রোমাঞ্চকর ট্রেন ভ্রমণের গল্প

নওয়াপাড়া রেলওয়ে স্টেশন। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ছবি: লেখক

২০ ফেব্রুয়ারি। অসুস্থ শরীর। জ্বর, সর্দি, মাথাব্যথা নিয়ে শুরু হলো এবারের ট্রেনযাত্রা। আমি বারবার যাত্রা বাসেই করি। তবে মন খারাপ থাকায় বেছে নিলাম এবারের যাত্রাটা মোংলা থেকে খুলনায় ট্রেনেই করি। এই যাত্রায় সঙ্গী ছিলাম শুধু আমি। বাসা থেকে বের হলাম বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে। সেখান থেকে বাসে মোংলা স্টেশনে নামলাম। দেখি আমার মতো অনেকেই ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে। কখন ট্রেন আসবে, সেই অপেক্ষায় বসে বসে কেউ কথা বলছেন, কেউ আবার প্রিয়জনের অপেক্ষায় বসে আছেন। তবে আমি মন খারাপ নিয়ে বসে আছি আর ভাবছি, এই জার্নিটা আমার কেমন হবে? ভাবতে ভাবতে ট্রেনের হুইসেলের শব্দ কানে এল। দেখি দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে ট্রেন হুইসেল বাজাতে বাজাতে স্টেশনে ভিড়ল। আমিসহ সব যাত্রী টিকিট নিয়ে ট্রেনে উঠে বসলাম। বেলা একটায় ট্রেন স্টেশন ছাড়ল।

এবার বলি, আমি অপূর্ব। পাঁচ দিনব্যাপী প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে ভ্রমণ করছি। গন্তব্য খুলনা। আমি ট্রেনের জানলার পাশে বসে বসে ভাবছি আর আপন মনে কবিতার বীজ বুনছি। হঠাৎ দেখলাম আমার ফোনে তার নম্বরের কল এল। তার বলতে সে হলো ‘ইরা’। ভারি বুদ্ধিমতী আর রাগী একটা মেয়ে। যার সঙ্গে আমার পুরো স্বপ্ন ঘিরে আছে। রাগ, ঝামেলা, ঝগড়া করে কাটে আমাদের প্রতিটা দিন। তবে ভালোবাসি আমরা দুজন দুজনকে। এত ঝগড়া হলেও কেউ কাউকে আমরা ছেড়ে যাইনি। এবারের ঝগড়া হয়েছে সব থেকে বেশি জোরালো। ইরা আমার বয়সে বড়। তারপরও আমি তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি। সেও আমাকে অনেকটা ভালোবাসে। এবার বলি সেই গল্পটা। যে গল্প শোনার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে। মোংলা থেকে শুরু হলো কল রিসিভ করে কথা বলা। ফোনে কিন্তু ঝগড়া চলছে। পাঁচ দিনের ঝগড়ার সমাধানের জন্য চেষ্টা চলছে তার পক্ষ থেকে। আমিও তাকে বুঝিয়ে চলেছি অবিরাম। আমরা কেউ তেমন বুজতে চাই না। কারণ, আমরা হেরে যেতে চাই না দুজনের মধ্যে। সবাই ফাস্ট হওয়ার ব্রেন নিয়ে জন্মেছি।

কথা চলছে, ট্রেন স্টেশনে যাচ্ছে আবার ছেড়ে দিচ্ছে। কথা ভেতরে ঝগড়া চলতে চলতে আমি আমার গন্তব্য ছেড়ে চলে গিয়ে যশোর নওয়াপাড়া স্টেশনে চলে গেলাম। তখনই হঠাৎ কথা বলতে বলতে মনে পড়ল, আমি যে খুলনায় নামব! তখনই দেখি আমি যশোর চলে আসছি। সেখানে সেই স্টেশনে নেমে পড়লাম। নেমেই তো নাটকের গল্পের মতো ভরে গেল আমার মন মাথা। যেমন রোমান্টিক গল্প মনে আসছে ঠিক তেমনি মন খারাপ। কেউ পাশে নেই। আমার মনে মতো গল্প সাজিয়ে স্টেশনের ফুটওভার ব্রিজে ওপর বসে আছি। আর আপন মনে বকবক করছি। তখনই ইরা আমার সঙ্গে আমার কলে ছিল।

অপূর্ব: দেখছো ইরা। আমার ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার কতটা মিল। আমি যেমনটা তোমার সঙ্গে অনেক আগেই এই গল্প করেছি। ঠিক তেমনি আজকে আমার সঙ্গে সেটাই ঘটে গেল। আমার সঙ্গে ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমি ইরাকে বোঝাচ্ছিলাম ভুল ট্রেনে উঠে ভুল স্টেশনে এসে নেমে গেলাম। কিন্তু সে বুজল অন্য কিছু। আমি তার সঙ্গে আমার ঝগড়ার পর হাসিমুখে বিচ্ছেদ চাচ্ছিলাম।

ইরা: তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলে গেছো। ভালো হয়েছে। ওখান থেকে বাস ধরে চলে আসো খুলনায়।

অপূর্ব : না, আমি যে ট্রেন ধরে আসছি আবার তার অপেক্ষায় থেকে সেই ট্রেনেই ফিরব বলে অটুট ছিলাম।

নওয়াপাড়া রেলওয়ে স্টেশন। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: লেখক

ইরা: তুমি এত জেদি কেন। বললাম না, চলে আসো।

অপূর্ব : আমি তার সঙ্গে জেদ নিয়ে রাগ করতে করতে কথা বলছি। আর তাকে বোঝাচ্ছি বাস্তবতা। কিন্তু সে কখনো বোঝে না। কারণ, সে অনেকটা ব্রিলিয়ান্ট। হঠাৎ স্টেশনের মাইকের ঘোষণা করা হচ্ছে। আধা ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সুন্দরবন এক্সপ্রেস নামের ট্রেনটা নওয়াপাড়া স্টেশনে আসবে খুলনার উদ্দেশে। আপনারা যাঁরা খুলনায় যাবেন, তাঁরা টিকিট কেটে অপেক্ষা করবেন। আমি ঘোষণা শুনে দীর্ঘশ্বাস নিলাম। যে যার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলাম। তার দেখা ঠিক পেয়ে গেছি। তখনই আমি টিকিট কেটে তার জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু ইরা?

ইরা: তুমি আমাকে ভুল ট্রেন উঠে পড়া ভুল জায়গায় নেমে পড়ার সঙ্গে মেলালে। আর কথা নেই। আমাদের আর কথা হবে না। এমন বলেই কল কেটে গেল।

অপূর্ব : আমি একাকী এক মনে ট্রেন আসার অপেক্ষায় বসে রইলাম। ট্রেন এল। ট্রেনের টিকিট কেটে আবারও যাত্রা শুরু করলাম খুলনা।

এভাবে সারা দিনে আমার গল্প শেষ হলো। এই যাত্রার গল্পটা লেখকের একান্ত মতামত। যাহা তার সঙ্গে ঘটেছে।

লেখক: মৃত্যুঞ্জয় রায় অপূর্ব, গণমাধ্যমকর্মী

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]