সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতি জাতিসংঘের আহ্বান

পানিতে ডোবা প্রতিরোধে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে ১০টি দিকনির্দেশনা দিয়েছে জাতিসংঘ। নির্দেশনাগুলো হলো—
১. পানিতে ডোবা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নির্ধারণ করা।

২. জাতীয় স্বাস্থ্য পরিকল্পনা, নীতিমালা ও কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে পানিতে ডোবা প্রতিরোধ পরিকল্পনা তৈরি করা।

৩. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পানিতে ডোবা প্রতিরোধে কর্মসূচি গ্রহণ করা।

৪. স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন এবং দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের ক্ষেত্রে ‘পানির বিপদ থেকে সুরক্ষা’ আইনের বিধান রাখা ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং ইতিমধ্যে আইন না হয়ে থাকলে উপযুক্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়নকে বিবেচনায় নেওয়া।

৫. স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সব মৃত্যুনিবন্ধন নথিতে ‘পানিতে ডুবে মৃত্যু’কে আলাদাভাবে উল্লেখ করা এবং দেশের মোট মৃত্যু উল্লেখ করার সময় ‘পানিতে ডুবে মৃত্যু’কে আলাদাভাবে গণনা করা।

৬. পানিতে ডোবা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং মানুষের আচরণ পরিবর্তনের জন্য প্রচারণা পরিচালনা করা।

৭. আঞ্চলিক, দ্বিপক্ষীয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের সব দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস কর্মসূচিতে পানিতে ডোবা প্রতিরোধ কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করতে উৎসাহিত করা।

৮. পানিতে ডোবা কর্মসূচি বাস্তবায়ন থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী উদ্যোগগুলো দেশের অভ্যন্তরে ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে সমর্থন দেওয়া।

৯. পানিতে ডোবা প্রতিরোধবিষয়ক গবেষণায় উৎসাহ দেওয়া, উদ্ভাবনমূলক কর্মকাণ্ড ও প্রযুক্তির উন্নয়ন জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সদস্যরাষ্ট্র, বিশেষ করে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধির কাজকে উদ্বুদ্ধ করা।

১০. দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাঠ্যক্রমে পানির বিপদ থেকে সুরক্ষা, জীবন রক্ষায় সাঁতার শেখা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা।

জাতিসংঘের এসব নির্দেশনা মেনে এর মধ্যে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে পানিতে ডুবে যাওয়াকে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-৩ অর্জনের লক্ষ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যুকে অবশ্যই কমিয়ে আনতে হবে। আর এ জন্য জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নেরও কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। পানিতে ডুবা শিশুমৃত্যু রোধে ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং শিশুর সাঁতার সুবিধা প্রদান প্রকল্প’ নামে তিন বছর মেয়াদি (২০২২-২৪) প্রকল্প শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে শিশু একাডেমি। এই প্রকল্পের অধীন শিশুদের জীবন রক্ষার্থে সাঁতার শেখানো কার্যক্রমে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ, সিআইপিআরবি। পানিতে ডোবা প্রতিরোধে এমন পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে বাংলাদেশ।

পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে বাংলাদেশের মাইলফলক

পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে ২০০৫ সাল থেকেই কাজ করছে বাংলাদেশ। সেই বছর প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে নামক গবেষণা প্রতিবদনে’ পানিতে ডুবে মৃত্যুকে শিশুমৃত্যুর (১ থেকে ১৭ বছর) প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে (PRICISE) প্রজেক্টের গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে দুটি কার্যকর পদক্ষেপ চিহ্নিত করা হয়—সমাজভিত্তিক শিশুযত্ন কেন্দ্র ও জীবন রক্ষার্থে সাঁতার প্রশিক্ষণ। ২০১৫ সালে আরও একটি গবেষণা পরিচালিত হয়, যার নাম–SOLID। এই ইভাল্যুয়েশন রিপোর্ট অনুযায়ী, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে ‘সমাজভিত্তিক শিশুযত্ন কেন্দ্রের কার্যকারিতা আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়।

পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর উপায়

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে যে তিনটি উদ্যোগ কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে, তার একটি হলো—সমাজভিত্তিক শিশুযত্ন কেন্দ্র। এই শিশুযত্ন কেন্দ্র তৈরি হয়েছে প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুদের নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে। সমাজভিত্তিক শিশুযত্ন কেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ১ থেকে ৫ বছর বয়সী ২০ থেকে ২৫ শিশুকে দেখাশোনা করা হয়। এ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য নিয়োজিত থাকেন একজন অভিজ্ঞ তত্ত্বাবধানকারী ও তাঁর সহকারী। এখানে শিশুদের পানিতে ডোবা থেকে নিরাপদ রাখার পাশাপাশি তাদের শৈশবকালীন প্রারম্ভিক বিকাশ নিশ্চিত করা হয়।

দ্বিতীয়ত, যে উদ্যোগ পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুকে কমিয়ে আনতে পারে, তা হলো জীবন রক্ষার্থে সাঁতারের প্রশিক্ষণ। এ কার্যক্রমে ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রশিক্ষিত সাঁতার প্রশিক্ষকের মাধ্যমে সাঁতার শেখানো হয়। এর পাশাপাশি কেউ ডুবে গেলে তাকে কীভাবে উদ্ধার করা যাবে, তার কৌশল শেখানো হয়। সাঁতার শেখানোর কার্যক্রমের আওতায় স্থানীয় পুকুরে বাঁশের তৈরি একটি বিশেষ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করে শিশুদের পানিতে ভেসে থাকতে পারা, সাঁতার কাটা এবং কেউ পানিতে পড়ে গেলে ডাঙায় দাঁড়িয়ে থেকে তাকে উদ্ধার করাসহ ২১টি কৌশল সম্পর্কে ব্যবহারিক শিক্ষা দেওয়া হয়।
তৃতীয় উদ্যোগ হলো—সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া। পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের পর তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য স্থানীয় লোকজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যাতে তারা যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে প্রয়োজনে ‘রক্ত সঞ্চালন ও শ্বাসপ্রশ্বাস পুনরুদ্ধার বা স্বাভাবিক করার পদ্ধতি—কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) প্রয়োগ করার দক্ষতা অর্জন করতে পারে। পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের পর তার মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস করাই এই প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য।

জাতিসংঘের নির্দেশনা মেনে স্থানীয় পর্যায়ে নেওয়া উদ্যোগগুলো যদি সফল করা যায়, তাহলে দেশব্যাপী পানিতে ডুবে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য দরকার সমন্বিত প্রচেষ্টা। একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করে আমরা দেশের মানুষকে পানিতে ডোবা মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারি। তাহলে প্রতিটি শিশু স্বমহিমায় বিকশিত হয়ে দেশের উন্নতিতে অবদান রাখতে পারে।

  • লেখক: নাহিদ আখতার, ম্যানেজার, কমিউনিকেশনস, সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)।

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন