আমাদের দুজনের চাকরি করা এর সমাধান বের করে আনতে পারবে না। যেকোনো একজনকে চাকরি ছেড়ে দিতে হবে। একজন চাকরি করব, আরেকজন মেয়ের দেখাশোনা করব। এখন আলোচনার বিষয় হলো কে ছাড়বে চাকরি? কথাগুলো গুছিয়ে ধীরে ধীরে বলল হাসনাইন।

আমি চাকরি ছাড়তে পারব না। মিতু সাফ সাফ জানিয়ে দিল হাসনাইনকে।

তাহলে কি আমি ছেড়ে দেব?

ছাড়তে পারো। তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমার পক্ষে চাকরি ছাড়া একবারেই অসম্ভব। এবারও ঝরঝর করে জানিয়ে দিল মিতু।

কথাগুলো শুনে হাসনাইন একদমই স্বাভাবিক হয়ে রইল। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। হাসনাইন কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে, এ নিয়ে মিতুর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে অটল ও নির্ভার। নিজের শরীর গোছানোর মতো করে কথাগুলোও গুছিয়ে রেখেছিল বোধ হয়।

হাসনাইনের সামনে বিশাল এক পাহাড় এসে হাজির হয়েছে, যে পাহাড় হাজির হওয়ার কথা মিতুর সামনে। অথচ সে একদমই ভাবলেশহীন অবস্থায় আছে, যেন কিছুই হয়নি। যেন এটাই হওয়ার কথা ছিল। যদি এমনই ভেবে থাকে, তবে নিশ্চয়ই তার সামনে এর সমাধানও আছে। কিন্তু সন্তানের মা হিসেবে তার চিন্তা করার কথা আরও বেশি। তার ভাবনা হওয়ার কথা ঢের বেশি। হচ্ছে এর উল্টো। তাহলে কি মিতু সংসার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে? কেন মুখ ফিরিয়ে নেবে? তার তো কোনো কিছুর স্বল্পতা নেই। দুজনের সংসার, দুজনে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কারও সঙ্গে কারও কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তবে কেন সে এতটা উদাস? হাসনাইন কোনো কিছুরই গভীরে যেতে চায় না। সমস্যার গভীরে গেলে যদি অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু বের হয়ে আসে, তখন সেটা সে সহ্য করতে পারবে না।

default-image

হিমিকা এসবের কিছুই বোঝে না। এসব বোঝার বয়স হয়নি তার। সে শুধু তার মা-বাবাকে কাছে চায়। সে মা-বাবাকে দেখলে খুশি হয়। সারা দিনের মনমরা ভাব তাদের দেখলেই মুহূর্তেই কেটে যায়। মেঘে ঢেকে যাওয়া আকাশের কালো ভাব নিমেষেই মুছে যায়। হিমিকার মুখে ফুটে ওঠে ভুবনভোলানো হাসি।

এ হাসি ভুবনের সব আঁধার মুছে দিতে পারলেও বাবা কিংবা মায়ের মধ্যকার দূরত্বের বক্ররেখা মুছে দিতে পারে না। হাসনাইন সময় নেয় মিতুর চাকরি ছাড়ার নোটিশের অপেক্ষায়। কিন্তু মিতু অটল তার সিদ্ধান্তে। মিতু স্থির তার ভাবনায়, চিন্তায়। তাদের মধ্যকার বোবা আচরণ সময়ের মাত্রা ছাড়াতে থাকে কিন্তু সিদ্ধান্ত পাল্টাতে সাহায্য করতে পারে না।

ছোট্ট হিমিকা সময় নিতে পারে না। তার ছোট্ট মন, ছোট্ট শরীর মা-বাবার বৃহৎ ব্যবধান কমাতে পারে না। হিমিকার হাসি সংসারের দুঃখ ঘোচাতে পেরেছে, তবে তার উপস্থিতি সংসারে সুখ আনতে পারেনি। এটা স্পষ্ট করে বুঝতে না পারলেও তার অনাহারী মুখ সেসব অভিব্যক্তি বুঝিয়ে দেয়।

কবে এতটা দূরত্ব তৈরি হলো, সেটাই হাসনাইন-মিতু ভেবে বের করে আনতে পারে না। তাহলে কি তাদের মধ্যে কোনো ভালোবাসা কখনোই ছিল না? তাহলে এত দিন, এত বছর, এতটা সময় কীভাবে একসঙ্গে ছিল?

এতটা সময় পার করার পর এত কাছের মানুষকে এতটা অচেনা মনে হয়! তাহলে কি তারা কখনোই কাছে ছিল না? কাছে থাকার ভান করেছে শুধু! একসঙ্গে থেকেও এত দূরত্ব কীভাবে তারা লুকিয়ে রেখেছিল এতকাল ধরে!

হাসনাইন কিংবা মিতু, কারোরই তাদের একে অপরের কাছে আসার সময় না হলেও হিমিকার দূরের যাওয়ার সময় ঠিকই হয়েছে। কী এক অভিমানে সে দূরে চলে গেছে, যতটা দূরে গেলে মানুষ কখনো আর ফিরে আসে না সংসারে। তার ভেতর জমাট দুঃখ, সঞ্চিত ব্যথা কাউকে ধরতে দেয়নি। তার কচি দেহের আড়ালে লুকানো কষ্ট মা-বাবার ব্যস্ততার কাছে মূল্যবান হতে পারেনি।

হিমিকার ফিরে যাওয়ার পর হাসনাইন আর মিতুও কখনো আর কাছে ফিরতে পারেনি। তাদের দূরত্ব যেন অদৃষ্টে লেখা ছিল। তাদের দূরত্ব যেন জীবনের সঙ্গে লেপটে ছিল। মিতুও হয়তো হিমিকার কথা ভাবে। লোকমুখে শোনা যায়, সে ভালো আছে। চাকরি করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আবার বিয়ে করে সংসারী হয়েছে। ‘মা’ ডাক শুনে হয়তো হিমিকার কথা ভুলে গেছে সে। কিন্তু হাসনাইন কি পেরেছে হিমিকাকে ভুলতে? ভুলতে পারলে হয়তো জীবনটাকে নতুন করে সাজাতে পারত।

default-image

যে জীবন সাজানো সংসার সাজিয়ে রাখতে পারে না, সেই জীবন নতুন করে সাজানোর অধিকার রাখে না। সমাজে যে ব্যক্তি স্বাধিকার নিজেই ভূলুণ্ঠিত করে পথের ধুলায়, তার জন্য সম্প্রদায়ের কারও কোনো মাথাব্যথা নেই।

হাসনাইন দূর থেকে শহরের আবহাওয়া অনুভব করার চেষ্টা করে। হিমিকা চলে যাওয়ার পর এই জীবনটা শুধু বেঁধে রেখেছে, এ জীবনে কোনো স্বপ্নের প্রশ্রয় দেয়নি।

আজ হিমিকার কথা মনে পড়তেই হাসনাইনের মনের গহিন কোণে পুরোনো ব্যথা নতুন করে জেগে উঠেছে, যে ব্যথা বহু বছর ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল। ইচ্ছা করলেই কি মনের গোপন ব্যথাকে চেপে রাখা যায়? ব্যথা কি আর চেপে যাওয়া কথার ভাষা বুঝতে পারে?

ছোট্ট একটা চড়ুই ফুড়ুৎ করে উড়ে এসে জানালার গ্রিলে বসল। লেজ নাড়িয়ে এদিকে-ওদিক তাকাচ্ছে। চোখ দুটো স্বচ্ছ, ঠোঁটের কোণে ছোট্ট পালকের ডগায় পানি লেগে রয়েছে, দেখতে ঠিক হিমিকার মতো। হিমিকা হাসছে। হাসনাইন হিমিকার হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখনই হাত বাড়িয়ে দেবে। কোলে উঠেই বাবার গালে চুমু এঁকে বলবে—

বাবা, এত দিন তুমি কোথায় ছিলে? শেষ...

*লেখক: মফিজুল হক, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড, ঢাকা

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন