বই রিভিউ: মা
‘একটি দেশের স্বাধীনতার পেছনে থাকে অসংখ্য আত্মত্যাগের গল্প, আর সেই গল্পগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকে কত মায়ের নীরব কান্না—যার খবর ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকে না, লেখা থাকে শুধু হৃদয়ে।’
কিছু বই পড়ে শেষ করা যায়, কিন্তু কিছু বই শেষ করার পরও মনটা বইয়ের পাতায় আটকে থাকে। বুকের ভেতর জমে থাকে এক অদ্ভুত শূন্যতা, চোখের কোণে অজান্তেই জল এসে যায়। আনিসুল হকের ‘মা’ আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি বই—যে বই শুধু একটি গল্প শোনায় না, বরং ভালোবাসা, বেদনা আর আত্মত্যাগের এমন এক জগতে নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসার পরও মনটা আগের মতো থাকে না।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছেন শহীদ আজাদ ও তাঁর মা সাফিয়া বেগম। তাঁদের জীবনের গল্পের মধ্য দিয়ে লেখক তুলে ধরেছেন মাতৃত্বের গভীরতা, দেশপ্রেমের মহত্ত্ব এবং প্রিয়জনকে হারানোর এক অসহনীয় বেদনা। এটি শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধার গল্প নয়, এটি একজন মায়ের গল্প—যাঁর পৃথিবীজুড়ে ছিল তাঁর সন্তান, অথচ সেই সন্তানকেই দেশের জন্য উৎসর্গ করতে হয়েছে। বইটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে, একজন মা তাঁর সন্তানকে পৃথিবীতে আনেন কত স্বপ্ন নিয়ে! কত যত্নে বড় করেন, কত রাত নির্ঘুম কাটান, কত ছোট ছোট ইচ্ছা জমিয়ে রাখেন সন্তানের মুখে একটুখানি হাসি দেখবেন বলে। অথচ সেই সন্তানই যখন দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে, তখন দেশ পায় একজন বীরকে, ইতিহাস পায় একজন শহীদকে, কিন্তু একজন মা হারান তাঁর সবচেয়ে আপন মানুষটিকে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
দেশের কাছে আজাদ একজন বীর, কিন্তু তাঁর মায়ের কাছে তিনি চিরকাল সেই আদরের সন্তান—যার ফিরে আসার অপেক্ষা হয়তো কোনো দিনই শেষ হয় না।
এই কথা ভাবলেই বুকের ভেতর কেমন যেন লাগে। কারণ, একজন মায়ের কাছে তাঁর সন্তান কখনো শুধু একটি মানুষ নয়; সে তাঁর স্বপ্ন, তাঁর বেঁচে থাকার আনন্দ, তাঁর পৃথিবীর সবচেয়ে আপন অংশ। পৃথিবী হয়তো সেই সন্তানকে বীর বলে সম্মান জানায়, কিন্তু মায়ের হৃদয় তো শুধু একবার তাঁর সন্তানকে ফিরে পেতে চায়। হয়তো একবার ছেলেটি এসে বলবে, ‘মা, আমি এসেছি।’ অথচ কিছু অপেক্ষা কখনো পূর্ণতা পায় না, কিছু শূন্যতা কোনো দিন পূরণ হয় না। আনিসুল হকের লেখার সবচেয়ে অসাধারণ দিক হলো, তিনি ইতিহাসকে শুধু ঘটনার বিবরণ হিসেবে তুলে ধরেননি; বরং ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষের অনুভূতিগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন। তাঁর লেখনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুক্তিযুদ্ধ শুধু বিজয়ের গল্প নয়; এটি অসংখ্য পরিবারের বিচ্ছেদ, অসমাপ্ত স্বপ্ন আর প্রিয়জনকে হারিয়েও আদর্শের প্রতি অবিচল থাকার গল্প।
বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, আমরা স্বাধীনতাকে যতটা সহজভাবে উদ্যাপন করি, তার পেছনের আত্মত্যাগকে হয়তো ততটা গভীরভাবে অনুভব করি না। লাল-সবুজের পতাকার দিকে তাকালে আমাদের মনে গর্ব জাগে, কিন্তু সেই পতাকার জন্য কত মা তাঁদের বুকের ধন হারিয়েছেন, কত পরিবার চিরদিনের জন্য প্রিয় মানুষটির অপেক্ষায় থেকে গেছে—সেই বেদনাও আমাদের মনে রাখা উচিত।
আমার কাছে ‘মা’ শুধু মাতৃত্বের গল্প নয়; এটি ভালোবাসার এমন এক রূপের গল্প, যেখানে নিজের কষ্টের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে আদর্শ, আর ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও বেঁচে থাকে দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা।
বইটি আমাকে বুঝিয়েছে, কিছু আত্মত্যাগের মূল্য কোনো কিছুর বিনিময়ে পরিশোধ করা যায় না, কিছু ভালোবাসার গভীরতা কোনো ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না। বইটি শেষ করার পর মনে হয়েছে, পৃথিবীর সব শহীদের নাম হয়তো ইতিহাসের পাতায় লেখা সম্ভব, তাঁদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করাও সম্ভব; কিন্তু তাঁদের মায়েদের বুকের ভেতর যে শূন্যতা তৈরি হয়, তার কোনো স্মৃতিস্তম্ভ হয় না। সেই শূন্যতা তাঁরা নীরবে বয়ে বেড়ান, স্মৃতির মধ্যে খুঁজে ফেরেন তাঁদের প্রিয় সন্তানকে।
আমার কাছে ‘মা’ এমন একটি বই, যা পড়ে শুধু চোখ ভিজে ওঠে না, হৃদয়ও নীরবে অনেক কিছু উপলব্ধি করতে শেখে। এটি মনে করিয়ে দেয়, একজন শহীদের আত্মত্যাগের পেছনে হয়তো রয়েছে একটি পরিবারের ভেঙে যাওয়া পৃথিবী, আর সেই পৃথিবীর কেন্দ্রে রয়েছেন একজন মা।
কিছু বই পড়ে আমরা গল্পের কথা ভুলে যাই, কিন্তু কিছু বই আমাদের ভেতরে এমনভাবে বেঁচে থাকে, যেন তার প্রতিটি অনুভূতি আমাদের নিজেদেরই। আনিসুল হকের ‘মা’ আমার কাছে তেমনই একটি বই।
কারণ, কিছু গল্পের শেষ পৃষ্ঠা থাকে—কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া কান্না, ভালোবাসা আর অনুভূতির কোনো শেষ থাকে না।
লেখক: তামান্না তাবাসসুম আরিশা, দশম, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ