দুর্গোৎসবের আবাহনে শরৎ, স্মৃতির অলিন্দে চরনারচর
কল্পনাবিলাসী মন কখন যে পুজোর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে অচেনা এক গন্তব্যের পথে পা বাড়ায়, কিংবা মনের অগোচরে ভেসে বেড়ানো ছন্দময়তার কাব্যিক ধারা কখন যে বাস্তবের স্পর্শ পেতে চায়, তা বোধ হয় মন নিজেও জানে না। শরতের আগমনী বার্তা আমাকে বরাবরই একটু বেশি স্নাত করে। শরতের আকাশ, বাতাসের মৃদুমন্দ দোলা, কাশফুলের শুভ্রতা আর শিউলির গন্ধে মিশে থাকে এক অনির্বচনীয় আকুলতা, যেন প্রকৃতি নিজেই তার সব স্নিগ্ধতা উজাড় করে দিয়ে মনকে কোথাও হারিয়ে যেতে আহ্বান জানায়।
১. পুজোর আমন্ত্রণে, অচেনা পথের হাতছানি
বছর কয়েক আগে, শারদপ্রাতে দুর্গাপূজার আমন্ত্রণে চরনারচরে (সুনামগঞ্জ) যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। মুড়ির টিন বাসের দেখা না মিললেও যে গাড়িগুলোর দেখা পেলাম, তাতে মনে হয়েছিল পঞ্চাশ-ষাট বছরের পুরোনো কোনো যানবাহনের স্মৃতিচিহ্নে চড়ে বসেছি। এক-দেড় ঘণ্টার নিরস ভ্রমণ নয়, টানা তিন-চার ঘণ্টার যাত্রা ক্লান্তির একঘেয়েমিতে আচ্ছন্ন করে তুলেছিল।
২. পথের ক্লান্তি, নদীর মায়া
সেখানে প্রকৃতি যেন ক্লান্ত পথের শেষে বিস্ময় জমিয়ে রেখেছিল। দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের মৃদু আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি, ধূপের ধোঁয়া, পূজামণ্ডপ আর সন্ধ্যার আরতির আলোয় জেগে ওঠা দেবীমূর্তির মুখ—সবকিছু মিলিয়ে শরৎ যেন তার নিজস্ব ভাষায় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা শোনায়। সেই বার্তার মধ্যে যেমন ছিল ভক্তির নিবিড় আবেশ, তেমনই ছিল আনন্দ, মিলন আর অচেনা কোনো মায়ায় জড়িয়ে পড়ার আকর্ষণ। অথচ মণ্ডপের কোলাহল পেরিয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়ালেই ছিল অন্য এক জগৎ—নীরব, নিস্তব্ধ অথচ অপার মায়ায় পূর্ণ। একদিকে উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য, অন্যদিকে নদীর নীরবতা; এই দুই বিপরীত আবহের মেলবন্ধনেই চরনারচরে পূজার দিনগুলো আমার কাছে অনন্য হয়ে উঠেছিল।
৩. নৌকাভ্রমণ, জোছনা আর যাত্রাপালা
নদীর বুকে ভেসে চলার মধ্যে মুক্তি মেলে। তাই চাঁদনি রাতে নৌকায় ঘুরে বেড়ানো কিংবা রাত জেগে যাত্রাপালা দেখতে যাওয়ার দিনগুলো ছিল এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। সেখানে সুয়োরানি আর দুয়োরানির গল্প, পরিচিত সংলাপের পুনরাবৃত্তি, দীর্ঘ অভিনয়ের পরম্পরা, যার নিজস্ব এক ভাষা আছে এবং যা কেবল অনুভবের মধ্য দিয়েই বোঝা যায়! নদীর বুকে রাতের ভ্রমণ, নৌকার দুলুনি, অন্ধকারে ছুটে চলা, আর পরিচিত মানুষগুলোর সান্নিধ্য—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটুকু আমার স্মৃতির পাতায় আলাদা হয়ে রইল।
৪. পাঁচ দিনের মায়া, কিছু মানুষের আপনত্ব
কোনো ভ্রমণের সৌন্দর্য কেবল গন্তব্যের দৃশ্যপটে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার প্রকৃত পূর্ণতা আসে সেই পথের সঙ্গীদের কাছ থেকে। চরনারচরের এই যাত্রাও আমার কাছে তেমনই এক অভিজ্ঞতা। আমরা যাঁরা একসঙ্গে পথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছেছিলাম, তাঁদের প্রত্যেকের উপস্থিতি এই ভ্রমণের স্মৃতিতে আলাদা আলাদা রং মিশিয়ে দিয়েছিল। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি, চলার পথে কথাবার্তা, পূজার আনন্দ ভাগ করে নেওয়া—সবকিছুর মধ্যেই যেন তৈরি হয়েছিল এক আত্মিক বন্ধন।
৫. মাসিমা ও শাশুড়ি মহাশয়া—স্নেহের চিরন্তন আশ্রয়
পূজায় শত ব্যস্ততার মাঝেও শতভাগ সাদাসিধে এই মানুষগুলোর স্নেহময় উপস্থিতি যেন গোটা বাড়িটাকেই এক মায়ার আবরণে জড়িয়ে রেখেছিল। বয়সের ভার স্পর্শ করলেও স্নেহের স্বতঃস্ফূর্ততা একটুও ম্লান হয়নি। তাঁদের আচরণে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা, ছিল না আপন করে নেওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন; ছিল অকৃত্রিম মমতা। মাসিমা ও শাশুড়ি মহাশয়া যেন সেই সহজ, নির্মল ভালোবাসারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
৬. শ্বশুর মহাশয় ও বড়দাদা—গাম্ভীর্যের আড়ালে এক হাসিখুশি মন
শ্বশুর মহাশয় ও বাড়ির বড়দাদা (দীপক রঞ্জন রায়)—প্রথম দেখায় যাঁদেরকে খানিকটা ভাবুক কিংবা গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ বলে মনে হতে পারে, অন্তরঙ্গতার পরতে পরতে তাঁরা যেন অন্য এক মানুষ। তাঁদের হাসিখুশি স্বভাব, আন্তরিকতা আর মানুষকে আনন্দ দেওয়ার প্রবণতা মনকে জয় করে নেয়। অন্যের আনন্দকে নিজের আনন্দের অংশ করে নেওয়ার এই গুণটি সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁরা তেমনই সহজ, প্রাণবন্ত, আন্তরিক এবং নিঃসন্দেহে অসাধারণ।
৭. ছোটদাদা—পূজার নিবেদনে, ব্যক্তিত্বের নিজস্বতায়
ছোটদাদা, দীপন রায়—যাঁকে দেখলে অনেকটা দাদা ঠাকুরের কথা মনে পড়ে। সারাক্ষণ পূজার কাজে নিবিষ্ট থাকা তাঁর উপস্থিতিতে ছিল একধরনের স্বতন্ত্র গাম্ভীর্য। ধুতি পরার ভঙ্গি, পাঞ্জাবির আভিজাত্য তাঁর সামগ্রিক ব্যক্তিত্বে এমন একটি আবহ তৈরি হতো, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দিত। তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল, গলায় পৈতেটুকু থাকলেই যেন পুরোহিতসুলভ পূর্ণতাটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত। কারণ, পূজার প্রধান আবহ সৃষ্টির মধ্যে আমি তাঁর মধ্যেই খুঁজে পাই।
৮. দিদি ও মুক্তদিদি—যত্নের আড়ালে ভালোবাসার সংসার
সুমি রায় চৌধুরী, অর্থাৎ আমাদের দিদির কথা না বললে এই স্মৃতিচারণা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সবাইকে নিয়ে ভাবার এবং আপনজনদের ভালো রাখার এক সহজাত প্রবণতা যেন তাঁর সঙ্গে মিশে আছে। যেখানে শুধু একটি বাড়ির আতিথেয়তা থাকে না; থাকে আপন হয়ে ওঠার উষ্ণতা, পরিচিত মুখগুলোর সান্নিধ্য আর আন্তরিকতার এক অনাড়ম্বর আবহ।
আর মুক্তদিদি! দেখাশোনা থেকে শুরু করে খাবারের আয়োজন সবকিছু নিয়েই তিনি যেন ব্যস্ততার মধ্যে ডুবে ছিলেন। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা না থাকলে হয়তো এত সুন্দর খাবারের আয়োজন, আর এতটা আপন করে নেওয়ার অভিজ্ঞতা পেতাম না।
৯. আনন্দের দুরন্ত অনুষঙ্গ
আমাদের সঙ্গে শিশু-কিশোর কয়েকজন থাকার কারণে পুরো ভ্রমণে যেন বাড়তি প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল। অভিজিৎ রায়—অনেকটা দাদা ঠাকুরের মতো ভাব নিয়ে নিজের কাজে মনোনিবেশ করলেও সর্বত্রই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। দলের মধ্যে যাঁরা সর্বজ্ঞতার ভাব নিয়ে বিচরণ করেন, তন্বিকে সেই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া কঠিন! অন্যদিকে পূজায় সহধর্মিণীকে সবচেয়ে আনন্দিত করে তোলে। আর প্রত্যাশা রায়কে ছাড়া বোধ হয় নৌকাভ্রমণের আনন্দটাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত। চাঁদনি রাতে নৌকাভ্রমণে অনির্বাণের উপস্থিতি হয়ে উঠেছিল প্রাণবন্ত। ছোটদের মধ্যে অনিরুদ্ধ ও অনিন্দিতার খেলাধুলায় মগ্ন থাকা, বিশেষত অনিরুদ্ধের এদিক-ওদিক ছুটোছুটি যেন প্রাণচাঞ্চল্যকে বাড়িয়ে দিত। তাদের সরল আনন্দ, অবাধ চঞ্চলতা আর নির্ভেজাল উচ্ছ্বাসের মধ্যে ছিল নির্মল সৌন্দর্য। বড়দের আয়োজন, ছোটদের কোলাহল, নদীর নীরবতা আর পূজার আবহ—সবকিছু মিলিয়ে চরনারচরের দিনগুলো যেন একটি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিচিত্র হয়ে উঠেছিল।
১০. ফিরে আসার পরেও যে মায়া থেকে যায়
পূজার পাঁচ দিন শেষ হয়েছে। পথের ক্লান্তি, দীর্ঘ যাত্রা, ব্যাগের বাড়তি বোঝা, আনন্দ-নিরানন্দের অনুভূতি সবই ধীরে ধীরে অতীতের পাতায় জমা পড়েছে। অথচ কিছু দৃশ্য আজও মনের ভেতর অমলিন। সেই ছোট্ট নদী, করবী ফুলের গাছ, চাঁদনি রাতে নৌকায় ভেসে চলা, যাত্রাপালার দীর্ঘ আসর—সবকিছু যেন স্মৃতির সুতোয় গাঁথা একেকটি বিচিত্র রঙের ফুল। চরনারচরও আমার কাছে তেমনই এক নাম। যে নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শরতের দখিনা হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো বিকেল, কিছু নির্ঘুম রাত আর কয়েকজন মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। এখানে পথের সঙ্গে মিশেছে প্রকৃতি, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়েছে মানুষ, আর মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে কল্পনাবিলাসী মন। হয়তো আবার কোনো এক শরতে, শিউলির গন্ধমাখা ভোরে, দখিনা বাতাসের মৃদু পরশে, সেই চেনা নদীর পাড়ে ফিরে যাব। হয়তো করবী ফুলের গাছটি তখনো বাতাসে দুলবে, নদীর ওপারে সন্ধ্যা নেমে আসবে, আর স্মৃতিরা নিঃশব্দে এসে পাশে বসবে, যা বেঁচে থাকবে হৃদয়ের গভীরে, কাব্যের অলংকারে কিংবা স্মৃতির অনন্ত বিস্তারে। ধন্যবাদ, দাদাঠাকুর—দীপন রায়। ধন্যবাদ, বড়দাদা—দীপক রঞ্জন রায়। ভালো থেকো, চরনারচর। তোমার নামের অন্তর্নিহিত অর্থ হয়তো আজও আমার কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, অথচ তোমার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতির অর্থ আমার কাছে বড়ই গভীর। তুমি রয়ে যেয়ো শরতের দখিনা হাওয়ায়, নদীর নীরবতায়, করবী ফুলের দোলায় আর আমার কল্পনাবিলাসী মনের একান্ত সাহিত্যিক আশ্রয়ে।
লেখক: অনজন কুমার রায়, ব্যাংকার