মাইলোড়া মাঠ: অবহেলা থেকে জেগে ওঠা এক জনপদের ক্রীড়া–স্বপ্ন

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার মাইলোড়া মাঠ একসময় ছিল এই জনপদের ক্রীড়াচর্চার প্রাণকেন্দ্র। বিকেলের পড়ন্ত রোদ নামার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের গ্রামগুলো থেকে ছুটে আসতেন কিশোর–তরুণেরা। কোথাও ফুটবলের তীব্র লড়াই, কোথাও ক্রিকেটের ব্যাট–বলের শব্দ—সব মিলিয়ে মাঠজুড়ে থাকত উৎসবের আমেজ। গ্যালারি বা আধুনিক সুযোগ–সুবিধা না থাকলেও দর্শকের উচ্ছ্বাসে কখনো ভাটা পড়েনি। এই মাঠেই অনুশীলন করে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সাফল্য এনে দিয়েছে মেয়েদের ফুটবল দল। এখান থেকেই উঠে এসেছে স্থানীয় পর্যায়ের অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়।

গ্রামের মানুষের কাছে মাঠটি ছিল শুধু খেলাধুলার জায়গা নয়, এটি ছিল সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র ও নতুন প্রজন্মকে সুস্থ বিনোদনের দিকে টেনে নেওয়ার এক অনন্য মাধ্যম। স্কুল ছুটির পর কিশোরদের দৌড়ঝাঁপ, বড়দের আড্ডা, টুর্নামেন্ট ঘিরে উৎসব—সব মিলিয়ে মাঠটি ছিল জনজীবনের অংশ।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রাণচাঞ্চল্য ম্লান হয়ে যায়। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে মাঠের জমি অসমতল হয়ে পড়ে, কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়। বর্ষা এলেই জমে থাকত হাঁটুসমান পানি। ঘাসের পরিবর্তে জন্ম নেয় আগাছা, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে অপরিচর্যার চিহ্ন। খেলোয়াড়দের জন্য নিয়মিত অনুশীলন হয়ে ওঠে কঠিন, কখনো ঝুঁকিপূর্ণও।

স্থানীয় অনেকেই জানান, একসময় যেখানে প্রতিদিন বিকেলে খেলার শব্দ শোনা যেত, সেখানে ধীরে ধীরে নেমে আসে নীরবতা। প্রতিভাবান অনেক তরুণ–তরুণী অনুশীলনের সুযোগ না পেয়ে খেলাধুলা ছেড়ে দেন বা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। একটি মাঠের অবহেলা যে একটি জনপদের ক্রীড়া সংস্কৃতিকেই থামিয়ে দিতে পারে, মাইলোড়া তারই বাস্তব উদাহরণ।

নাগরিক সংবাদ–এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে বদলের হাওয়া লাগে এই মাঠে। স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিত মুখ, ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠক তামিম আহমেদের উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাঠটির দুরবস্থা তুলে ধরে তিনি প্রশাসনের কাছে বারবার আবেদন জানান। তাঁর সেই আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে বিষয়টি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা খাতুন মাঠ সংস্কারের উদ্যোগ নিলে নতুন করে আশার আলো জ্বলে ওঠে। শুরু হয় জমি সমতল করার কাজ, জলাবদ্ধতা নিরসনের পরিকল্পনা ও খেলার উপযোগী পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ। কাজ শুরু হতেই মাঠে ফিরতে থাকে পুরোনো দৃশ্য—আবার দেখা যায় বল পায়ে ছুটে চলা কিশোর, নেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত ক্রিকেটার, দলগত অনুশীলনে মেয়েরা।

স্থানীয় খেলোয়াড়দের ভাষায়, ‘মাঠটি শুধু ঠিক হচ্ছে না, আমাদের স্বপ্নগুলোও আবার জেগে উঠছে।’

উপজেলা প্রশাসনও খেলাধুলাকে সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখছে। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তরুণদের মাঠমুখী করার বিকল্প নেই, এমন বার্তাও দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

গ্রামীণ জনপদে একটি খেলার মাঠের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। এটি যেমন শরীরচর্চার জায়গা, তেমনি সামাজিক সম্প্রীতির কেন্দ্র। টুর্নামেন্ট ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতি সচল হয়, তৈরি হয় নতুন নেতৃত্ব, গড়ে ওঠে দলগত চেতনা। বিশেষ করে মেয়েদের খেলাধুলার জন্য নিরাপদ ও নিয়মিত অনুশীলনের জায়গা থাকা সামাজিক অগ্রগতিরও একটি সূচক।

ক্রীড়া সংগঠকেরা বলছেন, অবকাঠামোগত সুযোগ–সুবিধা পেলে মফস্‌সলের এই মাঠগুলো থেকেই জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরি হওয়া সম্ভব। কারণ, গ্রামবাংলার প্রতিভা কখনোই কম নয়; প্রয়োজন শুধু পরিচর্যা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ।

মাইলোড়া মাঠকে ঘিরে এখন নতুন স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয় লোকজন। তাঁদের প্রত্যাশা, এটি শুধু একটি সংস্কার করা মাঠ হয়ে থাকবে না, ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে একটি পূর্ণাঙ্গ স্পোর্টস কমপ্লেক্স।

খেলোয়াড়দের চাওয়া, সারা বছর অনুশীলনের উপযোগী মানসম্মত মাঠ, আধুনিক প্রশিক্ষণের সুবিধা, মাঠসংলগ্ন ডরমিটরি, যাতে দূরদূরান্ত থেকে আসা খেলোয়াড়েরা থাকতে পারেন, বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা।

পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে এই মাঠ শুধু মোহনগঞ্জ নয়, পুরো নেত্রকোনার ক্রীড়া বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একটি দেশ বা জাতিকে এগিয়ে নিতে খেলাধুলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। এটি শুধু বিনোদন নয়, এটি চরিত্র গঠন করে, শৃঙ্খলা শেখায়, নেতৃত্ব তৈরি করে, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং তরুণদের বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করে। একটি সক্রিয় মাঠ মানে, একটি জীবন্ত সমাজ।

মাইলোড়া মাঠ তাই এখন আর কেবল একটি মাঠের গল্প নয়, এটি অবহেলা পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প এবং একটি জনপদের সম্মিলিত স্বপ্নের গল্প। সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত পরিচর্যা ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে এই মাঠই হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের ক্রীড়া–আশ্রয়, যেখানে আবার বিকেলের আলো নামবে, আর শুরু হবে নতুন প্রজন্মের দৌড়।

*লেখক: তামিম আহমেদ, প্যারা অ্যাথলেট ও ক্রীড়া সংগঠক