হিমিকা–১

অলঙ্করণ: মাসুক হেলাল

চৈত্রের বাতাস জানালা ভেদ করে সগৌরবে ফ্ল্যাটে ঢুকছে। হু হু করে শহরের ব্যস্ততা ছাপিয়ে অভিজাত আবাসিক এলাকার ১২তলার ফ্ল্যাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে নরম তুলতুলে বাতাস। এ বাতাসে একবার ডুব দিলে একজীবনের বেঁচে থাকার সাধ মিটে যায়। এরপর আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না। ভোরের বাতাসের পালে ভর করে নানান ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসা সময় যেন বন্দী করে রাখতে ইচ্ছা করে জীবনের করিডরে।

আজ তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেল হিমেল হাসনাইনের। এমনিতে একটু দেরি করে ঘুম ভাঙে তার। আবসরে যাওয়ার পর সবকিছু নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছে। আজ কেমন করে যেন জানালার পাশে বসে থাকা দোয়েলের ডাকে ঘুমের দেয়ালে একটা ছোট্ট টোকা পড়ল। সাথে সাথেই অসময়ে বাজ ভেঙে নিস্তব্ধতা হারিয়ে যাওয়ার মতো ঘুম উধাও হয়ে গেল তার। সুউচ্চ ভবনের ১২তলায় দোয়েলের আনাগোনা হওয়ার কথা নয়, তবে বারান্দায় লাগানো গন্ধরাজের টানে হয়তো পাখিগুলো এত উঁচুতে ছুটে আসে। আগে কয়েকটা চড়ুই এসে ভিড় জমাত, এখন আর তারা হুটহাট করে চলে আসে না। হয়তো আসে, হাসনাইন সেটা দেখতে পায় না। ভোরের পাখি কি আর রৌদ্রের সাথে পাল্লা দিয়ে দিনের আলোয় নাচানাচি করে?

আজকাল হাসনাইন অনেক কিছুই দেখতে পায় না। যা দেখা দরকার তা দেখে না, যেটা দেখার দরকার নেই, সেটা দেখার প্রশ্নই আসে না। জীবনে অনেক কিছুর প্রতি টান থাকা সত্ত্বেও এখন কোনো কিছুর প্রতিই তার কোনো টান নেই। কোনো ঘটনার অন্তরালের কাহিনি তার জানতে ইচ্ছা করে না। সবকিছুর ওপর দিয়ে ভাসা–ভাসা জীবন নিয়ে চলে যাচ্ছে সে। হাসনাইন হলো সাগরের বুকের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমান, যে কি না সাবমেরিনের মতো সাগরের তলদেশ ঘুরে আসার ইচ্ছা বা সামর্থ্য দেখাতে চায় না।

শরীরের অর্ধেকটা বিছানার ওপর আর বাকিটুকু কোমর থেকে পা পর্যন্ত বিছানা হতে নিচের দিকে ঝুলে আছে। বেড হতে নামবেন কি না, মাথা ঝুঁকিয়ে দুই হাতে ভর দিয়ে ভেবে দেখছেন। সারা রাতের লোকাল ট্রেনের মতো ঘুমের ক্লান্তি তাকে কিছুতেই ছাড়ছে না। আরেকটু ঘুম দিলে মন্দ লাগতে না, শরীরটা ঝরঝরে হয়ে যেত। তবে বাতাসের কোমল স্পর্শ, আর মিষ্টি ঘ্রাণ তাকে আর বিছানায় রাখতে পারছে না। অদৃশ্য এক ভালো লাগার মোহ বারবার বারান্দার দিকে তাকে ইশারায় ডাকছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই দোয়েল তার লেজ নাড়িয়ে ডেকে গেছে। যদিও এখন দোয়েলের ডাকেই তার ঘুম ভাঙল। এই মুহূর্তে অবশ্য দোয়েলকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ক্লান্ত হয়ে ফিরে গেছে আপন ঘরে। যেমন করে হিমিকা ফিরে গেছে। হিমিকা কি ক্লান্ত ছিল? এতটুকু বয়সে সে ক্লান্ত হবে কেন? কী ছিল তার অভিযোগ?

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

বারান্দার এক কোণে কিছু খড়কুটা পড়ে আছে, তার সাথেই লেগে রয়েছে পাখির পালক। দেখে মনে হয় ছোট্ট কোনো পাখির পালক। চড়ুই কিংবা বুলবুলি হবে হয়তো। দোয়েলের পালকও হতে পারে। নয়তো হিমিকার সেই কচি হাতের স্পর্শ লেগে রয়েছে এখানে ওখানে। হিমিকার ছোট্ট হাত ছুঁয়ে দিলেও এমন পালকের মতো অনুভব হতো।

হাসনাইন বিছানা হতে নেমে আস্তে আস্তে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। একটু ঝুঁকে পাখির পালকটা হাতে নিয়ে খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পালকের স্পর্শে হিমিকার তুলতুলে গালের পরশ পাচ্ছে সে। হঠাৎ দমকা বাতাসের তোড়ে হাত থেকে ফসকে বেরিয়ে গলে পালকটা, যেমন করে সময়ের কঠিন সিদ্ধান্তে হিমিকা ফসকে গিয়েছিল তার জীবন থেকে। বাতাস তার শরীর স্পর্শ করার সাথে সাথেই মনের ভেতর অজানা নদীর স্রোত বয়ে গেছে। শৈশবে ফেলে আসা সময়ের হাত ধরে কেটে যাওয়া স্মৃতি যেন হঠাৎ করে ধাক্কা দিয়ে গেল।

ধানের শিষে লেগে থাকা রেণু যেমন করে বাতাসের ঝাপটায় এদিক–ওদিক দোল খায়, ঠিক তেমনি হাসনাইন দোলছে সেই বাতাসের সাথে। শহরের ব্যস্ততার অবসরে ভোরের কোমল বাতাসের স্পর্শ পায়নি সে বহুদিন। আজ হঠাৎ কেন জানি পেছনে ফেলে আসা স্মৃতি বারবার তার মনের কোণে জায়গা করে নিতে চাচ্ছে। এর আগেও বহুবার স্মৃতির চৌকাঠ পেরোনোর ইচ্ছা হয়েছে, কিন্তু স্মৃতিকে আর ডাকা হয়নি। সে জানে, স্মৃতি শুধু বেদনা দিতে পারে, সুখের ঠিকানা তার কাছে একবারেই অজানা। সুখস্মৃতি বারবার আসে না কিন্তু দুঃখের স্মৃতি সুযোগ পেলেই হামলে পড়ে জীবনের ওপর; তখন জীবন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া হয়ে যায় কষ্টসাধ্য।

সুখস্মৃতি মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসে কিন্তু বেদনার মুহূর্তগুলো একবার এলে ফিরে যায় না কোনো দিনই।

অলংকরণ: আরাফাত করিম

বাতাসের কোলে মাথা রেখে রাতের ক্লান্তি ভুলে থাকার চেষ্টা করছে হাসনাইন। গ্রিল ধরে বাইরের তাকিয়ে শহরের আবহাওয়া আঁচ করার চেষ্টা করছে। আগে শহরের অলিগলি চষে বেড়ানো লোকটা এখন আর প্রয়োজন না হলে ঘরের বাইরে বের হয়ে না। কর্মজীবন হতে অবসর নেওয়ার পর এখন জীবন থেকে অবসর নেওয়ার কথা ভাবছে সে। সময় কেমন যেন, সবাইকে তার মতো করে পাল্টে ফেলে। যা একসময় খুবই আনন্দের হয়, সেটা সময় পাল্টে গেলে বিস্বাদে পরিণত হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না।

সুস্বাদু ফল পচে গেলে গন্ধ ছড়ায় আর স্মৃতির চিত্র পাল্টে গেলে আজীবন ভোগায়।

শহর ধোয়া বাতাসের গতিপথে আকাশছোঁয়া অট্টালিকার ভেতর কোনো এক ক্ষুদ্র ঘরে বসে থাকা জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া মানুষের খবর এ শহর রাখে না। এ শহরের মতো করে শহরের মানুষগুলোও কারও খবর রাখার প্রয়োজন মনে করে না। একসঙ্গে একই আলো–বাতাসে বেঁচে থেকেও যেন একবারেই অচেনা।

পূর্বাকাশে নরম রোদ হেসে উঠছে। সদ্য কিশোরীর ঠোঁটের কোণে গজিয়ে ওঠা হাসির মতো মুচকি একটা ভাব আকাশের শেষ মাথায় মৃদু দেখা যাচ্ছে। হাসনাইন আনমনেই সেই হাসির সাথে হালকা হাসির রেখা এঁকে দেয় তার ঠোঁটে। এই মুহূর্তে সে নিজেকে আরও বেশি হালকা মনে করছে, ঠিক যেন গ্যাস বেলুনের মতো উড়ছে। সে যে হাসতে জানে, সেটাই ভুলতে বসেছিল এত দিনে। রোদের সাথে হাসতে গিয়ে বুঝতে পারল তার হাসি এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

একদিন এই হাসির জন্যই হিমিকার মায়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল তার। হিমকিার মা মিতু এ হাসি দেখেই তাকে ভালোবেসেছিল। আর এ হাসি নিয়েই সে চলে গেছে দূরে। কেন চলে গেল? না গেলেই বা কী ক্ষতি ছিল, সেটা বলে যায়নি। হাসনাইনও জানতে চায়নি। জীবন এমনই, অনেক সময় জানতে চাওয়ার ইচ্ছাও নিভৃতে মরে যায়। কিছু বেদনা কাউকে বলা যায় না, কিছু উত্তর কখনো মুক্তি পায় না; কিছু ইচ্ছা কখনো জাগ্রত হয় না। মিতুকে ফেরানোর সময় অনেক কথা বলার ছিল কিন্তু বলতে পারেনি, সব কথা সব সময় বলা যায় না। বলতে গেলে আটকে যায় বুকের ওপর দিকে। সেই অসহ্য জ্বালা সারা জীবনেও নিচে নামে না, ওপর দিকেও উঠে এসে স্বস্তি দেয় না।

আচ্ছা, হঠাৎ কেন হিমিকার মায়ের কথা মনে পড়ল? তাহলে কি সে হিমিকার মায়ের কথা ভাবে এখনো! না, তার কথা ভাবার কোনো প্রশ্নই আসে না। যে চলে গেছে, সে চলে যাক। যে যেখানে থেকে শান্তি পায়, স্বস্তি পায়, সে সেখানে থাকুক। একেকজনের সুখ একেক রকমের, একেকজনের সুখ একেক বর্ণের, গন্ধের; কারও সাথে কারও কোনো মিল পাওয়া যায় না।

সময়ের হাত ধরে চলে যাওয়া পথে কখনো দ্বিতীয়বার হাঁটেনি হাসনাইন। যেই পথ তাকে রেখে চলে গেছে দূরে, সেই পথে কখনোই ফিরে আসেনি সে।

হিমিকার মা হাসনাইনের মতোই ছিল একরোখো। যেটা বলবে, সেটাই করবে। দীর্ঘদিন প্রেম করার সময় সেটা তার চোখে ধরা পড়েনি, মান-অভিমানের গল্প মনে করে শুধু লেখাগুলো পড়ে গেছে। হিমিকার মা-ও সেটা ধরতে পারেনি। প্রেমের অদৃশ্য দেয়াল প্রেমিক–প্রেমিকার দোষগুলো আড়াল করে শুধু মোহের দরজাগুলো খোলা রাখে। সেই দরজা দিয়ে কেবল ভোরের নরম রোদ আর কোমল বাতাস ঢুকতে পারে, দুপুরের বিষণ্নতা কখনো প্রবেশ করতে পারে না। চলবে...

**আগামীকাল পড়ুন ‘হিমিকা–২’

*লেখক: মফিজুল হক, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড, ঢাকা