মাটি ও মানুষের কাছে গিয়ে ছাপচিত্রচর্চা

ইংরেজি শব্দ ‘প্রিন্টমেকিং’। যাকে বাংলায় বলা হয় ‘ছাপচিত্র’। যে মাধ্যমে একজন শিল্পী তাঁর কল্পনাকে কাঠ, ধাতব প্লেট, পাথর বা পিভিসি বোর্ডজাতীয় কোনো ব্লকের মাধ্যমে কাগজ, কাপড় কিংবা অন্য কোনো পরিতলে ছাপাই করেন। ছবি আঁকার অন্যতম এই শিল্পমাধ্যমটি চিত্রশিল্পীদের কাছে খুবই পরিচিত। আর এই শব্দটি কানে এলেই শিল্পীদের কল্পনায় যেন ভেসে ওঠে স্টুডিও এবং প্রিন্ট মেশিনের মতো বিষয়গুলো।

স্টুডিও কিংবা শ্রেণিকক্ষের চারদেয়ালের বাইরেও যে ছাপচিত্র নিয়ে কাজ করা সম্ভব, সেটি কয়েক বছর আগেও হয়তো বাংলাদেশের ছাপচিত্রশিল্পীদের কাছে ছিল অসম্ভব কিছু। কারণ, ছাপাই ছবির জন্য প্রথমেই লাগবে একটি প্রিন্ট মেশিন, যার ওজন বেশ। যেখানে-সেখানে বয়ে নিয়ে বেড়ানো একপ্রকার অসম্ভব। তাই ছাপচিত্রমাধ্যমটিই যেন হয়ে গিয়েছিল স্টুডিও কিংবা শ্রেণিকক্ষনির্ভর।

কিন্তু এই অসম্ভব বিষয়টি গত ছয় বছরে অনেকটাই সম্ভব হয়ে গেছে। তিন বছর আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে রাজশাহীর কাকনহাটের আদিবাসীদের এলাকাতেই একদল ছাপচিত্রশিল্পী এই মাধ্যমটির চর্চা করেছেন। কাকনহাট এলাকার রিসিকুল ইউনিয়নের আদারপাড়া গ্রামের পাশেই একটি বিস্তৃত মাঠে তাঁবু টানিয়ে এক আর্ট ক্যাম্পে দুদিনব্যাপী এই মাধ্যমের চর্চা করেন ছাপচিত্রশিল্পীরা।

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

বিস্তৃত সেই মাঠের একপাশে ছিল সাপের মতো আঁকাবাঁকা মেঠো পথ। পথের দুই পাশে একতলা-দোতলা মাটির বাড়ি। মাঝেধ্যেই দেখা যায় মাচায় ঝুলছে লাউ-কুমড়া। গরু-ছাগল নিয়ে যাচ্ছেন আদিবাসীরা। অনেকে করছেন গৃহস্থালির কাজ। আবার মাঠের একপাশে দেখা যায় উঁচু-নিচু ঢেউখেলানো বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। মাঠে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শর্ষেখেত। দূরে দেখা যায় সারি সারি খেজুর ও তালগাছ। পুরো একটা গ্রামীণ আবহ।

স্টুডিও ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে এসব দৃশ্য শিল্পীদের কাছে যেমন ভালো লাগার তেমনই দৃশ্যগুলো তাঁদের চিত্রকর্মের বিষয়বস্তুও বটে। কারণ, শিল্পীরা সচরাচর তাঁদের ভালো লাগাগুলোই তাঁদের চিত্রকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন। এই আর্ট ক্যাম্পেও ঠিক তেমনটিই ঘটেছিল। এখানে অংশ নেওয়া ঢাকা, রাজশাহী, জগন্নাথ, খুলনাসহ বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপচিত্র বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চিত্রকর্মের মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্ন দৃশ্যই কিন্তু ফুটে উঠেছিল। যেখানে স্থান পেয়েছিল বরেন্দ্র অঞ্চলের গ্রামীণ প্রকৃতির বিভিন্ন দৃশ্য। যেমন শর্ষেখেতের মাঠ, মাটির দোতলা ঘর, সূর্যের রশ্মি, মাটির দরজা, তালগাছের ছবি, পোড়া মাটির ছবি, লাউলতা, কুমড়া ফুল প্রভৃতি।

আদিম মানুষের গুহাচিত্র থেকে উৎপত্তি পাওয়া এই ছাপচিত্রমাধ্যমটির প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা যে বাংলাদেশেও হয় এটা প্রান্তিক মানুষ খুব কম পরিসরেই জানেন। মানুষ শুধু চিত্রকর্ম বলতে চিত্রকলা সম্পর্কেই বোঝেন। তবে কয়েক বছর ধরে ছাপচিত্রমাধ্যমটি মাটি ও মানুষের সংস্পর্শে আসায় এর পরিধি বাড়ছে। মানুষ এটাকেও জানতে পারছেন। আর জানার সুযোগটি যেই প্রতিষ্ঠান করে দিচ্ছে, সেটি হলো মজুমদারস প্রিন্ট ল্যান্ড।

মজুমদারস প্রিন্ট ল্যান্ড হচ্ছে ঢাকার একটি অলাভজনক ছাপচিত্র স্টুডিও। তারা ২০২১ সালে দেশে প্রথম আউটডোর প্রিন্টমেকিং ক্যাম্পের আয়োজন করে। ২০২২ সালে ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে অনেকটা ব্যক্তি উদ্যোগে এ ক্যাম্পের আয়োজন করে স্টুডিওটি। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে রাজশাহীর কাকনহাটে, ২০২৪ সালে খুলনায় এবং ২০২৫ সালে নারায়ণগঞ্জে আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন করে মজুমদারস প্রিন্ট ল্যান্ড।

তুলনামূলক কম ওজনের একটি ছোট প্রিন্ট মেশিন দিয়ে মজুমদারস প্রিন্ট ল্যান্ড প্রতিবছর এই ক্যাম্পের আয়োজন করে। এতে পুরো ছাপচিত্রমাধ্যমটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে তারা। যার প্রথম সুবিধা হলো সারা দেশের ছাপচিত্রশিল্পীরা এই ক্যাম্পে অংশ নিতে পারেন। এতে তাঁদের নিজেদের একে অপরকে জানাশোনা হয়, নেটওয়ার্কিং বাড়ে। অন্যদিকে ছাপচিত্রমাধ্যমটিরও প্রসার ঘটে। স্টুডিও ও শ্রেণিকক্ষের বাইরেও একজন প্রান্তিক এলাকার মানুষও এই মাধ্যমটি সম্পর্কে ধারণা পান। শিল্পীরাও পান খোলা পরিবেশে ছাপচিত্র নিয়ে কাজ করার এক ভিন্ন স্বাদ।

লেখক: লাবু হক, স্নাতকোত্তর, শিক্ষার্থী, চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়