অর্থনীতির পরিভাষায় মূল্যস্ফীতি বলতে এমন একটি অবস্থাকে বোঝায় যে একই পরিমাণ দ্রব্য বা সেবা কিনতে আগের তুলনায় বেশি পরিমাণে অর্থ ব্যয় করতে হয়। অর্থাৎ বলা যায়, মূল্যস্ফীতি হলো অর্থের মূল্য কমে যাওয়া। আসলে একটি দেশের অর্থনীতিতে অর্থের জোগান বৃদ্ধি পেলে পণ্যসামগ্রীর চাহিদা বাড়ে। তা ছাড়া দ্রব্যের চাহিদার সঙ্গে উৎপাদন কমে গেলেও মূল্যস্ফীতি দেখা যায়। আবার ক্রয়ক্ষমতা কমাটাও মূল্যস্ফীতি। তবে বাংলাদেশে বর্তমানে যে মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে, তা কোন ধরনের, তা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ নানা ধরনের মত দিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ ক্রাউথার মতে, ‘মূল্যস্ফীতি হলো এমন একটি অবস্থা, যখন অর্থের মূল্য ক্রমাগত হ্রাস পায় এবং পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়।’ অর্থনীতিবিদ কুলবর্নের মতে, ‘মুদ্রাস্ফীতি হলো এমন একটি একটি পরিস্থিতি, যেখানে অত্যধিক পরিমাণ অর্থ অতি সামান্য পরিমাণ দ্রব্যের পাশ্চাতে ধাবিত হয়।’ অধ্যাপক হট্টে বলেছেন, ‘অত্যধিক পরিমাণ অর্থের প্রচলনকে মুদ্রাস্ফীতি বলে।’ অধ্যাপক পিগু বলেন, ‘যখন আয় সৃষ্টিকারী কাজ অপেক্ষা মানুষের আর্থিক আয় অধিক হারে বৃদ্ধি পায়, তখনই মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়।’ অধ্যাপক স্যামুয়েলের মতে, ‘দ্রব্যসামগ্রী ও উৎপাদনের উপাদানগুলোর দাম যখন বাড়তে থাকে, সাধারণভাবে তখন তাকে মূল্যস্ফীতি বলে।’ লর্ড কেইনসের মতে, ‘দ্রব্যসামগ্রীর মোট জোগানের চেয়ে কার্যকর চাহিদা যখন বেশি হয়, তখন মুদ্রাস্ফীতি ঘটে।’ আবার কিছু অর্থনীতিবিদের মতে, অর্থের জোগান অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে উল্লিখিত, কোন তত্ত্বটি কার্যকর হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। নানা ধরনের প্রভাবে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অস্বাভাবিক বা অত্যধিক অর্থের জোগান হয়নি। তা ছাড়া কর্মক্ষেত্রের অত্যধিক আয়ের ব্যবস্থাও তৈরি হয়নি। কোনো দেশের অর্থনীতিতে যদি মুদ্রাস্ফীতি ঘটে, তাহলে মানুষের কর্মসংস্থান বেড়ে যায়। অধ্যাপক হট্টের বলেছিলেন, অত্যধিক পরিমাণ অর্থের প্রচলনকে মুদ্রাস্ফীতি বলে। আর এ ধরনের মূল্যস্ফীতি ঘটলে দেশের অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ অর্থের গতির সঞ্চারটা বেড়ে যায়, ফলে মানুষ অধিক অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে আর এ ধরনের বিনিয়োগের কারণে কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়, কমে বেকারত্ব। বর্তমানে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিতে দেখা যায়, পণ্য উৎপাদনের উপাদানগুলোর মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু এখানে অত্যধিক অর্থের জোগান সামগ্রিক অর্থনীতিতে হয়নি, তাই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং দৈনন্দিন জীবনে দেখা দিচ্ছে অভাব।

মূল্যস্ফীতির অন্য কারণগুলো খুঁজতে গেলে দেখা যায়, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি। বর্তমানে বাংলাদেশে এ প্রক্রিয়াই ঘটছে। ইউক্রেন–রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতির প্রভাবটাই দেশে প্রকট আকার ধারণ করেছে। যদিও বলা হচ্ছে, দেশের প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরে ৮ থেকে ৯ শতাংশের মতো হতে পারে। প্রবৃদ্ধির এ হার ব্যয়ের কারণে যে মূল্যস্ফীতি ঘটছে, তা পূরণ করতে পারবে না বলে মনে হয়। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশে যেসব পণ্য উৎপাদিত হয়, সেই পণ্যগুলোর বেশির ভাগ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ কাঁচামালগুলোর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে। বাংলাদেশে গ্যাসের অভাব মারাত্মক আকার ধারণ করায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। গ্যাসকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে সার উৎপাদন করত—এমন দুটি সার কারখানা ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে।

১৭ জুলাইয়ের দৈনিক সংবাদের প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, ১১৮ কোটি টাকার তেল পুড়িয়ে উৎপাদন করা হয়েছে ৮৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ। ধরা যাক প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা। তাহলে ৮৬ মিলিয়ন বিদ্যুতের দাম হলো ৪৩ কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন ব্যয় ১১৮ কোটি টাকা আর উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ৪৩ কোটি টাকা। সংগত কারণেই এ ধরনের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, অন্যান্য পণ্য উৎপাদন কমে যাবে। বাংলাদেশে ধান চাষ এখন সেচনির্ভর। বরেন্দ্রসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সেচকাজ চালানো হয়।

ইতিমধ্যেই সরকার ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনপ্রক্রিয়া স্থগিত ঘোষণা করেছে, ফলে সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্ধেক কমে যাবে। এ কারণে সেচব্যবস্থা থেমে গেলে ধানের উৎপাদন কমবে। অন্যদিকে দুটো ইউরিয়া সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রয়োজনীয় সার কৃষককে কাছে সরবরাহ করতে পারবে না সরকার। ধানের উৎপাদন কমে গেলে ধানের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। কৃষিকাজ এখন বিদ্যুৎ ও সারনির্ভর।

সুতরাং সার ও বিদ্যুতের প্রভাবে অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে। কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় খাদ্যপণ্যর দামও বেড়ে যাবে। তখন আর মূল্যস্ফীতি একক অঙ্কে থাকবে বলে মনে হয় না। চলমান মূল্যস্ফীতির প্রভাবটি দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে চলতে পারে। মূল্যস্ফীতির এ ক্রমবর্ধমান উচ্চ হারের প্রভাবে দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাবে। অত্যধিক অর্থের জোগান না পেয়ে যে মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হয়, এর প্রভাবে বাড়ে বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা ও দারিদ্র্য। তাই সরকারকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশীয় গ্যাস ব্যবহারে উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশে সমতল ভূমি থেকে যে গ্যাস পাওয়া যায়, তার মজুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তবে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে রয়েছে বিশাল গ্যাসভান্ডার। সমুদ্র তলদেশের গ্যাস আহরণ করতে পারলে দেশের গ্যাসের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রাস্ফীতি কমাতে না পারলে দেশের রাজনীতি এবং সামাজিক ব্যবস্থায় বাড়বে অস্থিরতা। এর প্রভাবে দুর্নীতি, অনাচার, চুরি-ডাকাতিসহ আরও অপরাধ বেড়ে যাবে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তবে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ালে মূল্যস্ফীতি লাগামহীন হয়ে যাবে। তাই খুব সতর্কতার সঙ্গে বিষয়গুলো পরিচালনা করলে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতিটা নিম্নমুখী হতে পারে।


লেখক: শাহ মো. জিয়াউদ্দিন, রাজশাহী

পাঠক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন