ভর্তি পরীক্ষায় এআই নকল: মেধা যাচাই কি ভেঙে পড়ছে
স্মার্ট বাংলাদেশের কথা যখন চিন্তা করা হয়, তখন অটোমেটিক এর সঙ্গে চলে আসে প্রযুক্তি। একটি দেশে যত উন্নত প্রযুক্তি আছে, সেই দেশ তত উন্নত বলে ধরে নেওয়া হয়। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করে তুলেছে বলে বিশ্বাস করা হয়। কিন্তু প্রযুক্তি কি সত্যিই সব সময় কল্যাণ নিয়ে আসে?
বর্তমানে বহুল প্রচলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), যা শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষের কাজ সহজ করে তুলেছে। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইয়ের সাহায্যে যেকোনো তথ্য বা কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে তা কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই উত্তর চলে আসে। শিক্ষা, চিকিৎসা, গবেষণা ও শিল্প—সবখানেই এআই সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই প্রযুক্তি তৈরি করছে নতুন সংকটও। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এআই ব্যবহার করে অভিযোগ সেই সংকটকে সামনে দিয়েছে সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায়—মেধা যাচাইয়ের ব্যবস্থায়।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা শুধু একটি পরীক্ষা নয়, এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। তাঁরা তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যান শুধু একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট পাওয়ার আশায়। ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীর যোগ্যতা, পরিশ্রম ও সক্ষমতা যাচাইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু যদি পরীক্ষার্থী সরাসরি এআইয়ের সাহায্যে উত্তর তৈরি করতে পারেন, তবে সেই পরীক্ষার ফল আর মেধার প্রতিফলন কোথায় থাকে? এআইয়ের সাহায্যে যে পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়ে চান্স পাচ্ছেন, তাঁদের মেধা বা যোগ্যতা কি সত্যিই আছে? এখানে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন একজন সৎ ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। তিনি প্রযুক্তিগত সুবিধা বা অসাধু উপায় বেছে নেন না।
সমস্যাটি শুধু নকলের নয়; বরং নকলের ধরন বদলে যাওয়ার। আগে নকল ধরা যেত চোখে বা হাতে আর এখন তা লুকিয়ে থাকে স্মার্ট ডিভাইস, অ্যাপ বা ডিজিটাল সহায়তার আড়ালে। রাবি, জাবি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এআইয়ের সাহায্যে পরীক্ষা দেওয়ার সময় আটক করা হয় বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের সি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় এক পরীক্ষার্থী মুঠোফোনে ডিপসিক নামের এআই অ্যাপ ব্যবহার করে উত্তর খুঁজে নেওয়ার সময় ধরা পড়েন। আবার একই পরীক্ষায় আরও এক পরীক্ষার্থী এআইয়ের মাধ্যমে নকলের চেষ্টায় পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। যাঁরা নিজের মেধা ও প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে পরীক্ষায় বসেন, তাঁরা এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। প্রযুক্তিগত সুবিধা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা অসাধু মানসিকতা যাঁদের আছে, তাঁরা এগিয়ে যাচ্ছেন। এতে শিক্ষাব্যবস্থার ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
নাগরিক সংবাদ, জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
আইনের দিক থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট নয়। অধিকাংশ শিক্ষা আইন ও পরীক্ষার বিধিমালায় এআই ব্যবহার করে নকলের এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা নেই। ফলে শাস্তি, দায় ও প্রমাণের দিক দিয়ে জটিলতা দেখা দেয়।
তবে এটাও সত্য যে এআইকে পুরোপুরি শত্রু হিসেবে দেখলে চলবে না। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করতে পারে। প্রশ্ন হলো, এআইকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করছি এবং কোন উদ্দেশ্যে। এখানে নৈতিকতার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এআই নিজে কোনো অপরাধী নয়, অপরাধ হলো এর অপব্যবহার। আজ যে শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় নকল করছেন, কাল তিনি পেশাগত জীবনেও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহার হতে পারে প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনা, নজরদারি, বিশ্লেষণ ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য, নকল করার জন্য নয়। এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি জরুরি বিষয় আছে। প্রথমত, ভর্তি পরীক্ষার নিয়ম ও নীতিমালায় এআই ব্যবহারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত নজরদারির ব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও সততার গুরুত্ব জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।
আমরা কি প্রযুক্তিনির্ভর সুবিধার আড়ালে মেধাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে পড়তে দেব, নাকি সময়মতো ব্যবস্থা নিয়ে তাকে রক্ষা করব? এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মান, মূল্যবোধ ও নেতৃত্ব। প্রযুক্তিকে থামানো যাবে না, থামানো উচিতও নয়। কিন্তু প্রযুক্তি যদি মেধার জায়গা দখল করে নেয়, তবে শিক্ষার ভিত্তিই নড়ে যাবে। তাই প্রশ্ন শুধু নকলের নয়; প্রশ্ন এখানে, আমরা কোন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চাই।
*লেখক: মানছুরা সুলতানা লিয়া, শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়