতি, এই আবহাওয়া বলে দেয় মায়ের আগমনী বার্তা।
মন্দিরে তখন প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়ে গেছে। প্রতিমাশিল্পীরা কাজ শুরু করে দিয়েছেন। যখনই স্কুলে যেতাম, তখন একটু দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম মালাকারের সেই নিখুঁত হাতে প্রতিমা গড়ার কাজের দিকে। এতে বিদ্যালয়ে যেতে যত দেরিই হোক, তবু যেন সেই কাজটা না দেখে যেতে মন চাইত না।
আবার যখন টিফিনে বাসায় খেতে আসতাম, তখনো প্রতিমা তৈরির কাজ দেখার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে যেতাম।
আমাদের মন্দিরে সাধারণত কাপড় দিয়ে ঢেকে মালাকার মন্দিরের ভেতরে প্রতিমা তৈরি করত। খুব ভালোভাবে প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে পেতাম না। এ নিয়ে খুব আফসোস হতো।
কবে বড় হব? কবে বড় হব! কবে ভেতরে ঢুকব, প্রতিমা তৈরির কাজ দেখব?
এই চিন্তা প্রতিনিয়তই করতাম।
এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে দেখতে একসময় প্রতিমা তৈরির কাজ হয়ে যেত। পূজার চার দিন আগে প্রতিমা তৈরির কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়ে যেত। আমরা একটু কাপড়ের ফাঁক দিয়ে পরিপূর্ণ কাজ শেষে মায়ের প্রতিমা দর্শন করতাম।
দেখতাম আর মালাকারের কাজের প্রশংসা করতাম—‘এত সুন্দর হয়েছে!’
আবার কেউ বলত, ‘এইটা ওইভাবে করলে আরও ভালো হতো।’
এ নিয়ে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আলোচনা লেগেই থাকত।
তারপর সেই পূজার মাহেন্দ্রক্ষণ দেখতে দেখতে চলে আসত। পূজার দিন চলে আসত। সকালে ঘুম থেকে উঠে অঞ্জলি দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতাম।
আমাদের গ্রামে সবচেয়ে বড় পূজাটা হতো আমাদের এলাকাতেই। আমাদের এলাকায় পূজায় এত বড় মেলা বসত যে আশপাশের অনেক গ্রাম থেকে মানুষ আসত আমাদের পূজা দেখতে এবং মেলায় ঘোরাফেরা করতে। অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও এই মেলায় অবাধ বিচরণ ছিল।
তারপর রাতের বেলায় আমাদের আরতি অনুষ্ঠান ছিল সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ।
ছোটবেলায় একা একা রাতে গিয়ে আরতি অনুষ্ঠান দেখা খুব কষ্টকর ছিল। বড়দের সঙ্গে যেতাম এই অনুষ্ঠান দেখতে। তাঁদের সঙ্গে যাওয়ার কারণে এই অনুষ্ঠান দেখার দীর্ঘস্থায়িত্ব হতো না। লোকজনের যে ভিড় হতো, সেই সময় বসার কেন, দাঁড়ানোর জায়গা পর্যন্ত থাকত না!
তারপর অনেক কষ্ট করে যেতাম এই আরতি অনুষ্ঠান উপভোগ করতে।
এভাবে চলতে থাকত পূজার দিনগুলো। একদিন নির্দিষ্ট করে টার্গেট থাকত মেলায় ঘুরব এবং মা–বাবার কাছ থেকে খেলনা কিনব।
দিনের বেলায় যখন প্যান্ডেল ফাঁকা থাকত, তখন চেয়ারে না বসে বাঁশে বসে ঝুলতে ভালোই মজা লাগত।
এভাবে দেখতে দেখতে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা, স্নান করা এবং অঞ্জলি দেওয়ার মধ্য দিয়ে পূজার দিনগুলো শেষের দিকে ঘনিয়ে আসত।
সেই শেষ দিন চলে আসত—দশমী।
মায়ের ভাসান। সেদিন আনন্দ একটু বেশি। একদিকে দুঃখ, আর অন্যদিকে নাচ, গান, রং ও সিঁদুর খেলায় মেতে উঠত পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ।
তারপর বাসায় গিয়ে ইলিশ আর পুঁটি মাছ দিয়ে দুপুরের খাওয়া শেষে মাকে জোড়ায় তোলার অপেক্ষায় থাকত হাজারো ভক্ত।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
মায়ের শেষবিদায় নাচ-গানের মাধ্যমে তাঁকে ভেলায় তোলা হতো। পুকুরের চারপাশে ঘোরানো হতো। আমাদের সাতপাক দেওয়া হতো। এভাবে সকাল থেকেই পুকুরের পাশে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকত। আর আমাদের মায়ের বিসর্জনের কষ্ট সবার চোখেমুখে ফুটে উঠত।
আকাশে যখন চাঁদ দেখা যেত, তখন মায়ের বিসর্জন দেওয়া হতো।
সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ ‘আসছে বছর আবার হবে’, ‘দুর্গামাই কি জয় জয়’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠত।
মায়ের ভাসান শেষে পুকুরের জল সবাই একে অপরের গায়ে ছিটিয়ে দিত।
আমাদের ভেলা শুরুতে হতো কলাগাছ দিয়ে, কিন্তু এখন হয় ড্রাম দিয়ে। আগে যেখানে ভেলায় ওঠা ছিল এক রকম বিলাসিতা, এখন ভেলার দায়িত্বে আমরা নিজেরাই থাকি।
বিষয়গুলো খুব অবাক লাগে। ছোটবেলায় যা কল্পনা করতাম, দেরিতে হলেও মা দুর্গা সেগুলো পূরণ করে দিচ্ছেন।
মায়ের প্রতিমা তৈরি করা দেখতাম লুকিয়ে, আর আমরা এখন ছেলেপেলেরা মালাকার ঠিক করি।
সত্যিই, জীবন বড়ই অদ্ভুত।
১৩ বছর আগের পূজার আনন্দ থেকে বর্তমানের পূজার আনন্দ এবং দায়িত্ব অনেক বেশি। আগে পূজা মানেই ছিল শুধু আনন্দ, মেলা, খেলনা, আরতি দেখা আর মায়ের প্রতিমার দিকে তাকিয়ে থাকা।
আর এখন পূজা মানেই আনন্দের পাশাপাশি দায়িত্বও।
তবু সেই ছোটবেলার অনুভূতিটা এখনো একই রকম আছে। শরতের আকাশ, কাশফুল আর মায়ের আগমনের বার্তা এলেই মনে হয়—আবার সেই ছোটবেলায় ফিরে গেছি।
যে মায়ের প্রতিমা একসময় কাপড়ের ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম, আজ সেই মায়ের পূজার কিছু দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে পারছি, এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর পাওয়া।
*লেখক: শুভ কর্মকার শিক্ষার্থী, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর