গোইউর হুইফু হোটেলে এক দিন

ছবি: লেখকের পাঠানো

চীনের সাংহাইতে এসেছি বেশ কিছুদিন হলো। আর সাংহাই থেকে গোইউ (Gaoyou) শহরে যাওয়ার প্রয়োজনও হলো।

সাংহাইয়ের প্ল্যাটিনাম হানজু হোটেল চেক আউট করে, একটি ট্যাক্সিক্যাব নিয়ে সোজা চলে এসেছি সাংহাইয়ের হংসাও রেলস্টেশনে। শহরে তাপমাত্রার পাঁচ থেকে সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই নিম্ন তাপমাত্রার সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, শীত অনুভূতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। পথে ট্যাক্সিচালক ছিলেন এক মধ্যবয়সী নারী। তাঁর কর্মদক্ষতা বেশ ঈর্ষণীয়, যা উন্নত পুঁজিবাদী সমাজের শ্রমের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের যে বিভাজন নেই, তা মনে করিয়ে দেয়।

হংসাও রেলস্টেশনটি বেশ বড়। মনে হয়, এটি আমাদের ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সমান জায়গা নিয়ে তৈরি করা। যাত্রীর সংখ্যাও বেশ। হাজার পাঁচেক তো হবেই। গেটে সিকিউরিটি চেকের পর, টিকিট কাউন্টার থেকে আমরা খুব সহজে টিকিট কাটতে পারলাম আমাদের পাসপোর্ট দিয়ে। এখন অপেক্ষার পালা কখন ট্রেন আসে।

চায়না রেলওয়ের জি ৭৫৮৬ হাই স্পিড ট্রেনটি আমাদের নিয়ে যাবে গোইউ সিটিতে, সময় নেবে তিন ঘণ্টার কিছু বেশি সময়। ঠিক সময় স্টেশনে ট্রেন আসা ও স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার কোনো ব্যতিক্রম পেলাম না, এই চায়না ভ্রমণে। ট্রেনের ভেতরে ঝকঝকে সিট, পরিষ্কার ফ্লোর ও যাত্রীদের মার্জিত ব্যবহার লক্ষণীয়। চলমান ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকালে চীনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক মিশ্র রূপ দেখা যায়। এই দৃশ্য যেমন লোভনীয়, ঠিক তেমনি ট্রেনের গতিও ঈর্ষণীয়। ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে চলা, তার স্বাভাবিক ব্যাপার, আর সর্বোচ্চ গতি খেয়াল করলাম ২৭৫।

পথে যেতে যেতে সুজুই, চেংঝু আর ইয়াঙজু পার হতে হতে, ট্রেনের কামরার উষ্ণতায়, গতির মূর্ছনা আর গতি জড়তার এক মিশেল প্রভাব শরীরে এসে ভর করে। এক উষ্ণ আদরে চোখ মুদে আসে। আহা কি আনন্দের এই ট্রেনযাত্রা!

গোইউ সিটিতে ঠিক সময়ে ট্রেনটি থামল। ট্রেন থেকে নেমে, স্টেশনের বাইরের পথে আমাদের অভ্যর্থনকারী লিউ ওয়েন-তাওকে পেয়ে গেলাম খুব সহজেই। ওয়েন-তাও একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমাদের তার গাড়ির কাছে নিয়ে গেল। তার চালচলনের রয়েছে গোছালো একটা ভাব, শান্ত থাকার অভ্যাস আর অত্যন্ত স্বল্পভাষী। শুধু ইংরেজি বলাতেই রয়েছে তার বিনম্র মাথা নিচু হাসি। যার বিশেষ অর্থ হলো দুঃখিত।

প্রযুক্তি মানুষকে হারতে দেবে না। সুতরাং আমরা পোর্টেবল ট্রান্সলেটরের সাহায্যে তার সঙ্গে কথা বলা শুরু করি। সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় আমরা বুঝলাম যে আধঘণ্টার ভেতরে সে আমাদের হোটেলে নিয়ে যাবে।

জিনলিং হুইফু হোটেল, এই শহরের মধ্যে সবচেয়ে বড় হোটেল। প্রবেশের বিরাট ফটক তার শ্রেষ্ঠত্ব জানান দিচ্ছি। তবে অতিথির অভাবে তার চেহারায় বিষণ্নতা ফুটে উঠেছে। এই শীতের সময়কে আসবে এই শহরের লেকের আশেপাশে। আমাদের মতো কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথিই হয়তো আসে এই সময়। আমরা হোটেলে বিশ্রাম করতে লাগলাম।

হোটেলে একটা বিপত্তি ঘটে গেল। আমি আমার রুমে দারুণ অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। রুমের ভেতরে কোনো একটি কার্পেট বা বিছানার চাদর বা জানালার পর্দার ডাস্টমাইট সংস্পর্শে এসে, আমার হাতে মুখে ভীষণভাবে প্রতিক্রিয়া করল।

আমি হোটেলের রিসিপশনে ফোন করে, ডিউটি ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করলাম বিষয়টি। তাদের কোনোভাবেই বুঝাতে না পেরে শেষে আমি ওয়েন-তাওকে উইচ্যাটে মেসেজ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে কাজ হলো।

ডিউটি ম্যানেজার আমার রুমে চলে এলেন। তিনি বিষয়টা বুঝতে পেরে বারবার মাথা নামিয়ে ক্ষমা পার্থনা করলে। তিনি দ্রুত আমার সমস্ত কাপড় চোপড়া ব্যাগে ভরলেন। তারপর নিজের হাতে ব্যাগ নিয়ে চললেন নতুন একটা রুমের দিকে। রুম চেঞ্জ করে দিলেন। নতুন রুম পরিপাটি করে দিলেন, জানালার পর্দা সরিয়ে দিলেন। তারপর বিষয়টির জন্য আবার আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।

এদিকে লিও বারবার আমাকে জিজ্ঞেস করছে, আমার কিছু লাগবে কি না, হাসপাতালে যেতে হবে কি না, এখন কেমন আছে ইত্যাদি, ইত্যাদি।

সারা জীবন বাঙালির অতিথিসেবার গল্প শুনেছি। বিশ্বের অন্য দেশে এসে এমন অতিথিসেবা পাব ভাবতেই পারিনি। বেঁচে থাকো অতিথি সেবা, দেশে দেশে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ইমেইল: [email protected]