নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শিশিরে জমা শৈশব
নভেম্বর প্রায় শেষ হয়ে এল।
আগে নভেম্বর এলে ক্যালেন্ডারে ছক কেটে রাখতাম। ভাবতাম, বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে গেলে আমি আমার গল্পের বইগুলো আবার পড়তে পারব। তখন আমার বই ছিল কম। একেবারে হাতে গোনা কয়েকটা মাত্র।
‘ঠাকুরমার ঝুলি’, ‘আম আর্টির ভেঁপু’, ‘হার্ভার্ড phd বল্টু ভাই’, ‘হুমায়ূন আহমেদ’ ও সুকুমার রায়ের বই, ১০০ ভূতের গল্প, শ্রেষ্ঠ ভূতের গল্প, রাক্ষস-খোক্ষসের গল্প, শেক্সপিয়ার সমগ্র, বিভূতিভূষণ সমগ্র, সায়েন্স ফিকশন সমগ্র, রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দাসহ আরও কিছু টুকটাক বই। ক্লাস এইট অবধি এই বইগুলো আমি কতবার পড়ে শেষ করেছি, তার কোনো হিসাব নেই।
আমার বিছানার পাশেই ছিলো দুই পাল্লার কাঠের জানালা। আমাদের ঘর টিনশেডের হওয়ায় জানালার ফোকর ভেদ করে শীতের রোদের মিষ্টি আলো জমা হতো। অনেকটা ছাঁকনি দিয়ে রোদ আসার মতোন। সেই মিষ্টিরোদের আলোখেলার মাঝে এই বইগুলো নিয়ে সময় কাটাতে আমার ভীষণ ভালো লাগত। আর পরীক্ষা শেষ হলে তো কোনো বারণ ছিল না। যদিও এই সেই বৃত্তি পরীক্ষার জন্য পড়তে হতো বা আম্মু হয়তো পরের ক্লাসের গণিত-বিজ্ঞান আগেভাগেই এনে রাখতেন। তবু কড়াকড়ি কমে যেত।
মনে পড়ে, শৈশবের সেই সোনালি সময়টার কথা। যখন সঙ্গে ছিল আমাদের রঙিন নভেম্বর ও ডিসেম্বর। এই মাস দুটো পাওয়ার আশায় আমাদের অপেক্ষা করতে হতো সুদীর্ঘ ১০ মাস। বার্ষিক পরীক্ষার শেষ দিন আমরা ছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। ছিল না কোনো জীবনের চাওয়া, না পাওয়ার হিসাব কিংবা ছিল না কোনো পিছুটান। দুরন্তপনায় ছুটতাম ডিসেম্বরের শেষের দিনগুলো। হিসাব ছিল একটাই, বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট আর ১ জানুয়ারির নতুন বইয়ের ছোঁয়া ও সুগন্ধ পাওয়ার।
পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরতেই দৌড় দিতাম খেলার মাঠে। কোদাল, পিঁড়ি, কাস্তে নিয়ে ফসল কাটা খেতে ক্রিকেটের উইকেট বানাতাম। সবার কাছ থেকে চাঁদা তুলে বল আর স্কচটেপ কিনতাম। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা, খেলার মধ্যেই ডুবে থাকতাম। কখনো ভাত খেতে দুপুরে বাড়িতে যাওয়া হতো, কখনো যাওয়া হতো না। মা একটু বকুনি দিলেও ছিল না বছরের অন্য সময়ের মতো পীড়াপীড়ি।
সন্ধ্যার পর আবার আমরা বেরিয়ে পড়তাম। রাতের তীব্র শীতে আগুনের পাশে বসে মা-চাচিদের ধান সেদ্ধ করতে দেখা এক অন্য রকম অনুভূতি। খড়ের স্তূপের মধ্যে মধ্যে লুকোচুরি খেলা, আবার কখনো কখনো কম্বলের নিচে লুকিয়ে গল্পের বই পড়া ছিল আমাদের নিত্য অপরিহার্য কাজ। আবার কখনো খড় জ্বালিয়ে আগুন পোহানো। সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যাডমিন্টন, গোল্লাছুট খেলে ঘরে ফেরা, একটু দেরি হলে বকুনি শোনা তো আছেই।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
আমাদের সেই ডিসেম্বরের দিনগুলো এখন হারিয়ে গেছে। এখন ডিসেম্বরেও ক্লাস থাকে, পরীক্ষা থাকে। থাকে অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশনের ডেডলাইন। জীবনের প্রয়োজনে ব্যস্ত হয়েছে সবাই। এখন আমাদের ডিসেম্বরের সকালগুলো কাটে আলসে ঘুমে, ক্লাসে অথবা অফিসের ঝিমুনিতে। এখন আর ঘুম থেকে উঠে আমরা আম্মুর হাতের শীতকালীন পিঠা খেতে পারি না। বিকেলগুলোয় আমরা আগের মতো মাঠে যেতে পারি না, যেতে হয় টিউশনিতে। সন্ধ্যা পেরিয়ে গোটা রাত আমরা চারদেয়ালের মধ্যে কাটিয়ে দিই। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা, ছুটছি তো ছুটছিই।
সময়ের পরিক্রমায় পার হয়ে গেছে আমাদের শৈশব। ব্যস্ততা বেড়েছে সবার। গ্রাম এখন নগরায়ণ হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে সবখানে। হারিয়ে গেছে সেই শৈশব। হারিয়ে গেছে সেই নভেম্বর ডিসেম্বরের দিনগুলো!
হয়তো কেউ কোনো একদিন কাজের ব্যস্ততার ফাঁকে নভেম্বর বা ডিসেম্বরের কোনো এক বিকেলে অফিস কিংবা হলের বারান্দায় বসে কফির কাপে চুমুক অবস্থায় লেখাটি পড়তে পড়তে হারিয়ে যাবে তার সেই ছেলেবেলায়। সেই হারিয়ে যাওয়া দুরন্ত শৈশবে। যে শৈশব জমা আছে সবুজ পাতার শিশিরে।
লেখক: মোহাম্মদ মাহাদী, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা