রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস

ফাইল ছবি

বাসের হ্যান্ডল ধরে ‘এই গুলিস্তান, গুলিস্তান, গুলিস্তান’ বলে চেঁচাচ্ছিলাম, কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই বেরসিক পাইলট (বাসের চালককে আমরা পাইলট বলতাম) আমাকে বাস থেকে নামিয়ে দেয়। ঠিক নামিয়ে দেওয়া বলতে যা বোঝায়, আসলে সে রকম নয়। একরকম অপমান করে গলাধাক্কা দিয়ে চলন্ত (অল্প গতির) বাস থেকে নামিয়ে দেয়! বাস ইতিমধ্যে লক্ষ্মীপুরের মোড় (রাজশাহী শহরের একটা স্থান) থেকে প্রায় এক কিলোমিটার সামনে চলে এসেছে। বাস থেকে নেমে প্রথমেই চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিই। নাহ, খুব কাছ থেকে কেউ দেখেনি। যেহেতু কেউ দেখেনি, সেহেতু অপমানিত হওয়ার কিছু নেই! নাহ, কিছু হয়নি, সব স্বাভাবিক।

আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীরাই জানি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলো ঠিকঠাক সময়মতো চলে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছেলেমেয়েরা পৃথক পৃথক বাসে চলাফেরা করে। সবাই যেখানে সিট নিয়ে কাড়াকাড়ি করে, সেখানে আমরা কয়েকজন ছিলাম, যারা কখনোই সিটে বসতাম না। দরজার হ্যান্ডল ধরে এই ঢাকা, ঢাকা, গুলিস্তান, ফার্মগেট, মতিঝিল বলে চিল্লাইতে চিল্লাইতে যেতাম। আর যদি কখনো আমাদের বাস মেয়েদের বাসকে অতিক্রম করত, তখন তো চিল্লানির মাত্রা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যেত।

এবার মূল গল্পে আসি। সেদিন গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর। আমরা বাসের হ্যান্ডল ধরে বাদুড়ঝোলা হয়ে গুলিস্তান...গুলিস্তান... বলে চিল্লাইতে চিল্লাইতে লক্ষ্মীপুরে গিয়েছিলাম। অতঃপর সামান্য যা কাজ ছিল, তা শেষ করে ফিরতি বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু বাস আসছে না। চারপাশ খেয়াল করে দেখলাম, আমার সহপাঠীরা কেউ নেই। ওদের কাজ শেষ হয়নি, সে জন্য আসেনি অথবা রুমে চলে গেছে, মনে মনে ভাবলাম। তা ছাড়া একেকজন একেক জায়গায় থাকি। একসঙ্গে আসা যায়, কিন্তু সব সময় একসঙ্গে ফেরা হয় না। আমি আরএইচ মেসে থাকি, তাই ফেরার জন্য একমাত্র বাসই আমার ভরসা। এদিকের সব বাসই আরএইচ মেসের সামনে দিয়ে যায়। যেকোনো একটা বাসে উঠলেই হলো।

হঠাৎ দেখি রাবির ট্রেডমার্ক আকাশি-সাদা একটা বাস সামনে দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গতিতে যাচ্ছে। আর আমাকে পায় কে, একদৌড়ে উঠে পড়ি। খেয়াল করিনি, এটা আসলে ছেলেদের না মেয়েদের বাস। যথারীতি আগের মতোই দরজার হ্যান্ডল ধরে দাঁড়িয়ে গুলিস্তান, গুলিস্তান বলে চিল্লানো শুরু করি। চিল্লানির মধ্যেই নারীকণ্ঠের আওয়াজ কয়েকবার কানে আসে। তবে এগুলো শোনার যথেষ্ট সময় আমার নেই। তখন মাত্র প্রথম বর্ষের ছাত্র। কৈশোরের দুরন্তপনা আর সদ্য যৌবনের অফুরন্ত উচ্ছ্বাস। আমাকে থামায় কে! ভাবলাম, কোনো মেয়ে হয়তো ছেলেদের বাসে উঠে ফিসফিস করে কথা বলছে।

প্রায় এক কিলোমিটার আসার পর পাইলট আমাকে জোর করে নামিয়ে দিল। নামার সময় পেছনে তাকাতেই বুঝতে পারি, আমি আসলে মেয়েদের বাসে উঠেছি। মেয়েরা নোটিশ করার পরে পাইলট বুঝতে পারে এবং আমাকে কিছু কটুকথা শুনিয়ে তাৎক্ষণিক নামিয়ে দেয়। প্রাথমিকভাবে পাইলটের ধারণা ছিল, আমি হয়তো কো-পাইলট। কিন্তু না, আসলে কো-পাইলটকে সে লক্ষ্মীপুরের মোড়ে রেখে এসেছে।

গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু হয়নি। প্রকৃতপক্ষে এখান থেকেই শুরু হয়েছে ভয়াবহ সব বিব্রতকর এপিসোড।

এক মাস পরের কথা। গ্রীষ্মের ছুটি। সিল্ক সিটি ট্রেনে বাড়ি যাচ্ছি। আমার সিটের আশপাশের যাত্রীরা সবাই রাবি ক্যাম্পাসের। অধিকাংশেরই মেয়ে। আমি দলছুট একা। তাতে কী! সামনে বসা দুই ললনার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু লাভ হচ্ছে না। ট্রেন ইতিমধ্যে আবদুলপুর চলে এসেছে। এমন সময় একটা মেয়ে বলল, ‘আপনাকে কেন জানি চেনা চেনা মনে হচ্ছে।’

‘এক ক্যাম্পাসে পড়ি, সে জন্য হয়তো।’ আমি উত্তর দিই।

তাদের মধ্য থেকে আরেকজন বলে, ‘গত মাসে একটা ছেলে মেয়েদের লক্ষ্মীপুরের বাসে উঠে গুলিস্তান, গুলিস্তান বলে পাগলের মতো চিল্লাচ্ছিল। কিছুদূর আসার পর পাইলট তাকে জোর করে নামিয়ে দেয়। সেই ছেলেটি দেখতে ঠিক আপনার মতো ছিল!’

আমি ইনস্ট্যান্ট কোরমা!

প্রতি বুধবার বিকেলে প্রথম আলো বন্ধুসভার মিটিং হতো। সেখানে আমি বেশ মজা করতাম। প্রায় সপ্তাহেই নিত্যনতুন বন্ধুরা আমাদের সঙ্গে যোগ দিত। তাদের নিয়ে আড্ডাটা বেশ প্রাণবন্ত হতো। সেদিন বিকেলে এক মেয়ে এল বন্ধুসভার বন্ধু হতে। যথারীতি নতুন কেউ আসলে প্রথমেই পরিচয় পর্ব। একে একে সবাই নাম, ডিপার্টমেন্ট, হল এবং হোম ডিস্ট্রিক্ট বলে পরিচয় দিচ্ছে। আমিও দিলাম। আমার কথা শেষ হতেই মেয়েটি মুচকি হেসে বলল, ‘আপনাকে আমি চিনি, তবে নাম জানতাম না। এখন জানলাম!’

অবাক হয়ে বললাম, ‘কেমনে?’

‘একদিন আপনি ভুল করে মেয়েদের বাসে উঠেছিলেন। তখন থেকে চিনি!’

সঙ্গে সঙ্গে সবাই হো হো করে হেসে ওঠে এবং আমাকে পোঁচাতে থাকে। তাঁদের সঙ্গে আমিও হেসে উঠি, কিন্তু ভেতরে-ভেতরে জমে বরফ!

তার অনেক পরের কথা। আমার এক বান্ধবী বলল, ‘তোর জন্য একটা মেয়ে দেখেছি।’

আমি বললাম, ‘তাহলে দেরি করছিস কেন, পরিচয় করিয়ে দে!’

পরদিন বিকেলে পশ্চিমপাড়া যাওয়ার আমন্ত্রণ এল। মেয়েটির সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। আমি সাজুগুজু করে, মাঞ্জা মেরে, রোমিও রোমিও ভাব নিয়ে পশ্চিম পাড়া গেলাম। তারপর একসঙ্গে বসে তিনজন ফুচকা খেলাম। মেয়েটি দেখতে বেশ সুইট। একহারা গড়ন, পটোলচেরা মায়াবী আঁখি, ছোট করে কাটা চুল, আপেল রঙের গাত্রবর্ণ। আমার ভীষণ পছন্দ হয়। যাকে বলে প্রথম দেখাতেই প্রেম।

আমার বুদ্ধিমতী বান্ধবী ফোনে কথা বলার জন্য দূরে চলে যায়। আসলে সে আমাদের একান্তে কথা বলার সুযোগ করে দেয়।

কিছু বলার আগেই সুন্দরী যা বলল, তা শোনার জন্য আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না।

‘আপনি কি মেয়েদের বাসের কন্ডাক্টরি করেন?’

‘না, কেন বলুন তো?’

‘আপনাকে মেয়েদের বাসের দরজায় গুলিস্তান, গুলিস্তান বলে চিল্লাতে দেখেছিলাম, সে জন্য বলছি আরকি!’

‘কবে?’

‘মনে করে দেখেন!’

আমার সব মনে হয়, কিন্তু মুখে কথা আসে না। প্রেম করার আগেই ১১ হাজার ভোল্টের ছ্যাঁকা খেয়ে কোনো রকমে পালিয়ে আসি।

তারপর থেকে বছরখানেক একটা ম্যানিয়া তৈরি হয়েছিল। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতেই আমতা-আমতা করতাম। মনে হতো, এই বুঝি বলবে, ‘আপনাকে মেয়েদের বাসের দরজায় গুলিস্তান, গুলিস্তান বলে চিল্লাতে দেখেছি!’

NB: সে ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পাসের বাস ব্যবহার বন্ধ করে দিই। এ ছাড়া তত দিনে হলে সিট হয় আর বিকল্প যান হিসেবে রাজশাহীতে অটোরিকশা চালু হয়।

* লেখক: রূপক, সাবেক শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]